গরু পালনে বাড়ছে খরচ, নান্দাইলে বিপাকে ক্ষুদ্র খামারিরা
বৃহত্তর ময়মনসিংহ · 2026-10-03 07:11:44 · ফরিদ মিয়া
গবাদিপশু পালন করে সংসারে স্বচ্ছলতা ফেরানোর স্বপ্ন দেখেন নান্দাইলের অনেক কৃষক। কেউ বাড়ির উঠানে দুই-তিনটি গরু পালন করেন, আবার কেউ গড়ে তুলেছেন ছোট-বড় খামার। কিন্তু সাম্প্রতিক সময়ে গো-খাদ্যের দাম বেড়ে যাওয়ায় সেই স্বপ্নে চাপ তৈরি হয়েছে। খৈল, ভুসি, ভুট্টা, দানাদার ফিডসহ বিভিন্ন ধরনের খাদ্যের মূল্যবৃদ্ধিতে বেড়েছে গরু পালনের খরচ।
খামারিদের অভিযোগ, খাদ্যের দাম বাড়লেও গরুর বাজারদর সব সময় সেই অনুপাতে বাড়ে না। ফলে গরু বিক্রির সময় প্রত্যাশিত লাভ পাওয়া কঠিন হয়ে পড়ছে। বিশেষ করে যেসব খামারি বাজার থেকে অধিকাংশ খাদ্য কিনে গরু পালন করেন, তাঁদের ব্যয় বেড়েছে সবচেয়ে বেশি।
নান্দাইল উপজেলার বিভিন্ন এলাকার খামারি ও গরু পালনকারীদের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, গরু পালনে সবচেয়ে বড় ব্যয়ের একটি অংশ খাবার। একটি গরু মোটাতাজা করতে কয়েক মাস ধরে নিয়মিত খড়, ঘাস, ভুসি, খৈল, ভুট্টা ও দানাদার খাবার দিতে হয়। খাদ্যের দাম একবার বাড়লে পুরো পালনকালীন ব্যয়ের ওপর এর প্রভাব পড়ে।
স্থানীয় খামারি এহসানুল হক তানভীন বলেন, আগে যে টাকা দিয়ে নির্দিষ্ট পরিমাণ খাবার কিনতাম, এখন একই পরিমাণ খাবার কিনতে বেশি টাকা লাগছে। গরুর খাবারের খরচ বাড়লেও বিক্রির সময় সেই বাড়তি খরচ পুরোপুরি পাওয়া যায় না।
আরেক খামারি শামীম ফকির বলেন, ছোট খামারিদের জন্য পরিস্থিতি বেশি কঠিন। নিজের জমিতে ঘাস বা খড়ের ব্যবস্থা না থাকলে প্রায় সব খাবার বাজার থেকে কিনতে হয়। এতে গরু পালন করে লাভ করা কঠিন হয়ে যাচ্ছে।
খামারিদের পাশাপাশি গো-খাদ্য বিক্রেতাদের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, এক সপ্তাহ -দশ দিন ব্যবধানে বিভিন্ন ধরনের গো-খাদ্যের দাম বস্তাপ্রতি ২০০ থেকে ৮০০ টাকা পর্যন্ত বেড়েছে।
স্থানীয় বাজারে ভুট্টার দাম প্রতি বস্তা ১ হাজার ৬০০ টাকা থেকে বেড়ে ১ হাজার ৭৫০ টাকা হয়েছে। সয়াবিনের খৈল ২ হাজার ৯০০ টাকা থেকে বেড়ে ৩ হাজার ৭০০ টাকা, সয়াবিনের ভূষি ১ হাজার ৬০ টাকা থেকে বেড়ে ১ হাজার ১৬০ টাকা এবং গমের ভুসি ১ হাজার ৬৫০ টাকা থেকে বেড়ে ১ হাজার ৮৭০ টাকা হয়েছে বলে জানিয়েছেন ব্যবসায়ীরা।
ব্যবসায়ীদের ভাষ্য, বিভিন্ন কাঁচামালের মূল্যবৃদ্ধির পাশাপাশি পরিবহন ও সরবরাহ ব্যয়ের প্রভাবও পড়ছে গো-খাদ্যের বাজারে। ফলে প্রস্তুত পশুখাদ্যের দামও বাড়ছে।
গরু পালনের সঙ্গে যুক্ত কৃষকদের ভাষ্য, শুধু খাদ্য নয়, গরুর চিকিৎসা, শ্রম, পরিবহন ও পরিচর্যার খরচও রয়েছে। এর সঙ্গে খাদ্যের দাম যুক্ত হওয়ায় মোট উৎপাদন ব্যয় বাড়ছে।
নান্দাইলের এক খামারি বলেন, গরু পালন করে লাভের আশায় টাকা বিনিয়োগ করি। কিন্তু খাবারের দাম যদি এভাবে বাড়তে থাকে, তাহলে লাভের বড় অংশ খাদ্য কিনতেই চলে যাবে।
ক্ষুদ্র খামারিদের অনেকে বলছেন, তাঁরা ব্যাংক বা এনজিও থেকে ঋণ নিয়ে গরু কিনে পালন করেন। নির্ধারিত সময়ে গরু বিক্রি করে ঋণ পরিশোধ করতে হয়। খাদ্যের দাম বেড়ে গেলে তাঁদের আর্থিক ঝুঁকিও বাড়ে।
খামারিদের অভিযোগ, বাজারে কোনো কোনো সময় সরবরাহ ও চাহিদার অজুহাতে গো-খাদ্যের দাম বাড়ানো হয়। তাই গো-খাদ্যের বাজারে নিয়মিত নজরদারি প্রয়োজন। অস্বাভাবিক মূল্যবৃদ্ধি হলে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষকে ব্যবস্থা নেওয়ার দাবি জানিয়েছেন তাঁরা।
নান্দাইলের গ্রামীণ অর্থনীতিতে গবাদিপশু পালন গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে। অনেক পরিবার কৃষিকাজের পাশাপাশি গরু পালন করে বাড়তি আয় করে। ঈদুল আজহাকে সামনে রেখে অনেকে গরু মোটাতাজাকরণের কাজও করেন।
খাদ্যের দাম অস্বাভাবিকভাবে বাড়তে থাকলে ছোট খামারিরা গরুর সংখ্যা কমিয়ে দিতে পারেন বলে আশঙ্কা করছেন সংশ্লিষ্টরা। এতে স্থানীয়ভাবে গরু পালন কমার পাশাপাশি ভবিষ্যতে মাংস ও দুধ উৎপাদনের ব্যয়ের ওপরও প্রভাব পড়তে পারে।
খামারিদের দাবি, গো-খাদ্যের বাজারে অস্বাভাবিক মূল্যবৃদ্ধি বন্ধে নিয়মিত বাজার মনিটরিং, সরবরাহব্যবস্থা স্বাভাবিক রাখা এবং খামারিদের জন্য সহজ শর্তে ঋণ ও সরকারি সহায়তা নিশ্চিত করা প্রয়োজন।
তাঁদের মতে, গরু পালনকে লাভজনক রাখতে শুধু গরুর বাজারদর নয়, খাদ্যসহ সামগ্রিক উৎপাদন ব্যয়ের বিষয়টিও গুরুত্ব দিয়ে দেখতে হবে। নান্দাইলে গো-খাদ্যের দাম নিয়ন্ত্রণে কার্যকর উদ্যোগ নেওয়া না হলে ক্ষুদ্র ও মাঝারি খামারিরা সবচেয়ে বেশি চাপে পড়বেন।