ময়মনসিংহ মেইল

গৌরীপুরে ৩৫টি বিদ্যালয়ের ঝুঁকিপূর্ণ ভবনে সাড়ে ৫ হাজার শিক্ষার্থীর পাঠদান চলছে

বৃহত্তর ময়মনসিংহ · 2026-09-24 11:34:47 · স্টাফ রিপোর্টার

ময়মনসিংহের গৌরীপুর উপজেলায় ৩৫টি ঝুঁকিপূর্ণ ভবনে চলছে প্রাথমিক বিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীদের পাঠদান। নির্মাণের মাত্র ১০-১৫ বছরের মধ্যেই ঝুঁকিপূর্ণ হয়ে পড়েছে ভবনগুলি। প্রতিটি ভবনের ছাদ, ভিম ও দেয়ালে ফাটল দেখা দিয়েছে। শিক্ষার্থীদের ওপর ছাদ থেকে খসে পড়ছে পলেস্তারা।

 কয়েকটি প্রতিষ্ঠানের ফ্লোরও ধসে পড়েছে। এতে সরকারের প্রায় শতকোটি টাকা গচ্ছা গেছে। ঘটনার সত্যতা স্বীকার করে উপজেলা শিক্ষা অফিসার সাঈদা রুবায়াত জানান, ঝুঁকিপূর্ণ বিদ্যালয়ের তালিকা ইতেমধ্যে উধ্বর্তন কর্তৃপক্ষকে পাঠানো হয়েছে। একেবারে যেসব কক্ষে ক্লাসের অনুপযোগী সেসব শ্রেণি কক্ষ থেকে শিক্ষার্থীদের সরিয়ে বিকল্প কক্ষে ক্লাস নিতে বলা হয়েছে। স্থানীয়দের অভিযোগ, প্রকৌশল অধিদপ্তরের পার্সেন্টিজ বাণিজ্য, ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠানের নিম্নমানের নির্মাণ সামগ্রী ব্যবহার ও গাফিলতির কারণে এসব ভবন দ্রুত নষ্ট হয়ে গেছে। 

এ প্রসঙ্গে গোবরা গ্রামের আজিজুল হক (৫৫) জানান, ভবনটিতে ঠিকমতো সিমেন্ট দেওয়া হলে এমন হতো না। আর যাই করেছিল যদি নিয়মিত পানি দিত তাহলে ভবনটি এত দ্রুত জরাজীর্ণ হয়ে এভাবে পলেস্তারা পড়ে যেত না। পাছেরকান্দার আব্দুল হালিম জানান, ভবনগুলো নির্মাণের সময় প্রকৌশল বিভাগের গাফিলতির কারণেই ভেঙে পড়ছে। ঝুঁকিপূর্ণ ৩৫টি বিদ্যালয়ের মধ্যে রয়েছে গৌরীপুর পৌর মডেল, মাছুয়াকান্দা, গোলকপুর, জাগরণী, নূতন বাজার, পাছেরকান্দা, আহসানপুর, পানাটি, ভোলারআলগী, কলতাপাড়া, লক্ষীপুর, গুজিখাঁ, বেতান্দর আদর্শ সংসদ, পশ্চিমপাড়া, সহনাটী, ভালুকাপুর, টেঙ্গাপাড়া, লাটুরপায়ার, শাহাবাজপুর, বহেড়াতলা, নিজমাওহা, চড়াকোনা, সিংরাউন্দ, শাহগঞ্জ, ধারাকান্দি, কিল্লাতাজপুর, চল্লিশা কড়েহা, কাশিয়ারচর, লংক্ষাখোলা, মরিচালী, গোবরা, মহিশ্বরণ, বারুয়ামারী, বেরাটি আজমত আলী ও শেখ খমির উদ্দিন সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়। 

উপজেলা প্রকৌশলী মো. আমিনুল ইসলাম জানান, প্রাথমিক বিদ্যালয়ের এত ভবন ঝুঁকিপূর্ণ সে বিষয়ে বিস্তারিত আমার জানা নেই। তবে ওই সময়ের অধিকাংশ ভবন ছিল ব্রিক্স এর। যে কারণে ভবনগুলো দ্রুত ব্যবহার ব্যবহার অনুপযোগী হয়ে পড়ছে। জাগরণী পৌর সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষক সানজিদা ইয়াসমিন জানান, প্রথম ভবনটি ১৯৮২ সালে নির্মাণ করা হয়, যা একেবারে ধ্বংসস্তূপে দাঁড়িয়ে আছে। ২০১১ সালের চার কক্ষের নির্মিত ভবনটিও অত্যন্ত ঝুঁকিপূর্ণ। ভবনের একাধিক স্থানে ফাটল দেখা দিয়েছে। ভিমও ফেটে গেছে। দেয়াল থেকে পলেস্তরা খসে পড়ছে। মাছুয়াকান্দা পৌর সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষক মো. আব্দুস সাত্তার জানান, ভবনটি একাধিক স্থানে ফাটল দেখা দিয়েছে। পলেস্তারা খসে পড়ছে। শিক্ষার্থীদের পাঠদান করতে খুব কষ্ট হচ্ছে। গোলকপুর পৌর সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষক প্যাসিফ্লোরা সুলতানা জানান, স্থানীয় সরকার প্রকৌশল অধিদপ্তরের উদ্যোগে ২০০৩ সনে দ্বিতীয় ভবনটি নির্মাণ হয়। দ্বিতীয়তলার কাজ হয় ২০১০সনে। পিডিবি-২ এর অধীনে এ কাজ সম্পন্ন হয়।

 তিনি জানান, ভবনটির পলেস্তারা খসে পরছে। ভিমে ফাটল দেখা দিয়েছে। অত্যন্ত ঝুঁকি নিয়ে ছাত্রছাত্রীর ক্লাস করা হচ্ছে। নূতন বাজার পৌর সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষক মোহসিনা ফিরদাউস জানান, ভবনের যেখানেই ঘষা দিবেন ঝুড়ঝুড়ি পরতে থাকবে। এই ভিমটা পুরোটা ফেটে গেছে। বারান্দার একাধিক স্থানে পলেস্তরা খসে পড়ছে। পাঠদান নিয়ে খুব সমস্যায় আছি। বারান্দায় চলছে অতিরিক্ত শিক্ষার্থীদের ক্লাস। এক কক্ষে নিতে হচ্ছে দু’টি ক্লাস। ভবনটিও ঝুঁকিতে আছে। অপরদিকে গৌরীপুর পৌর মডেল সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষক একেএম মাজহারুল আনোয়ার ফেরদৌস জানান, পুরো ভবনটি ঝুঁকিপূর্ণ। ছাদচুয়ে পানি পড়ে। একাধিক স্থানে জোড়াতালি দেওয়া হয়েছে। সিমেন্টের প্রলেপ দিয়ে কোনোভাবে ঠিকে আছি। দেয়ালে টুক্কা মারলেই ঝুড়ঝুড়ি পলেস্তারা পড়তে থাকে। প্রায় ৫ শতাধিক শিক্ষার্থীদের নিয়ে পাঠদান করা চরম দুর্ভোগের মধ্যে আছি।

 পাছেরকান্দা পৌর সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষক আঞ্জুমান আরা বেগম জানান, ভবনটি ২০০৭সনে নির্মিত হয়েছে। তবে ভবনে একাধিক স্থানে ফাটল এবং অফিস ও শ্রেণিকক্ষের পলেস্তরা খসে পড়ছে। আহছানপুর সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের ভারপ্রাপ্ত প্রধান শিক্ষক মোছাম্মাৎ জিন্নাত রেহানা জানান, ২০১০ সনে নূতন ভবনটি হস্তান্তর করা হয়। ছাদের একাধিকস্থানে ফাটল ও পলেস্তারা উঠে যাচ্ছে। বারান্দাসহ শ্রেণিকক্ষের প্রত্যেকটি কক্ষে ভাঙন দেখা দিয়েছে। পুরো ভবনটি এখন ঝুঁকিপূর্ণ হয়ে পড়েছে। এদিকে পানাটি সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষত মো. আবু সাইদ জানান, বিদ্যালয়ের ভবনটি ১৯৯৮-৯৯অর্থবছরে নির্মিত হয়। ভবনটি ৯৯ সালের শেষের দিকে হস্তান্তর করে। দ্বিতীয়তলার ফাউন্ডেশন থাকার কথা থাকলেও পরবর্তীতে ত্রুটিপূর্ণ হওয়ায় আর দ্বিতীয়তলা হয়নি। এখন তো একতলাই ভেঙে যাচ্ছে। কয়েকটি স্থানে ফাটল দেখা দিয়েছে। শ্রেণিকক্ষে শিক্ষার্থীদের মাথায় পলেস্তারা পড়ে। 

অনুরূপ পরিস্থিতি রয়েছে ভাংনামারী ইউনিয়নের ভোলারআলগী সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়। বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষক এনামুল হক জানান, ছাদ চুষে পানি পড়ে। ছাদের কয়েকটি স্থানে ফাটল দেখা দিয়েছে। প্লাস্টার খসে পড়ছে। লক্ষ্মীপুর সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের ভারপ্রাপ্ত প্রধান শিক্ষক মুহাম্মদ মনিরুজ্জামান ফকির জানান, দোতলা ফাউন্ডেশনের ভবনটির প্রথমতলা করার পরই আর উপরে কাজ করা হয়নি।

 বিল্ডিংটি ২০০৬-০৭ অর্থবছরে নির্মিত হয়। মাত্র কয়েক বছরেই ভবনটি এখন ব্যবহার অনুপযোগী হয়ে পড়ছে। একই অবস্থায় রয়েছে গোবরা সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়। ভবনের একটি কক্ষকে পরিত্যক্ত ঘোষণা করা হয়েছে। শিক্ষার্থীদের ক্লাস চলছে টিনশেডের নির্মিত ভবনে। বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষক আব্দুল কদ্দুস জানান, শ্রেণিকক্ষ ব্যবহারের অনুপযোগী, ভিমের পলেস্তারা খসে ছাত্রছাত্রীর মাথায় পড়ে। ঝুঁকিপূর্ণ হওয়ায় একটি ক্লাস সরিয়ে নেওয়া হয়েছে।

আরও পড়ুন

সাম্প্রতিক সংবাদ

সর্বাধিক পঠিত