ময়মনসিংহ মেইল

ঝিনাইগাতী গারো পাহাড়ে পাথর-বালু লুটের মহোৎসব

বৃহত্তর ময়মনসিংহ · 2026-10-06 14:06:30 · স্টাফ রিপোর্টার

শেরপুরের ঝিনাইগাতী সীমান্তে গারো পাহাড়ের নদী-ঝরনা ও পাহাড় কেটে অবাধে পাথর-বালু উত্তোলনের অভিযোগ উঠেছে। স্থানীয়দের অভিযোগ, দীর্ঘদিন ধরে একটি চক্র দিনের বেলায় প্রকাশ্যে পাহাড় ও নদী-ঝরনা থেকে পাথর-বালু তুলে বিভিন্ন স্থানে স্তূপ করে রাখছে। পরে রাতের আঁধারে ঘোড়ার গাড়ি, ভ্যান, ট্রলি, মাহিন্দ্র ও ট্রাকে করে এসব প্রাকৃতিক সম্পদ বিভিন্ন স্থানে পাচার করে বিক্রি করা হচ্ছে।

গত ৮ সেপ্টেম্বর রাতে বালুভর্তি মাহিন্দ্র পরিবহনের সময় বাকাকুড়া এলাকায় নিয়ন্ত্রণ হারিয়ে মিজান মিয়া (১৭) নামে এক চালক নিহত হন। মিজান সন্ধ্যাকুড়া গ্রামের মরহুম টুকন মিয়ার ছেলে। অবাধে পাহাড় কেটে পাথর ও বালু উত্তোলন করায় গারো পাহাড় ক্ষতবিক্ষত হয়ে পরেছে। উত্তোলনকৃত পাথর বালু পরিবহনের জন্য বন কেটে বনের মাঝখান দিয়ে তৈরি করা হয়েছে রাস্তা। প্রাকৃতিক সৌন্দর্যের কারণে গারো পাহাড়ের ঝিনাইগাতী অংশ দীর্ঘদিন ধরেই পর্যটকদের কাছে আকর্ষণীয়। এ সৌন্দর্যকে ঘিরে জেলা প্রশাসনের উদ্যোগে ১৯৯৩ সালে গজনী এলাকায় গড়ে তোলা হয় ‘গজনী অবকাশ’ বিনোদনকেন্দ্র। দেশের বিভিন্ন স্থান থেকে প্রতিবছর এখানে ভ্রমণপিপাসু মানুষ ছুটে আসেন। এখান থেকে সরকারের ঘরে আসে বিপুল পরিমাণের রাজস্ব। তবে অভিযোগ রয়েছে, পর্যটন ও প্রাকৃতিক সৌন্দর্যের এই এলাকায় নির্বিচারে পাথর-বালু উত্তোলনের কারণে পরিবেশের ওপর বিরূপ প্রভাব পড়ছে। কাংশা ইউনিয়নের সীমান্তবর্তী কালঘোষা নদীর গান্ধিগাঁও, দরবেশতলা, হালচাটি, মালিটিলা, বাকাকুড়া, গজনী ও ছোট গজনীসহ বিভিন্ন এলাকায় এবং সংরক্ষিত বনাঞ্চলে পাথর-বালু উত্তোলন চলছে বলে স্থানীয়দের দাবি।

স্থানীয়দের অভিযোগ, শতাধিক শ্রমিক বেলচা, কোদালসহ বিভিন্ন সরঞ্জাম দিয়ে পাহাড় কেটে এবং নদী-ঝরনা থেকে পাথর-বালু সংগ্রহ করছেন। উত্তোলন করা পাথর-বালু টুকরিতে করে সংরক্ষিত বনাঞ্চলের বিভিন্ন স্থানে স্তূপ করে রাখা হয়। পরে রাত ১২টার পর এসব পাথর-বালু বিভিন্ন যানবাহনে করে উপজেলা ও জেলা সদরসহ দেশের বিভিন্ন স্থানে পাঠানো হয়। তাদের ভাষ্য, প্রতিদিন রাত ১২টা থেকে সকাল ৮টা পর্যন্ত উত্তোলন ও পরিবহনের এ কর্মকাণ্ড চলে। এতে প্রতিরাতে বিপুল পরিমাণ পাথর-বালু পাচার হচ্ছে।

স্থানীয়দের ভাষ্য, দীর্ঘদিন ধরে এভাবে পাথর-বালু উত্তোলনের কারণে পাহাড়ের মাটি ও ঢাল ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে। একই সঙ্গে নদী-ঝরনার তলদেশের পরিবর্তন ঘটায় স্বাভাবিক পানিপ্রবাহ বাধাগ্রস্ত হচ্ছে। এর প্রভাব পড়ছে বন, বন্যপ্রাণী ও সামগ্রিক জীববৈচিত্র্যের ওপর।

অবৈধ উত্তোলন বন্ধে উপজেলা প্রশাসন বিভিন্ন সময়ে ভ্রাম্যমাণ আদালত পরিচালনা করেছে। এসব অভিযানে বালুবাহী যানবাহন আটক, জরিমানা এবং জড়িত ব্যক্তিদের বিভিন্ন মেয়াদে সাজা দেওয়ার ঘটনাও ঘটেছে। তবে অভিযানের পরও পাথর-বালু উত্তোলন বন্ধ হয়নি বলে অভিযোগ স্থানীয়দের। বর্তমানে প্রতিরাতেই লাখ টাকা মূল্যের পাথর ও বালু লুটপাট করা হলেও অজ্ঞাত কারণে প্রশাসন নিরব ভূমিকা পালন করে আসছে।

গত ৩ জুন রাতে বালুভর্তি চারটি মাহিন্দ্র আটককে কেন্দ্র করে বন বিভাগের কর্মকর্তা-কর্মচারীদের ওপর হামলার অভিযোগ ওঠে। স্থানীয়দের ভাষ্য, ওই ঘটনায় বন কর্মকর্তা ছালেহিন নেওয়াজ ও বনপ্রহরী জিয়াউর রহমান আহত হন। এ ঘটনার পর পাথর-বালু উত্তোলনকারীদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নিতে বন বিভাগের মাঠপর্যায়ের কর্মকর্তারাও চাপের মুখে পড়েছেন বলে জানা গেছে। তবে বন বিভাগের বক্তব্য, নদীর বালু জেলা প্রশাসনের অধীন। ফলে নদী থেকে বালু উত্তোলন বন্ধের মূল দায়িত্ব বন বিভাগের নয়। বন বিভাগের পক্ষ থেকে বলা হয়েছে, কেউ বালুভর্তি গাড়ি পাচারের সময় সন্ধান দিলে তা আটক করা হবে। এ বিষয়ে উপজেলা সহকারী কমিশনার (ভূমি) অনিন্দা রানী ভৌমিকের সঙ্গে কথা হলে তিনি বলেন, তদন্ত সাপেক্ষে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়া হবে। সাংবাদিকদের পক্ষ থেকে উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) মো, আল আমীনের সাথে কথা হলে তিনি বলেন আমি কি পাথর বালু ধরে বসে থাকবো। স্থানীয় সচেতন মহলের দাবি, গারো পাহাড়ের পরিবেশ ও জীববৈচিত্র্য রক্ষায় বিচ্ছিন্ন অভিযান দিয়ে পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণ করা সম্ভব নয়। পাথর-বালু উত্তোলনের সঙ্গে জড়িতদের চিহ্নিত করে কঠোর আইনগত ব্যবস্থা নেওয়ার পাশাপাশি সংরক্ষিত বনাঞ্চলে নিয়মিত ও সমন্বিত নজরদারি জোরদার করতে হবে।


আরও পড়ুন

সাম্প্রতিক সংবাদ

সর্বাধিক পঠিত