ময়মনসিংহ মেইল

তিন বছরেও চালু হয়নি শান্তি নিবাস, নষ্ট হচ্ছে কোটি টাকার সরঞ্জাম

বৃহত্তর ময়মনসিংহ · 2026-10-02 10:11:17 · স্টাফ রিপোর্টার

অসহায় ও অবহেলিত প্রবীণদের নিরাপদ আবাসন, চিকিৎসা ও দৈনন্দিন সেবার জন্য প্রায় ৭ কোটি টাকা ব্যয়ে নির্মাণ করা হয়েছে তিনতলা ভবন। সেখানে রয়েছে বিছানা, আলমারি, টেবিল, লিফট, চিকিৎসাসামগ্রী ও শরীরচর্চার সরঞ্জাম। কিন্তু নির্মাণকাজ শেষ হওয়ার প্রায় তিন বছর পেরিয়ে গেলেও চালু হয়নি প্রতিষ্ঠানটি। ফলে অব্যবহৃত অবস্থায় পড়ে থেকে নষ্ট হচ্ছে আসবাবপত্র ও অন্যান্য সরঞ্জাম। বৃষ্টির পানি ঢুকে ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে ভবনের ভেতরের বিভিন্ন সামগ্রী। এমনকি ভবনের অগ্নিনির্বাপক যন্ত্রগুলোর মেয়াদও শেষ হয়ে গেছে।

ময়মনসিংহ নগরের শম্ভুগঞ্জে সরকারি শিশু পরিবার (বালক) চত্বরে নির্মিত ২৫ শয্যার ‘শান্তি নিবাস’-এর বর্তমান চিত্র এটি। প্রতিষ্ঠানটি চালু না হওয়ায় একদিকে যেমন অসহায় প্রবীণেরা আবাসন ও সেবা থেকে বঞ্চিত হচ্ছেন, অন্যদিকে সরকারি অর্থে কেনা মূল্যবান সরঞ্জামও নষ্ট হচ্ছে।

সমাজসেবা অধিদপ্তর বলছে, প্রয়োজনীয় জনবল নিয়োগ ও বরাদ্দ না পাওয়ায় প্রতিষ্ঠানটির কার্যক্রম শুরু করা সম্ভব হচ্ছে না। জনবল নিয়োগের প্রক্রিয়া চলছে। তা শেষ হলে কার্যক্রম শুরু করা হবে।

সমাজকল্যাণ মন্ত্রণালয়ের অধীন সমাজসেবা অধিদপ্তর ‘৮টি সরকারি শিশু পরিবারে ২৫ শয্যাবিশিষ্ট শান্তি নিবাস স্থাপন’ প্রকল্পের আওতায় ময়মনসিংহে এই প্রতিষ্ঠান নির্মাণ করে। ২০২০ সালের জুলাই থেকে ২০২৩ সালের জুন মেয়াদের প্রকল্পটির মোট ব্যয় ছিল ৭৩ কোটি ৯৮ লাখ ৯১ হাজার টাকা। এর মধ্যে ময়মনসিংহের শান্তি নিবাস নির্মাণে ব্যয় হয় ৬ কোটি ৯৫ লাখ ৫২ হাজার টাকা।

২০২২ সালের ২০ সেপ্টেম্বর ভবনটির নির্মাণকাজ শুরু হয়। কাজ শেষ হওয়ার পর ২০২৩ সালের ১৪ নভেম্বর তৎকালীন সরকারপ্রধান প্রতিষ্ঠানটির উদ্বোধন করেন। কোহিনূর এন্টারপ্রাইজ নামের একটি ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠান ভবনটি নির্মাণ করে। ভবন নির্মাণের পাশাপাশি আসবাবপত্রসহ প্রয়োজনীয় সব সরঞ্জাম সরবরাহ করা হয়। তবে উদ্বোধনের পর দীর্ঘ সময় পেরিয়ে গেলেও সেখানে কোনো প্রবীণের থাকার ব্যবস্থা করা যায়নি।

সম্প্রতি সরেজমিনে দেখা যায়, সরকারি শিশু পরিবারের ভেতরে থাকা শান্তি নিবাসের তিনতলা ভবনটির সব কক্ষ তালাবদ্ধ। কক্ষগুলোতে বিছানা, আলমারি, টেবিলসহ নানা ধরনের আসবাবপত্র পড়ে আছে। দীর্ঘদিন ব্যবহার না হওয়ায় সেগুলোতে ধুলার আস্তরণ জমেছে। কয়েকটি কক্ষে বৃষ্টির পানি ঢুকে আসবাবপত্রের ক্ষতি হচ্ছে। পানি থেকে রক্ষা করতে কোথাও কোথাও খাটের ওপর টেবিল ও আলমারি তুলে রাখা হয়েছে।

ভবনের নিচতলায় রয়েছে চিকিৎসকের কক্ষ, চিকিৎসাসামগ্রীর কক্ষ, শরীরচর্চার কক্ষ, ডাইনিং রুম, রান্নাঘর ও অতিথিদের থাকার কক্ষ। চিকিৎসাসামগ্রী এখনো বাক্সবন্দি অবস্থায় পড়ে আছে। জিম করার কক্ষে রয়েছে ব্যায়ামের বিভিন্ন সরঞ্জাম। দ্বিতীয় ও তৃতীয় তলার কক্ষগুলোতেও বিছানা ও দৈনন্দিন ব্যবহারের নানা জিনিসপত্র রাখা হয়েছে। দীর্ঘদিন অব্যবহৃত থাকায় এরই মধ্যে অনেক আসবাবপত্র নষ্ট হয়ে গেছে।

প্রতিটি তলায় অগ্নিনির্বাপণের জন্য যন্ত্র রাখা হলেও সেগুলোর মেয়াদ শেষ হয়েছে। ভবনে লিফটের ব্যবস্থাও রয়েছে। তবে নির্মাণের পর থেকে এক দিনের জন্যও সেটি ব্যবহার করা হয়নি। বিদ্যুৎ সংযোগ থাকলেও প্রায় আড়াই লাখ টাকা বিল বকেয়া পড়ায় সংযোগ বিচ্ছিন্ন করে দিয়েছে বিদ্যুৎ বিভাগ।

সরকারি শিশু পরিবারে বড় ভাইয়া পদে কর্মরত মোহাম্মদ মোশাররফ হোসেন শান্তি নিবাসের কক্ষগুলো ঘুরিয়ে দেখান। তিনি বলেন, বৃষ্টির সময় ভবনের বিভিন্ন জায়গায় পানি জমে থাকে। পানি বের হওয়ার সরু পাইপ ময়লা ও পাতায় আটকে যাওয়ায় কক্ষের ভেতরে পানি ঢুকে আসবাবপত্র নষ্ট হচ্ছে। প্রায় সব আসবাবপত্রই নষ্ট হওয়ার পথে। নির্মাণকাজ শেষ ও উদ্বোধনের পর থেকেই ভবনটি এ অবস্থায় পড়ে আছে। মাঝেমধ্যে সরকারি কর্মকর্তারা এসে ঘুরে যান।

প্রবীণদের জন্য ছিল নানা সুবিধা

শান্তি নিবাসে শুধু প্রবীণদের থাকার ব্যবস্থাই করা হয়নি, তাদের চিকিৎসা, হুইলচেয়ার, শারীরিক ব্যায়াম ও দৈনন্দিন সেবার ব্যবস্থাও রাখা হয়েছে। ভবনের নিচতলায় চিকিৎসাসামগ্রীর জন্য একটি কক্ষ এবং ব্যায়ামের সরঞ্জাম রাখার জন্য আলাদা কক্ষ রয়েছে।

সরকারি শিশু পরিবারের কারিগরি প্রশিক্ষক মো. মোসলেম মিয়া বলেন, প্রবীণদের লালন-পালনের জন্য শান্তি নিবাসটি নির্মাণ করা হয়েছে। ভবনটিতে দামি বিছানা ও আসবাবপত্র রয়েছে। ভেতরের পরিবেশ অনেকটা পাঁচ তারকা হোটেলের মতো। প্রবীণদের ওঠানামার জন্য লিফট এবং চিকিৎসার সরঞ্জামও রয়েছে। কিন্তু দীর্ঘদিন ব্যবহার না হওয়ায় আলমারি, বিছানাপত্র, মশারি ও কাপড়সহ বিভিন্ন সামগ্রী নষ্ট হচ্ছে। বৃষ্টির পানি ঢুকেও আসবাবপত্রের ক্ষতি হচ্ছে।

সমাজসেবা অধিদপ্তরের তথ্যমতে, ৬০ বছরের বেশি বয়সী পরিত্যক্ত, অসহায়, দরিদ্র ও অবহেলিত প্রবীণদের জন্য এই শান্তি নিবাস নির্মাণ করা হয়েছে। এখানে ২৫ জন প্রবীণের নিরাপদ আবাসন, খাবার, চিকিৎসা ও অন্যান্য প্রয়োজনীয় সেবা দেওয়ার পরিকল্পনা ছিল।

তবে প্রতিষ্ঠানটি নির্মাণের পেছনে আরেকটি বিশেষ উদ্দেশ্যও ছিল। সরকারি শিশু পরিবারের এতিম শিশুরা যাতে প্রবীণদের কাছ থেকে দাদা-দাদি কিংবা নানা-নানির স্নেহ পায় এবং প্রবীণরাও শিশুদের সান্নিধ্যে একাকিত্ব কাটাতে পারেন, সেই লক্ষেই শিশু পরিবারের অভ্যন্তরে শান্তি নিবাসটি নির্মাণ করা হয়। কিন্তু প্রতিষ্ঠানটি চালু না হওয়ায় সেই পরিকল্পনাও বাস্তবায়িত হয়নি।

সরকারি শিশু পরিবারে প্রায় দুই বছর ধরে থাকছে ১০ বছর বয়সী রিফাত মিয়া। তার বাড়ি ফুলপুর উপজেলার সল্পা গ্রামে। বছর খানেক আগে তার বাবা মারা যান। মা বাড়িতে থাকেন। মৃত্যুর আগে বাবা পক্ষাঘাতে আক্রান্ত হলে রিফাতের ঠাঁই হয় সরকারি শিশু পরিবারে।

শিশু পরিবার চত্বরে দাঁড়িয়ে রিফাত মিয়া বলে, এখানে বয়স্ক মানুষ থাকলে আমাদের দাদা-নানার মতো থাকতেন। তাদের সঙ্গে সময় কাটানো যেত, আমাদেরও ভালো লাগত।

শান্তি নিবাস চালু না হওয়া এবং এর সরঞ্জাম নষ্ট হওয়ার ঘটনায় ক্ষোভ প্রকাশ করেছেন সুশাসনের জন্য নাগরিক (সুজন) ময়মনসিংহ মহানগরের সম্পাদক আলী ইউসুফ। তিনি বলেন, সরকারের অনেক ভালো উদ্যোগ রয়েছে। কিন্তু দায়িত্বপ্রাপ্ত ব্যক্তিদের গাফিলতির কারণে মানুষ সেসব উদ্যোগের সুফল পায় না। নগরের শম্ভুগঞ্জে প্রবীণদের জন্য এত বড় আয়োজন করা হলেও তা চালু হয়নি। এতে অসহায় প্রবীণেরা সেবা থেকে বঞ্চিত হচ্ছেন, পাশাপাশি সরকারি অর্থে কেনা সরঞ্জামও নষ্ট হচ্ছে।

আলী ইউসুফ আরও জানান, তারা চান দ্রুত শান্তি নিবাসটি চালু করা হোক, যাতে রাস্তায় কোনো বৃদ্ধকে অবহেলায় পড়ে থাকতে না হয়।

এদিকে সম্প্রতি সমাজকল্যাণমন্ত্রী প্রতিষ্ঠানটি পরিদর্শন করেছেন এবং দ্রুত চালুর আশ্বাস দিয়েছেন বলে জানিয়েছেন ময়মনসিংহ সমাজসেবা অধিদপ্তরের উপপরিচালক মো. রাজু আহমেদ।

তিনি বলেন, শান্তি নিবাসের অবকাঠামো নির্মাণেরকাজ শেষ হয়েছে। বর্তমানে প্রয়োজনীয় জনবল নিয়োগের প্রক্রিয়া চলছে। জনবল ও বরাদ্দ পাওয়া গেলেই প্রতিষ্ঠানটির কার্যক্রম শুরু হবে। এখানে প্রবীণদের থাকা-খাওয়া, চিকিৎসা ও হালকা ব্যায়ামের ব্যবস্থা থাকবে। এ জন্য একজন কর্মকর্তা, কেয়ারগিভার, কম্পাউন্ডার, স্বাস্থ্যসেবাকর্মী ও থেরাপিস্ট রাখার পরিকল্পনা রয়েছে।

সরঞ্জাম নষ্ট হওয়ার বিষয়ে মো. রাজু আহমেদ বলেন, প্রতিষ্ঠানটি চালু হলে নিয়মিত ব্যবহার ও রক্ষণাবেক্ষণের মাধ্যমে এ সমস্যা থাকবে না।


আরও পড়ুন

সাম্প্রতিক সংবাদ

সর্বাধিক পঠিত