ইমিগ্রেশন পুলিশের হাতে আটক আসামিকে ছেড়ে দেওয়ার অভিযোগ
বৃহত্তর ময়মনসিংহ · 2026-10-06 14:09:25 · স্টাফ রিপোর্টার
কিশোরগঞ্জের ভৈরব থানায় ইমিগ্রেশন পুলিশের হাতে আটক এক আসামিকে ছেড়ে দেওয়ার অভিযোগ উঠেছে থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) মো. মাহবুবুর রহমানের বিরুদ্ধে। তবে ওসি দাবি করেছেন, আদালতের আদেশ অনুযায়ী ওই আসামিকে ছেড়ে দেওয়া হয়েছে।
সোমবার (৫ অক্টোবর) দিবাগত রাত আনুমানিক ১২টার দিকে আরিয়ান খুলুদ নামে ওই আসামিকে ছেড়ে দেওয়া হয় বলে অভিযোগ উঠেছে। পুলিশের দাবি, আরিয়ান খুলুদের পক্ষে আদালতের আদেশ (রিকল) থাকায় তাকে ছেড়ে দেওয়া হয়েছে। তবে পুলিশের কাছে থাকা রিকলে কিশোরগঞ্জের সিনিয়র জুডিশিয়াল ম্যাজিস্ট্রেট বিশ্বজিৎ চক্রবর্তীর নাম থাকলেও বিচারকের স্বাক্ষর না থাকায় সেটি আসল না নকল—এ নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে।
বিষয়টি তদন্ত করে জড়িতদের বিরুদ্ধে আইনগত ব্যবস্থা নেওয়ার দাবি জানিয়েছেন স্থানীয় সচেতন মহল। খোঁজ নিয়ে জানা যায়, ভৈরব থানার মামলা নম্বর ৩৭(৩)/২০২৬ ও সিআর মোকদ্দমা নম্বর ৩৯/২০২৬-এর আসামি আরিয়ান খুলুদ। মামলায় দণ্ডবিধির ১৪৩, ৪৪৮, ৩২৩, ৩০৭, ৩৮৪, ৪২৭, ৪৪৭, ৫০৬(১), ৫০০ ও ৩৪ ধারা এবং বিশেষ ক্ষমতা আইনের ৭/৩০ ধারায় অভিযোগ আনা হয়েছে। সূত্র জানায়, আরিয়ান খুলুদের দেশত্যাগে নিষেধাজ্ঞা থাকায় ৫ অক্টোবর পর্তুগালের উদ্দেশ্যে বিদেশ যাওয়ার সময় হযরত শাহজালাল আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরের ইমিগ্রেশন পুলিশ তাকে আটক করে ভৈরব থানা পুলিশকে বিষয়টি জানায়। পরে সোমবার বেলা ১১টার দিকে ভৈরব থানার উপপরিদর্শক (এসআই) শক্তি পদ মৃধা ইমিগ্রেশন পুলিশের সঙ্গে যোগাযোগ করেন। এরপর দুপুর ২টার দিকে আরিয়ান খুলুদকে ভৈরব থানায় নিয়ে আসা হয়। অভিযোগ রয়েছে, তাকে ছাড়িয়ে নিতে সোমবার বিকেল থেকে রাত পর্যন্ত একটি প্রভাবশালী মহল ওসি মাহবুবুর রহমানের সঙ্গে যোগাযোগ করে। পরে মোটা অঙ্কের অর্থের বিনিময়ে গভীর রাতে তাকে থানা থেকে ছেড়ে দেওয়া হয় বলেও অভিযোগ উঠেছে।
তবে অর্থ লেনদেনের অভিযোগ অস্বীকার করেছেন সংশ্লিষ্ট পুলিশ কর্মকর্তারা। শহরের ভৈরবপুর উত্তরপাড়ার মৃত বশির মিয়ার ছেলে আরিয়ান খুলুদের বিরুদ্ধে চারটি মামলা রয়েছে বলে জানা গেছে। একটি সূত্রের দাবি, চার মামলার মধ্যে একটি মামলায় তিনি খালাস পেয়েছেন। পুলিশের কাছে থাকা রিকল পর্যালোচনায় দেখা যায়, ৩৭(১)/২০২৬ নম্বর মামলায় আসামি আরিয়ান খুলুদ গত ৩ মে ২০২৬ আদালতে হাজির হলে কিশোরগঞ্জ দায়রা ও জজ আদালতের বিচারকের আদেশে জামিন পান। তবে এরপর দীর্ঘ প্রায় পাঁচ মাস পার হলেও ওই রিকল ভৈরব থানায় জমা ছিল না বলে সংশ্লিষ্ট সূত্রের দাবি।
সোমবার ইমিগ্রেশন পুলিশ আরিয়ান খুলুদকে এসআই শক্তি পদ মৃধার কাছে হস্তান্তরের পর তাকে ভৈরব থানায় নিয়ে আসা হয়। পরে রাতে কিশোরগঞ্জের সিনিয়র জুডিশিয়াল ম্যাজিস্ট্রেট বিশ্বজিৎ চক্রবর্তীর স্বাক্ষরবিহীন একটি রিকলের ভিত্তিতে তাকে ছেড়ে দেওয়া হয় বলে অভিযোগ। ওই স্বাক্ষরবিহীন রিকলের একটি কপি গোয়েন্দা সংস্থা ও সাংবাদিকরা ভৈরব থানা পুলিশের কাছ থেকে সংগ্রহ করেছেন বলে জানা গেছে। এ বিষয়ে ভৈরব থানার এসআই শক্তি পদ মৃধা বলেন, পর্তুগালের উদ্দেশ্যে দেশ ছাড়ার সময় ইমিগ্রেশন পুলিশ আরিয়ান খুলুদকে আটক করে। বাড়িঘর ভাঙচুর ও লুটপাটের ঘটনায় করা মামলার বাদী তাহমিনা বেগম ইমিগ্রেশন পুলিশকে বিষয়টি অবগত করলে তার পাসপোর্ট ব্লক করা হয়। তিনি বলেন, ‘সোমবার বেলা ১১টায় ইমিগ্রেশন পুলিশের কাছ থেকে খুলুদকে নিয়ে দুপুরে থানায় আসি। এই মামলার রিকল থানায় জমা ছিল না।
গতকাল রাতে রিকলটি থানায় জমা দেওয়া হলে ওসি স্যার তা যাচাই-বাছাই করেন। যাচাই-বাছাই করে রিকলটি সঠিক হওয়ায় এসপি স্যারের নির্দেশে তাকে রাতে ছেড়ে দেওয়া হয়।’ এসআই শক্তি পদ মৃধা আরও বলেন, ‘তার নামে চারটি মামলা রয়েছে। এর মধ্যে একটি মামলায় আদালত থেকে খালাস পেয়েছে। বাসস্ট্যান্ডে বিভিন্ন মারামারির মামলাও ছিল তার বিরুদ্ধে। সে কোনো আওয়ামী লীগের রাজনীতির সঙ্গে জড়িত নয়। বিদেশে যেহেতু চলে যাবে, এখানে একটি সুযোগ পেয়েছে।’ আসামিকে ছেড়ে দেওয়ার ক্ষেত্রে মোটা অঙ্কের টাকা লেনদেন হয়েছে কি না জানতে চাইলে তিনি তা অস্বীকার করেন।
অভিযোগের বিষয়ে ভৈরব থানার ওসি মো. মাহবুবুর রহমান বলেন, ‘পাসপোর্ট লক থাকায় ইমিগ্রেশন পুলিশ তাকে আটক করে। এর আগে থানা থেকে আবেদন দেওয়ার পর আদালত থেকে পাসপোর্টটি লক করা হয়।’ তিনি বলেন, ‘ইমিগ্রেশন পুলিশের কাছ থেকে আটক হওয়া আসামি আরিয়ান খুলুদকে ভৈরব থানায় নিয়ে এসে যাচাই-বাছাই করে দেখলাম, তার বিরুদ্ধে কোনো কিছু নেই, কোনো মামলাও নেই, ওয়ারেন্টও নেই। যার কারণে খুলুদকে ছেড়ে দেওয়া হয়েছে।’ রিকলে বিচারকের স্বাক্ষর না থাকার বিষয়ে জানতে চাইলে ওসি বলেন, ‘রিকলটি আমার কাছে আগে থেকেই আছে।
আমি তো কোর্ট থেকে খবর নিয়েছি, সে জামিনে আছে।’ এ বিষয়ে কিশোরগঞ্জ জেলা পুলিশ সুপার মিজানুর রহমান শৈলীর সঙ্গে মুঠোফোনে যোগাযোগ করা হলে তিনি বলেন, ‘আমরা কোর্ট থেকে অরিজিনালটি আনছি এবং ফোনে যাচাই-বাছাই করেছি। রিকলটি সঠিক আছে। তার বিরুদ্ধে চারটি মামলা আছে, চারটিতেই জামিনে আছে।’ পুলিশ সুপার আরও বলেন, ‘আপনি চাইলে রিকলের কপিটি আপনাকে দিতে পারি।
ইমিগ্রেশনে যে লক থাকে, সেটি খোলেনি। আবেদন দিলে ব্লকটি খুলে দেওয়া হবে। রাতেই নিশ্চিত হয়েছি, সবগুলো মামলায় সে জামিনে আছে।’ স্বাক্ষরবিহীন রিকলের বিষয়ে তিনি বলেন, ‘আপনারা যে কাগজ পেয়েছেন, সেটি কে দিয়েছে আমি জানি না। মূলত স্বাক্ষর ছাড়া রিকল হয় না। অনেক সময় ফোনে নিয়ে নেয় না, সেটাই হয়েছে মনে হয়। ওসিকে বলে দিচ্ছি, স্বাক্ষরযুক্ত কপিটি যেন আপনাকে পাঠায়।’