জালাল উদ্দীন খা'র তত্ত্বদর্শন (পর্ব-৭)
সাহিত্য সংস্কৃতি · 2026-09-23 13:05:15 · রব নেওয়াজ খোকন
সৃষ্টিতত্ত্বসাধক জালাল উদ্দীন খাঁ'র সৃষ্টিতত্বের স্বরূপ সর্বেশ্বরবাদ ও একেশ্বরবাদের যৌথ অভিব্যক্তির সমন্বয়ে সজ্জিত। সর্বেশ্বরবাদে মহাজগত একমাত্র ঈশ্বরের স্বসৃষ্ট, একক ও বিচিত্র আত্মপ্রকাশ। এই মতবাদে ঈশ্বর ভিন্ন অন্য কোনো সত্তার অস্তিত্বকে স্বীকার করা হয় না। এ কে অদ্বৈতবাদও বলা হয়। অসীম ব্রহ্মাণ্ড একমাত্র ঐশীসত্তারই বহুরূপতা। পক্ষান্তরে, একেশ্বরবাদে সৃষ্টিজগতের একমাত্র অধিপতি ঈশ্বর। এবং তিনি আসমান, জমিন, আগুন, মাটি, হাওয়া, পানি প্রভৃতি মৌলিক উপাদানের সৃষ্টিকর্তা। এই মতবাদে স্রষ্টা ও সৃষ্টি পরস্পর দ্বৈতসত্তা। স্রষ্টা কর্তৃক সৃষ্টি শাসিত ও পরিচালিত। জালালদর্শনে সর্বেশ্বরবাদ ও একেশ্বরবাদের সমন্বয় সাধিত হয়েছে। উভয়কে একত্রে উপজীব্য করে জালাল তাঁর সৃষ্টিকর্মে ভিন্ন মাত্রার নৈপুণ্য এনেছেন। স্রষ্টা ও সৃষ্টি পরস্পর দ্বিত্ব হলেও একসত্তারই একক ঐক্য। সৃষ্টি হলো স্রষ্টারই আকারগত স্বপ্রকাশ। একই সত্তার ভিন্ন ভিন্ন প্রয়াস। এ প্রসঙ্গটি জালাল অবলীলায় বারবার এনেছেন তাঁর রচনায়। এদিক থেকে একেশ্বরবাদ ও সর্বেশ্বরবাদের সমন্বয় সাধিত হওয়ার পাশাপাশি, পরিপূর্ণ স্বকীয় তত্ত্ব হিসেবে প্রকৃত মর্যাদায় মহিমান্বিত হয়েছে। জালাল বুঝিয়েছেন, সৃষ্টিসামগ্রী স্রষ্টারই শৈল্পিক আত্মরূপ। সৃষ্টিতেই স্রষ্টার আত্মবিশ্লেষণ। আর এ সৃষ্টির অন্যতম প্রধান প্রতিনিধি বা প্রতিরূপ হলো মানুষ। মানবরূপই স্রষ্টার প্রকৃষ্ট ও সার্থক প্রকাশ। এ রূপের মাঝেই তিনি নিজের প্রকৃষ্ট ও পরম নির্যাসকে লেপন করেছেন। আবার এ রূপ ধারণের মাধ্যমেই তিনি আত্মসন্ধিৎসু হয়েছেন। নিজেকে সৃষ্টি হতে সন্তর্পণে সরিয়ে, অদৃশ্য সত্তায় অবগুণ্ঠিত করে স্বপ্রেমের মায়াজাল পেতেছেন। ঠিক সেকারণে একমাত্র মানবের মনেই স্রষ্টা প্রেমের বীজ অঙ্কুরিত হতে দেখা যায়। কেবল মানুষের অন্তরেই স্রষ্টানুসন্ধানের তীব্র ব্যাকুলতা। জালাল উদ্দীন খাঁ একটি বিখ্যাত গানে এই বিচিত্র প্রেমের রসময়তা ছড়িয়ে দিয়েছেন। এ বিশ্ববাগানে সাঁই নিরঞ্জনেমানুষ দিয়া ফুটাইল ফুল।।আদমকে নিষেধ করে গন্দম খাইও নাগন্দমকে হুকুম করে পিছু ছাইড়ো নাবুঝিতে এই তালবাহানাসংসারেতে গণ্ডগোল।।
যে গন্দম খেয়ে আদম হইলো গোনাগারআজ পর্যন্ত আমরা তাহাকরিতেছি আহারহজরত আদম-হাওয়া সে গন্দমএই হলো সেই কথার মূল।।
হাওয়া গন্দম ছিঁড়ে যখন বেহেশত খানায়তিনফোঁটা খুনজারি তখন হয়ে যায়একফোঁটা দিয়া মানুষ বানাইয়াভরেছে এই দুনিয়ার কোল।।
গন্দমের আঠা দিয়া বানাইয়া লালকালিছাপাখানার ঘরে কোরান দিতেছে তালিআসল কথা যদি বলিমুনশি-মোল্লায় বলবে বাতুল।।
গন্দমের বাহানা করে পাঠায় এ সংসারেমানুষ দিয়া মানুষ বানায় এই মানুষের ঘরেকোরান ছাপায় কোরান ধরেলাগছে বিষম হুলস্থুল।।
জালাল উদ্দীন ভাবতে ভাবতে হইয়া পেরেশানগন্দম গাছের তলে গেলো পাইয়া ময়দানগিয়া তথায় পড়িয়া ঘুমায়নেশার ঝোঁকে ভাঙলো না ভুল।।
বিশ্বব্রহ্মাণ্ড স্রষ্টার ভালোবাসার বাগান। এখানে প্রতিনিয়ত ভালোবাসার চাষ হয়। আর মানুষ তাঁর ভালোবাসার প্রতীকী ফুল। মানুষকে মাধ্যম হিসেবে ধারণ করেই তাঁর প্রেমবিলাস ও প্রেমখেলা। এই প্রেমখেলায় রয়েছে বহুমাত্রিক রূপকতা ও রহস্যময়তা। যেমন, হজরত আদম (আ:) এর সাথে সঙ্গিনী বিবি হাওয়াকে জুড়ে দিয়ে প্রথম নবি ও মানুষ হিসেবে প্রেরণ করেন। এবং শারিরিক মিলনের ব্যপারে তাঁদের ওপর নিষেধাজ্ঞা জারি করেন। যে মিলনক্রিয়াকে শাস্ত্রীয় ভাষায় প্রতিকী অর্থে 'গন্দম ফল' হিসেবে দেখানো হয়েছে। হজরত আদম (আ:) প্রভুর দেয়া নির্দেশ পালনে যদিও ছিলেন প্রতিজ্ঞাবদ্ধ। কিন্তু বিবি হাওয়ার একান্ত সান্নিধ্য, মোহনীয় ভালোবাসা তাঁর সে সংকল্পকে গুঁড়িয়ে দেয়। অবশেষে স্রষ্টার দেয়া নির্দেশ অমান্য করে তাঁরা মহামধুর মিলনে প্রবৃত্ত হয়। সাধক জালালের মতে বিবি হাওয়ার মিলনমুখি তৎপরতার পেছনে ছিল স্রষ্টারই ইংগিত। কেননা, সকল কর্মকাণ্ডের নেপথ্যে তাঁর ইচ্ছার হাত রয়েছে। তাই কবি বলেছেন, 'আদমকে নিষেধ করে গন্দম খেও না, গন্দমকে হুকুম করে পিছু ছেড়ো না।' স্রষ্টার এ বাহানা বোঝা বড় মুশকিল। কেননা, যে গন্দম খাওয়ার অপরাধে আদম (আ:) স্বর্গচ্যুত হয়ে দণ্ডিত আসামি রূপে পৃথিবীর জেলখানায় প্রেরিত হলেন, ঠিক সেই গন্দমই আমরা আদম সন্তানেরা নিয়ত খেয়ে চলেছি বৈধতার সনদ নিয়ে। আর এ সনদের অনুমোদক হলেন রহস্যময় স্রষ্টা। স্রষ্টার এ বিচিত্র নীতিবোধের বোধগম্যতা মানুষের জন্য এক বিশাল ধাঁ-ধাঁ। আর সেজন্যই সংসারে মত-পথের এতো ভিন্নতা, এতো গণ্ডগোল।
বেহেশতখানায় আদম-হাওয়ার জৈবিক মিলনের মাধ্যমে সূচিত হয় জন্মপ্রক্রিয়ার প্রথম ধাপ। এ প্রক্রিয়া ধারাবাহিক ভাবে চলতে-চলতে আজকের কোটি-কোটি মানুষের পৃথিবী গঠিত হয়েছে। 'গন্দমের আঠা দিয়া বানাইয়া লাল কালি/ছাপাখানার ঘরে কোরান দিতেছে তালি' এ পংক্তিতে কবি গন্দমের প্রতিকী প্রসঙ্গকে জন্মপ্রক্রিয়ার আসল রূপ হিসেবে দেখিয়েছেন। গন্দমের আঠা বলতে তিনি মানব-বীর্য বা শুক্র-ডিম্ব কোষকে বোঝাচ্ছেন। নারী-পুরুষের কামরস থেকেই তৈরি হয় ভ্রুণ বা লাল রক্তপিণ্ড। তারপর শরীর। কবির ভাষায় এটিই লালকালি বা লালরক্তে রচিত দেহ-কোরান। উল্লেখ্য যে, সাধুশ্রেণির মতে প্রকৃত এবং জীবন্ত কোরান হলো দেহ। দেহ-কোরান অধ্যয়নেই কেবল নিজেকে চেনা বা স্বচৈতন্যে উত্তরণ সম্ভব। জালাল এ মত প্রকাশের ফলশ্রুতিতে বাস্তবিক বিরূপ পরিণতির কথাও উল্লেখ করেছেন। শরিয়তবাদী মুনশি-মোল্লারা তাঁর এ মতবাদকে কখনোই স্বীকৃতি দেবে না, এটা তিনি পলে-পলে উপলব্ধি করেছেন। গন্দম ফলের বাহানা করে স্রষ্টা মানুষ দিয়ে মানুষ বানিয়ে এ সংসার ভরে তুলেছেন। বস্তুত, দেহ-কোরান ধরে দেহ-কোরান তৈরির কারখানা এ দুনিয়া। এ সৃষ্টি পদ্ধতির গুঢ়রহস্য অনুধাবনে ব্যর্থ হয়ে অজ্ঞ মানুষগুলো হুলস্থুল কাণ্ড বাঁধায়। বিভেদের প্রাচীর গড়ে। হয়ে উঠে সাংঘর্ষিক। অশান্তির অবতারণা হয় সমাজে।
সৃষ্টিরহস্য নিয়ে জালাল ভাবতে-ভাবতে পেরেশান। এ ভাবনা অনন্ত! এর কিনারা পাওয়া স্বসীমের পক্ষে দুরূহ। তাই তিনি ক্লান্ত-শ্রান্ত হয়ে গন্দম গাছের ছায়াকেই শেষ আশ্রয় হিসেবে নিয়েছিলেন। আজীবন নারীর সঙ্গ লীলায় মেতে থেকেছেন। অবশ্য বৈধ উপায়ে। এখানটায় খুঁজেছেন সৃষ্টিরহস্যের শিকড়।
সৃষ্টিতত্ত্বের আরেকটি গানে সাধক সৃষ্টির অমোঘ লীলাময়তাকে আরোও গভীরতা দিয়ে অলংকৃত করেছেন।
বাসনায় বিভেদ্য জীবনিবৃত্তি প্রাণ তুমিময়তা-না হলে সারা বিশ্বেআমি-তুমি কেবা কয়।।
জাগন্ত বাসনার বলেতরুশাখে ফুলে ফলেসজীব চেতন ভূমণ্ডলেকরো সৃষ্টি-স্থিতি-লয়।।
তুমি না জাগিলে প্রভুআমি না হইতাম কভুসাধ মিটে না তোমার তবুবারে বারে করে ক্ষয়।।
আমারই ঐ জন্ম-মরণখণ্ড ভাবের সুনিদর্শনপণ্ড হবে খণ্ড যখনঅখণ্ড সে কেবল রয়।।
আমি বলতে নাই কিছু আর"সর্বংসত্ত্ব" বিশ্ব তোমারআমায় নিয়ে জাগিসনে আরলীলার ছলে দয়াময়।।
তোমার প্রেমের চাপায় পড়েকষ্ট পেলাম জীবন ভরেসুখ দিয়ে দে জন্মান্তরেঅতীত প্রেমের বিনিময়।।
জালালে কয় হিসাব নিবেশুনেছি তুই শাস্তি দিবেতোর বিচার তুই করিবেআমার কিবা আছে ভয়?
জীবসৃষ্টির দার্শনিক কারণ হিসেবে জালাল এখানে একটি মহাসত্যকে দাঁড় করিয়েছেন। সে কারণটি হলো 'বাসনা'। মূলত ইচ্ছে বা বাসনার তাড়নাই জীবকে মহাসত্তা থেকে আলাদা করেছে। কারণ বাসনার সাথে জড়িয়ে রয়েছে, অতৃপ্তির পিপাসা, প্রাপ্তির আকাঙ্ক্ষা, যা জৈবিক দেহধারণে নিবৃত্তির প্রয়াস জাগায়। সে কারণেই জীবাত্মা তার জীবদ্দশায় জৈবনিক কর্মকাণ্ডের মধ্যদিয়ে পাওয়া-নাপাওয়ার দোলাচলে আজীবন সুখ-দুঃখের পশরা সাজাতে ব্যস্ত। আর তারই উৎস পরমাত্মা নিবৃত্তি-প্রাণ হয়ে একক সত্তা হিসেবে জীবাত্মার প্রতিনিধিত্ব করে। আর এখানেই 'আমি-তুমি' র বিভাজন। বাসনার জাগরণের কারণে মহাসত্তার একটি অংশ সজীব চেতনা নিয়ে খণ্ডাংশ রূপে জগতে গড়ে তোলে হাসি-কান্না, মিলন-বিরহ, প্রেম-ভালোবাসা প্রভৃতির এক মহোৎসব। সৃষ্টি-স্থিতি-লয় এই ধারাবাহিকতায় চলতে-চলতে একদিন সমাপিত হবে মহোৎসব। এটি সৃষ্টিকর্তারই এক বিরাট বিনোদনপর্ব। জালাল বলেন, সৃষ্টিকর্তার এ জাগরণ না হলে 'আমি' সত্তার আবির্ভাব হতো না। এ সত্তা তাঁরই অংশ বিশেষ। তাঁরই আত্ম বিভাজনে 'আমি' সত্তার আবির্ভাব। প্রতিনিয়ত তিনি নিজেকে জৈবনিক মহিমায় উজ্জ্বল করছেন, আবার জৈবনিক ক্ষয় বা ধ্বংসেরও মুখোমুখি করছেন। জন্ম-মরণ প্রক্রিয়ার মধ্য দিয়ে তিনি রাখছেন তাঁর খণ্ড ভাবের নিদর্শন। আর এ খণ্ড পণ্ড হবার পর তিনি হবেন অখণ্ডসত্তা। 'আমি' বলতে আর কিছুই নেই, এ সত্য উপলব্ধি করে জালাল বলছেন, তিনি 'সর্বংসত্ত্ব' বিশ্বস্রষ্টা। লীলার ছলে যেন তাঁকে আর জাগানো না হয়। কেননা, এই জাগরিত জীবনে স্রষ্টার প্রেমে পড়ে কেবল দুঃখ-কষ্টই পেতে হয়েছে। স্রষ্টার কাছে তিনি চাইছেন প্রেমের বিনিয়ে মুক্তি। আবার গানটির শেষাংশে সে মুক্তির প্রার্থনাও ফিরিয়ে নিয়েছেন তিনি। জন্ম-মরণের গুঢ় রহস্য বুঝতে পেরে তিনি বলেছেন- ' জালালে কয় হিসাব নিবে/শুনেছি তুই শাস্তি দিবে/তোর বিচার তুই করিবে/ আমার কিবা আছে ভয়?মূল্যবোধ:জালাল উদ্দীন খাঁ সৃষ্টিতত্ত্বকে সৃষ্টিরহস্যের জালে চিত্রিত করেছেন। এবং তাঁর সাধকজীবনে এই রহস্যের ধুম্রজাল ছিন্ন করার একটা দ্রোহবাদী প্রত্যয় ফুটে উঠেছিল। বস্তুত এ দ্রোহের উৎস হলো প্রেম ও অভিমানের সংমিশ্রিত আবেগ-বিশেষ। পরম- প্রেমাসক্ত সাধকের আবেগময় উন্মত্ততা তৎকালীন অজ্ঞমহল কর্তৃক তিরস্কৃত হলেও, প্রাজ্ঞ সমাজে তিনি শাশ্বতকাল ঐশীপ্রেমিক হয়ে থাকবেন। (চলবে)