ময়মনসিংহ মেইল

সড়কে ২১ মাসে ঝরল ৩৭০ প্রাণ

বৃহত্তর ময়মনসিংহ · 2026-10-04 09:16:43 · স্টাফ রিপোর্টার

ময়মনসিংহের সড়ক-মহাসড়কে থামছে না মৃত্যুর মিছিল। বেপরোয়া ও অতিরিক্ত গতি, চালকের অসতর্কতা, ঝুঁকিপূর্ণ বাঁকে নিয়ন্ত্রণ হারানো, প্রতিযোগিতামূলক ওভারটেকিং, মহাসড়কে নিষিদ্ধ থ্রি-হুইলারের অবাধ চলাচল এবং ট্রাফিক আইন অমান্যের কারণে একের পর এক দুর্ঘটনা ঘটছে।

 গত ২১ মাসে এসব দুর্ঘটনায় ময়মনসিংহে প্রাণ হারিয়েছেন ৩৭০ জন। গুরুতর আহত হয়েছেন আরও ৪১০ জন। বাংলাদেশ সড়ক পরিবহন কর্তৃপক্ষের (বিআরটিএ) তথ্য বিশ্লেষণে এ চিত্র উঠে এসেছে। তথ্য অনুযায়ী, ২০২৫ সালের জানুয়ারি থেকে ২০২৬ সালের সেপ্টেম্বর পর্যন্ত ময়মনসিংহের সড়ক-মহাসড়কে ৩৭৪টি দুর্ঘটনা ঘটেছে। এসব দুর্ঘটনায় ৩৭০ জন নিহত ও ৪১০ জন গুরুতর আহত হয়েছেন। এর মধ্যে চলতি বছরের প্রথম নয় মাসেই ১৫০টি দুর্ঘটনায় ১৫১ জন নিহত এবং ১৪২ জন গুরুতর আহত হয়েছেন। অর্থাৎ চলতি বছর প্রতি দুই দিনে প্রায় একজন করে মানুষের মৃত্যু হয়েছে সড়ক দুর্ঘটনায়। বিআরটিএর তথ্য অনুযায়ী, চলতি বছরের প্রথম নয় মাসে ঢাকা-ময়মনসিংহ মহাসড়কের ত্রিশাল ও ভালুকা অংশে ৭০টি দুর্ঘটনা ঘটেছে। একই সময়ে ময়মনসিংহ-হালুয়াঘাট আঞ্চলিক সড়কের ফুলপুর ও তারাকান্দা উপজেলা অংশে ঘটেছে ৮০টি দুর্ঘটনা।

 দুর্ঘটনার এই চিত্রে সবচেয়ে ঝুঁকিপূর্ণ হয়ে উঠেছে এসব সড়কের বিভিন্ন অংশ। বিপজ্জনক বাঁক, নেই পর্যাপ্ত নিয়ন্ত্রণ সম্প্রতি ফুলপুর-তারাকান্দা সড়ক ঘুরে দেখা যায়, দুর্ঘটনাপ্রবণ বিভিন্ন এলাকায় সড়ক ও জনপথ বিভাগের পক্ষ থেকে সতর্কতামূলক সাইনবোর্ড স্থাপন করা হয়েছে। তবে সড়কটির বিভিন্ন অংশে রয়েছে একাধিক ঝুঁকিপূর্ণ বাঁক। এর মধ্যে তারাকান্দা উপজেলার কাকনি ইউনিয়নের বাগুন্দা এলাকার বাঁকটি বিশেষভাবে ঝুঁকিপূর্ণ। স্থানীয় বাসিন্দা আনোয়ার হোসেন বলেন, বাগুন্দা এলাকায় বাঁকের কারণে যানবাহন চালকদের সতর্ক হয়ে চলাচল করা প্রয়োজন। কিন্তু অনেক চালক দ্রুতগতিতে গাড়ি চালানোর পাশাপাশি ঝুঁকি নিয়ে ওভারটেক করেন। 

এতে প্রায়ই দুর্ঘটনা ঘটে। চার লেনেও কমছে না দুর্ঘটনা ঢাকা-ময়মনসিংহ মহাসড়ক চার লেনে উন্নীত হওয়ার পর সড়কের প্রশস্ততা বেড়েছে; কিন্তু দুর্ঘটনার ঝুঁকি কমেনি। বরং অতিরিক্ত গতির কারণে মহাসড়কের বিভিন্ন অংশে দুর্ঘটনা ঘটছে বলে স্থানীয়দের অভিযোগ। ত্রিশাল উপজেলার বৈলর গ্রামের বাসিন্দা স্বপন মিয়া বলেন, বেপরোয়া গতিতে গাড়ি চালানো এবং চালকের পাশে ডানে-বাঁয়ে যাত্রী বসিয়ে গাড়ি চালানো দুর্ঘটনার অন্যতম কারণ। এর পাশাপাশি উল্টো পথে যানবাহন চালানো এবং প্রতিযোগিতা করে ওভারটেকিংয়ের কারণেও মহাসড়কের বিভিন্ন অংশে দুর্ঘটনা ঘটছে।

 পুলিশ ও রাজনৈতিক নেতারা উদ্যোগ নিলে এসব অনিয়ম অনেকটাই নিয়ন্ত্রণ করা সম্ভব। নিষেধাজ্ঞা থাকলেও মহাসড়কে থ্রি-হুইলার জাতীয় ও আঞ্চলিক মহাসড়কে থ্রি-হুইলার চলাচল নিষিদ্ধ থাকলেও ময়মনসিংহের বিভিন্ন সড়কে এসব যানবাহনের অবাধ চলাচল রয়েছে। ফলে দ্রুতগতির বাস, ট্রাক ও অন্যান্য যানবাহনের সঙ্গে ধীরগতির থ্রি-হুইলারের সংঘর্ষের ঝুঁকি বাড়ছে। ৩৭০ প্রাণহানি, তবু কমছে না ঝুঁকি বিআরটিএর পরিসংখ্যান বলছে, ২০২৫ সালের জানুয়ারি থেকে ২০২৬ সালের সেপ্টেম্বর পর্যন্ত ২১ মাসে ময়মনসিংহের সড়ক-মহাসড়কে ৩৭৪টি দুর্ঘটনায় ৩৭০ জনের মৃত্যু হয়েছে।

 গুরুতর আহত হয়েছেন আরও ৪১০ জন। শুধু চলতি বছরের প্রথম নয় মাসেই প্রাণ গেছে ১৫১ জনের। সড়কের প্রশস্ততা বাড়ছে, উন্নয়ন হচ্ছে অবকাঠামোর; কিন্তু চালকের বেপরোয়া গতি, ঝুঁকিপূর্ণ ওভারটেকিং, মহাসড়কে নিষিদ্ধ থ্রি-হুইলারের চলাচল এবং ট্রাফিক আইন অমান্যের প্রবণতা নিয়ন্ত্রণে না এলে ময়মনসিংহের সড়কে মৃত্যুর এই মিছিল থামানো কঠিন। ময়মনসিংহ নগরের শম্ভুগঞ্জ থেকে ফুলপুর পর্যন্ত প্রায় ২৫ কিলোমিটার সড়ক ৩৪ ফুট প্রশস্ত। আর ফুলপুর থেকে হালুয়াঘাট পর্যন্ত প্রায় ১৮ কিলোমিটার সড়ক ১৮ ফুট প্রশস্ত।

 এ সড়ক দিয়ে ময়মনসিংহের হালুয়াঘাট, ফুলপুর, তারাকান্দা, ধোবাউড়া এবং শেরপুরের বিভিন্ন এলাকার যানবাহন চলাচল করে। সড়কটি তুলনামূলক ভালো হওয়ায় অনেক চালক নির্ধারিত গতিসীমার চেয়ে বেশি গতিতে গাড়ি চালান বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা। ফলে ঝুঁকিপূর্ণ বাঁক ও সরু অংশে নিয়ন্ত্রণ হারিয়ে দুর্ঘটনা ঘটছে। নিরাপদ সড়ক চাই আন্দোলনের ময়মনসিংহের সভাপতি আবদুল কাদির চৌধুরী বলেন, জাতীয় ও আঞ্চলিক মহাসড়কে থ্রি-হুইলার চলাচল নিষিদ্ধ হলেও বাস্তবে এসব যানবাহন নিয়মিত চলাচল করছে। অনেক এলাকায় পর্যাপ্ত লোকাল সার্ভিস না থাকায় মানুষ বাধ্য হয়ে থ্রি-হুইলার ব্যবহার করছেন।

 তিনি আরও বলেন, অতিরিক্ত গতি, ঝুঁকিপূর্ণ ওভারটেকিং, বিপজ্জনক বাঁক এবং ট্রাফিক আইন না মানার প্রবণতার সঙ্গে থ্রি-হুইলারের অবাধ চলাচল যুক্ত হয়ে দুর্ঘটনার ঝুঁকি বাড়াচ্ছে। সড়কে মৃত্যুর মিছিল থামাতে প্রশাসনের নজরদারি বাড়ানোর পাশাপাশি চালক ও পথচারীদেরও ট্রাফিক আইন মেনে চলতে হবে। সড়ক ও জনপথ বিভাগের ময়মনসিংহের নির্বাহী প্রকৌশলী খ. মো. শরীফুল আলম বলেন, দুর্ঘটনাপ্রবণ এলাকাগুলো চিহ্নিত করে গতিসীমা নির্ধারণ করা হয়েছে। কিন্তু অনেক চালক সেই নির্দেশনা মানেন না। সড়ক ভালো হওয়ায় চালকেরা অতিরিক্ত গতিতে গাড়ি চালান। দুর্ঘটনা কীভাবে আরও কমানো যায়, সে বিষয়ে নজরদারি বাড়ানো হচ্ছে।

 ফায়ার সার্ভিস ময়মনসিংহের সহকারী পরিচালক পূর্ণ চন্দ্র মুৎসুদ্দী বলেন, বেপরোয়া গতিতে গাড়ি চালানো, মহাসড়কে কম গতির যানবাহন চলাচল, সড়কের পাশে অকেজো যানবাহন পার্ক করে রাখা এবং ঝুঁকিপূর্ণ ওভারটেকিং—এসব কারণে দুর্ঘটনা ও প্রাণহানি বাড়ছে। তিনি আরও বলেন, থ্রি-হুইলারগুলোও অনেক সময় ট্রাফিক নিয়ম মানে না। ফলে মহাসড়কে দ্রুতগতির যানবাহনের সঙ্গে এসব যানবাহনের সংঘর্ষের আশঙ্কা তৈরি হয়। 

বিআরটিএর সহকারী পরিচালক আনিছুর রহমান বলেন, চালকদের অসতর্কতা ও বেপরোয়া গতির কারণে অনেক দুর্ঘটনা ঘটছে। বিশেষ করে দ্রুতগতির যানবাহনের পাশাপাশি মহাসড়কে থ্রি-হুইলার চলাচল করলে ঝুঁকি আরও বাড়ে। চালকদের সতর্ক হয়ে গাড়ি চালাতে হবে এবং সবাইকে ট্রাফিক আইন মেনে চলতে হবে। তিনি বলেন, বেপরোয়া গতিতে চলা যানবাহনের বিরুদ্ধে পুলিশ দ্রুত ব্যবস্থা নিতে পারে। তবে শুধু আইন প্রয়োগ করলেই হবে না; চালক, যাত্রী ও সাধারণ মানুষ—সবাইকে সচেতন হতে হবে। 

ময়মনসিংহের অতিরিক্ত পুলিশ সুপার (প্রশাসন ও অর্থ) আব্দুল্লাহ আল মামুন বলেন, সড়ক দুর্ঘটনার পেছনে একক কোনো কারণ নেই। বেপরোয়া ও অতিরিক্ত গতি, অসতর্কতা, ঝুঁকিপূর্ণ ওভারটেকিং, চালকের অদক্ষতা, ত্রুটিপূর্ণ যানবাহন, সড়কের ত্রুটি এবং ট্রাফিক আইন না মানাসহ বিভিন্ন কারণ দুর্ঘটনার জন্য দায়ী। তিনি আরও বলেন, অতিরিক্ত গতি চালকের নিয়ন্ত্রণ ও জরুরি পরিস্থিতিতে প্রতিক্রিয়ার সময় কমিয়ে দেয়। তাই দক্ষ ও প্রশিক্ষিত চালক এবং নির্ধারিত গতিসীমা মেনে চলা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। সড়কের ত্রুটি, পর্যাপ্ত সাইন-সিগন্যালের অভাব, ত্রুটিপূর্ণ যানবাহন এবং ট্রাফিক আইন অমান্য দুর্ঘটনার ঝুঁকি বাড়ায়। এ ক্ষেত্রে সংশ্লিষ্ট সব সংস্থার সমন্বিত উদ্যোগ প্রয়োজন। বেপরোয়া গতি নিয়ন্ত্রণ, নিয়মিত ট্রাফিক আইন প্রয়োগ, ফিটনেসবিহীন যানবাহনের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা, চালকদের প্রশিক্ষণ ও বিশ্রাম নিশ্চিত করা, সড়কের ত্রুটি সংশোধন এবং দুর্ঘটনাপ্রবণ এলাকায় বিশেষ নজরদারি বাড়ানোর ওপর গুরুত্ব দেন তিনি। তার মতে, চালকদের নিরাপদ গতি ও দূরত্ব বজায় রেখে গাড়ি চালাতে হবে। 

মোবাইল ফোন ব্যবহার ও ঝুঁকিপূর্ণ ওভারটেকিং পরিহার করতে হবে। পথচারীদেরও নির্ধারিত স্থান দিয়ে রাস্তা পার হতে হবে। একই সঙ্গে দুর্ঘটনার তথ্য বিশ্লেষণ করে ঝুঁকিপূর্ণ স্থানগুলো চিহ্নিত করে সেখানে স্পিড মনিটরিং, ট্রাফিক পুলিশের নজরদারি, সাইন-সিগন্যাল ও রোড মার্কিং জোরদার করা প্রয়োজন।

আরও পড়ুন

সাম্প্রতিক সংবাদ

সর্বাধিক পঠিত