ময়মনসিংহ মেইল

জালাল উদ্দীন খাঁ'র তত্ত্বদর্শন (পর্ব-৩)

সাহিত্য সংস্কৃতি · 2026-08-25 14:08:16 · রব নেওয়াজ খোকন

“*আত্মতত্ত্ব*”

উপমহাদেশীয় দর্শনের স্বকীয় বৈশিষ্ট্যগুলোর মধ্যে অন্যতম একটি বৈশিষ্ট্য, অতীন্দ্রিয়বাদ বা আধ্যাত্মবাদ। আর আধ্যাত্মবাদের ভিত্তিগত প্রতিষ্ঠিা আত্মতত্ত্বের ওপর। আত্মা ও দেহের সমন্বিত প্রয়াসে গড়ে উঠা আমিত্বকে উপজীব্য করে, চর্চিত দর্শনের একটি মৌলিক শাখা হলো আত্মতত্ত্ব।চৌদ্দপর্বে বিভক্ত জালাল গীতিকাসমগ্র-র  প্রথমপর্বটি হলো 'আত্মতত্ত্ব'। সাধক কবি জালাল উদ্দীন খাঁ 'আত্মতত্ত্ব' শব্দটি দিয়ে আপন বা নিজসত্তা কেন্দ্রিক দর্শনকেই নির্দেশ করেছেন। তবে তিনি তাঁর গীতিকাব্যের ভেলায় চড়ে এ গণ্ডির বাইরেও গিয়েছেন। কিন্তু সে যাত্রা বেশিদূরের নয়। আশ-পাশ ঘুরে বারবার প্রত্যাবর্তন করেছেন মূল জায়গাটিতে। আত্মতত্ত্বকে তিনি আধ্যাত্মবাদের চারণভূমি হিসেবে দেখিয়েছেন। পবিত্র ধর্মগ্রন্থ তথা ঐশীকোষগুলোতেও এ তত্ত্বের বিশেষত্ব দেখা যায়। নিজেকে চেনার তাগিদ থেকে এ তত্ত্বের প্রাসঙ্গিকতা মুখ্য হয়ে ওঠে। ফলে সুফীবাদী, বৈষ্ণববাদী, বাউলবাদী ও অন্যান্য তরিকাপন্থীরা আত্মতত্ত্বের দিকেই লক্ষ্যস্থির করেন। কবি জালাল আত্মতত্ত্বে সন্নিবেশিত গানগুলোতে, জীবসত্তা ও পরমসত্তার অবিচ্ছেদ্য সম্পর্কের বিষয়টি যৌক্তিক বাক্যে শিল্পরূপ দিয়েছেন। এখানে উল্লেখিত সত্তাদ্বয়কে আলাদা করা কঠিন। যেনো একই সত্তার ভিন্ন ভিন্ন রূপ। এ পর্বে বার বার বিশ্বজগতের সবকিছুর গোড়াকে এক করে দেখানো হয়েছে। এ পর্বের প্রথম ও জনপ্রিয় একটি গান:
আমার আমার কে কয় কারেভাবতে গেলো চিরকাল,আমি আদি আমি অন্তআমার নামটি রূহুজ্জামাল।।
আমারই এশকের তুফানআমার লাগি হয় পেরেশান,আবাদ করলাম সারা জাহানআবুল বাশার বিন্দু-জালাল।।
আমিময় অনন্ত বিশ্বআমি বাতেন আমি দৃশ্য,আমি আমার গুরু-শিষ্যইহকাল কি পরকাল।।
আমার লাগি আমি খাড়াআমার স্বভাব হয় অধরা,আমি জ্যান্ত আমি মরাআমার নাহি তাল-বেতাল।।
আমি লাইলি আমি মজনুআমার ভাবনায় কাষ্ঠ তনু,আমি ইউসুফ মুই জোলেখাশিরি-ফরহাদ কেঁদে বেহাল।।
আমি রোমের মাওলানাশামছ-তবরেজ দিওয়ানা,জুমলে-আলম মোর শাহানাখাজা, সুলতান, শাহজালাল।। 
আমার বান্দা কারাগারেআমি বন্দী অন্ধকারেমনের কথা বলবো নারেকেঁদে কহে দীন জালাল।।
'আমি' চিহ্নিত অস্তিত্বকে কেন্দ্র করেই কবির দর্শন আবর্তিত। এ ভাবনা যেনো চিরকালের। এ রহস্যই যেনো সৃষ্টিতত্ত্বের মূল ধাঁধাঁ। আমার এ রূহ্ বা আত্মার মূলউৎস কোথায়? কোন সত্তা হতে উৎসারিত আমি? রচনাটিতে এসব অমীমাংসিত প্রশ্নের জবাব মিলেছে। তবে এ জবাবে একটা অদৃশ্য পর্দাও ঝুলিয়েছেন কবি। শেষ লাইনে এসে মনের কথা না বলার ভান করে, সাধারণ স্বল্পজ্ঞানীদের কাছ থেকে নিজেকে আড়াল করেছেন। কিন্তু সাধকশ্রেণির জন্য তা স্বচ্ছ। সাধককবির মতে, আদি থেকে অন্ত পর্যন্ত কেবল 'আমিরূপ' মহাসত্তারই বহুধা প্রকাশ। এ ধারণাটি সর্বেশ্বরবাদের নামান্তর। মহাসত্তাটিকে আল্লাহ্, ঈশ্বর, ভগবান যাই বলা হোক না কেন, তাঁরই বিভাজিত খণ্ডাংশগুলো সাধারণসত্তা হিসেবে ভিন্ন ভিন্ন রূপে সর্বত্র প্রকাশিত। প্রকাশ-অপ্রকাশ, গুরু-শিষ্য, ইহকাল-পরকাল, জীবিত-মৃত, লাইলি-মজনু, ইউসুফ-জোলেখা, শিরি-ফরহাদ, বান্দা-স্রষ্টা ইত্যাদি মূলত আলাদা আলাদা ব্যপার নয়। এসবই এক ঈশ্বরের বহুরূপতা। তবু আমরা কেন যে আমার আমার বলে নিজেদের আলাদা আলাদা পরিচয় দিই, সেটি কবির বোধগম্য নয়। একক সত্তার বহুধা বিভক্তির কারণেই একটি অংশ অন্য একটি অংশের জন্য এতোটা প্রেমকাতর। এতোটা মিলনমুখি। লাইলি-মজনু, ইউসুফ-জোলেখা, শিরি-ফরহাদ প্রভৃতি জাগতিক সত্তাগুলোর পরস্পরিক প্রেমাসক্তিই এর উৎকৃষ্ট উদাহরণ।
এ পর্বের জনপ্রিয় আরেকটি গান:আমারে কেউ চিনতে গেলেসোজা রাস্তা হয় বাঁকা,বয়সে খোদ্ খোদার বড়নামটি কিন্তু নিচে লেখা।।
একং দশং শতং হাজারচুরাশি লাখের বাজার,সকল ঘরে রয় দোকানদারআমি মাত্র আছি একা।।
দেখতে আমার মুখের হাসিকতো বেটা জঙ্গলবাসি,লইয়াছে পিরিতের ফাঁসিতবু নাহি পাইলো দেখা।।
মুনশি আর মাওলানা কাজীআমি সবার নায়ের মাঝি,আমার ছিফাত লিখতে আজিঅন্ত পায় না হাদিস ফেকাহ্।।
আমি রাখলাম খোদার নামখোদা করেন আমার কাম,জালালে কয় সব বুঝিলামভুল ভাঙিতেই বিষম ঠেকা।।
এখানে খোদ্ বলতে জীবের আত্মাকে বোঝানো হয়েছে। যে খোদ্, জীবের আত্মা রূপে পৃথিবীতে বিচরণ করে, সূফীদর্শন অনুযায়ি ঈশ্বর আদিতে সেই খোদ্ আকারেই অনাদিকাল বর্তমান ছিলো। তারপর সৃষ্টিতে বিভাজিত হলো। সে হিসেবে খোদার পূর্বরূপ খোদ্। তাই জালাল বলতে চেয়েছেন, বয়সে খোদ্ খোদার বড়। অর্থাৎ বয়সের মাপকাঠিতে জীবাত্মা পরমাত্মার চেয়েও বড়। আর এ সত্য প্রকাশ করতে গেলে সোজা রাস্তা বাঁকা হয়ে যায়। কারণ, কথাটি সাধারণের ক্ষেত্রে শ্রবণকটু। সূফী মতবাদীদের মধ্যে বেশিরভাগ সুফী  বিশ্বাস করেন জীবাত্মার জন্মান্তর রয়েছে। "চুরাশির বাজার" কথাটি দিয়ে চুরাশি লক্ষবার যোনি ভ্রমনের পরিক্রমাকে বোঝানো হয়। অর্থাৎ চুরাশি লক্ষবার যোনি ভ্রমনের পর একবার মানবরূপে জন্ম হয় জীবাত্মার। আর মানবজন্মে নিজেকে চিনে সাধনার মাধ্যমে পরমাত্মার সাথে একাত্ম বা একাকার হতে পারলে জন্ম-মৃত্যু বারণ হয়। মুক্তি মেলে জন্মান্তরের চক্রাকার আবর্তন থেকে। সৃষ্টি আর স্রষ্টার বৈষম্য ঘুচে যায়। সাধনায় ব্যর্থ হলে জন্মান্তরের চক্রে পড়ে অনন্তকাল জৈবনিক যাতনা ভোগ করে যেতে হয়। জন্মান্তরের এই বিপর্যয় প্রক্রিয়াকে "চুরাশির ফের" বলা হয়। জন্মান্তরবাদ অনুযায়ী জীবাত্মা অসীম। তাছাড়া জীবাত্মার উৎস পরমাত্মা। সহজ কথায় জীবাত্মা পরমাত্মারই অংশবিশেষ। এ দৃষ্টিভঙ্গিতে জীবাত্মা মহাকালের। অতএব এর মৌলিক ব্যাপ্তি পরমাত্মার সমপর্যায়ের। তাই কবি মজা করে বলেছেন, 'আমি রাখলাম খোদার নাম, খোদা করেন আমার কাম'। আমি যার নাম রাখলাম, নিশ্চয়ই আমি তার চেয়ে বয়সে বড়। আমাকে নিয়ে যিনি চর্চা করেন নিশ্চয়ই আমি তার জন্য মুখ্য। অতএব আমার সংকীর্ণতাবোধ মানেই আমার অজ্ঞতা। সে দৃষ্টিতে জীবাত্মা ও পরমাত্মার মধ্যে মৌলিক পার্থক্য নেই।আমিত্বের স্বরূপ তুলে ধরতে গিয়ে  জালাল সৃষ্টি ও স্রষ্টাকে একাকার করে ফেলেছেন। এ কাজটি কেবল একজন উচ্চ পর্যায়ের সাধকের দ্বারাই সম্ভব। তাই দুঃসাহসী সাধক এ পর্বের আরেকটি গানে বলেছেন,
আমি বিনে কে বা তুমি দয়াল সাঁই,যদি আমি নাহি থাকিতোমার জায়গা ভবে নাই।।
যা করেছ আমায় নিয়েসৃষ্টিকে সৌন্দর্য দিয়ে,প্রাণে প্রাণে মিশে গিয়েমহাপ্রাণে করেছ ঠাঁই।।
বিশ্বপ্রাণের স্বরূপ-ছায়াআমাতে তোমারই মায়া,ছেড়ে দিলে এসব কায়াতুমি বলতে কিছুই নাই।।
তুমি যে অনন্ত অসীমআমাতে হয়েছো সসীম,কালী-কৃষ্ণ, করিম-রহিমকতো নামে ডাকছি তাই।।
যথায় বাগান তথায় কলিযথায় আগুন তথায় ছালি,কথায় শুধু ভিন্ন বলিআসলে এক বুঝতে পাই।।
মস্ত বড় প্রেম শিখিয়েতুমি গেছ আমি হয়ে,ভুলের জালে ঘেরাও দিয়েঘুম পাড়ায়ে খেলছো লাই।।
জালালে কয় ঘুমে থেকেঘর পোড়া যায় স্বপ্নে দেখে,গলা ভাঙছি ডেকে ডেকেশক্তি নাই যে উঠে পালাই।।
জীব আছে বলেই পরমত্বের প্রসঙ্গটি সার্থকতা নিয়ে প্রতিষ্ঠিত। জীব না থাকলে পরম মূল্যহীন। জীবের মূল্যায়নে পরম মূল্যায়িত। অতএব পরমের জন্য জীব মুখ্য। বিপরীতে জীব পরমের অনুগামী, অনুসারী ও পূজারী বলে, পরম মুখ্য। অর্থাৎ একে অপরের পরিপূরক। আর জীব-পরমের মাঝখানের পর্দা সরিয়ে নিলে উভয়েই একাকার। যে পর্দাটিকে জালাল 'ভুলের জাল' বলে অভিহিত করেছেন। ভিন্ন-অভিন্নতার রহস্য নিয়ে জালাল গীতিকার আত্মতত্ত্ব পর্বটি নির্মিত। সুফীতত্ত্বের 'ফানা' বা 'বাক্কা' স্তরটির সাথে তাঁর এ-বোধের মিল রয়েছে। যে স্তরে এসে প্রেমিক-জীবের উন্মাদনা, প্রচলিত নিয়ম-বিধিকে অতিক্রম করে পরম-প্রেমাষ্পদের সাথে মিলনোন্মুখ হয়ে পড়ে এবং মিলনের মাধ্যমে পারস্পরিক দূরত্ব, বৈষম্য, বৈসাদৃশ্য প্রভৃতি মিটে যায়। বিদ্রোহী কবিতার শেষাংশে প্রেমিককবি কাজী নজরুল ইসলাম ঠিক একই কারণে লিখেছেন, 
“'আমি সহসা আমারে চিনেছি আমার খুলিয়া গিয়াছে সব বাঁধ।' ”

বস্তুত নিজেকে চেনার উত্তরণ ঘটিত চুড়ান্ত ফলাফল এটি। এ পর্যায়ে সকল বাঁধ উন্মোচনের মধ্য দিয়ে সাধক সিদ্ধি লাভ করেন।
মূল্যবোধ:আত্মতত্ত্ব জুড়ে সাধক যে যুক্তির বীজ বপন করেছেন, তা সাধারণ শ্রেণির ধর্মীয় অনুভূতিতে স্ফোরণ ঘটাতে যথেষ্ট সহায়ক। এ থেকে সাধকের প্রতি বিতৃষ্ণা কিংবা বিরূপ মনোভাব তৈরি হওয়া স্বাভাবিক। কিন্তু সাধারণ শ্রেণিকে মনে রাখতে হবে, এসবই পরমপ্রেমে উন্মাদ, মহাপ্রেমিকের জাগতিক দিশাশূন্য, প্রেমময় হৃদয়ের স্বগত প্রলাপ। মূলত সামাজিক বা ধর্মীয় বিশ্বাসে বিশৃঙ্খলা সৃষ্টি তাঁর উদ্দেশ্য নয়। ধর্মীয় ইতিহাসে এমন বহু মহাপ্রমিকের নাম শোনা যায়। তাঁদের মধ্যে উল্লেখযোগ্য হলেন, রাবেয়া বসরি, হাসান বসরি, মনসুর হাল্লাজ প্রমুখ পরম-প্রেমিকবৃন্দ। 
(চলবে) 

আরও পড়ুন

সাম্প্রতিক সংবাদ

সর্বাধিক পঠিত