পেঁয়াজ সংরক্ষণে বাকৃবির আধুনিক প্রযুক্তি উদ্ভাবন, কমবে ১৬ শতাংশ ক্ষতি
বৃহত্তর ময়মনসিংহ · 2026-10-28 10:30:04 · স্টাফ রিপোর্টার
বাংলাদেশের মানুষের রান্নায় নিত্যদিনের সঙ্গী এবং অন্যতম অর্থকরী ফসল পেঁয়াজ। অথচ ফসল সংগ্রহের মৌসুমে পেঁয়াজের দাম কমে গেলে উৎপাদন খরচও তুলতে পারেন না কৃষক। আবার ভালো দামের আশায় পেঁয়াজ মজুত রাখলেও উপযুক্ত সংরক্ষণ ব্যবস্থার অভাবে পচন, অঙ্কুর গজানো ও ওজন কমে যাওয়ায় লোকসান গুনতে হয় তাদের। এই সংকট মোকাবিলায় ইন্টারনেট অব থিংস (আইওটি) প্রযুক্তিনির্ভর স্বয়ংক্রিয় পেঁয়াজ সংরক্ষণ ব্যবস্থা তৈরি ও পরীক্ষা করেছেন বাংলাদেশ কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়ের (বাকৃবি) একদল গবেষক।
তাদের উদ্ভাবিত ব্যবস্থায় সংরক্ষণ কক্ষের তাপমাত্রা ও আর্দ্রতা পর্যবেক্ষণের পাশাপাশি স্বয়ংক্রিয়ভাবে বায়ু চলাচল নিয়ন্ত্রণ করা যায়। প্রায় ৫০০ কেজি পেঁয়াজ ধারণক্ষমতার এ প্রযুক্তি তৈরি ও স্থাপনে আনুমানিক ২৫ হাজার টাকা খরচ হতে পারে বলে জানিয়েছেন গবেষকেরা, যা ৭-৮ বছরের জন্য ব্যবহারযোগ্য হবে।
গবেষকদের দাবি, পরীক্ষামূলক পর্যায়ে এ প্রযুক্তি ব্যবহারে পেঁয়াজ সংরক্ষণে ক্ষতি ১৫ থেকে ১৬ শতাংশ কমানোর সম্ভাবনা দেখা গেছে।
গবেষণায় প্রায় ৮০ দিন পেঁয়াজ সংরক্ষণের পরীক্ষায় প্রচলিত পদ্ধতির তুলনায় নতুন ব্যবস্থায় মোট ওজন হ্রাস কমেছে ৭ দশমিক ৩১ শতাংশ। একই সঙ্গে বাজারজাত যোগ্য পেঁয়াজের পরিমাণ বেড়েছে ৬৮ দশমিক ২২ শতাংশ থেকে ৭৬ দশমিক ৮১ শতাংশে। অর্থাৎ প্রতি ১০০ কেজি পেঁয়াজে পরীক্ষার হিসাবে প্রায় ৮ দশমিক ৫৯ কেজি বেশি পেঁয়াজ বাজারজাত যোগ্য ছিল। গবেষকদের মতে, প্রযুক্তিটি আরও উন্নত করে মাঠপর্যায়ে ব্যবহার করা গেলে সংরক্ষণজনিত ক্ষতি কমানো এবং কৃষকের আর্থিক সুবিধা বাড়ানোর সুযোগ তৈরি হতে পারে।
কীভাবে কাজ করবে প্রযুক্তিটি
গবেষণাটির নাম ‘ডেভেলপমেন্ট অ্যান্ড ইভ্যালুয়েশন অব অ্যা লো-কস্ট আইওটি-অ্যাসিস্টেড অনিয়ন স্টোরেজ সিস্টেম ফর রিডিউসিং পোস্টহারভেস্ট লসেস ইন বাংলাদেশ’। গবেষণাটি ২০২৬ সালের ২৬ আগস্ট জার্নাল অব ফুড প্রসেস ইঞ্জিনিয়ারিং সাময়িকীতে প্রকাশিত হয়।
গবেষক দলের নেতৃত্ব দিয়েছেন বাকৃবির কৃষি শক্তি ও যন্ত্র বিভাগের অধ্যাপক মো. রোস্তম আলী। দলের অন্য সদস্যরা হলেন স্নাতকোত্তর শিক্ষার্থী নাফিস সাদিক সায়েম, সাগর চৌধুরী, স্নাতক শিক্ষার্থী এম. রাহাত মিয়া, আনিসুর রহমান ও আল আমিন। গবেষণাটি বাংলাদেশ কৃষি বিশ্ববিদ্যালয় রিসার্চ সিস্টেম ও বিশ্ববিদ্যালয় মঞ্জুরি কমিশনের (ইউজিসি) অর্থায়নে পরিচালিত হয়েছে।
গবেষকদের তৈরি ব্যবস্থায় তাপমাত্রা ও আর্দ্রতা পরিমাপের জন্য সেন্সর ব্যবহার করা হয়েছে। পাশাপাশি গ্যাস সেন্সরের সাহায্যে পচনের সঙ্গে সম্পর্কিত গ্যাসের উপস্থিতি শনাক্ত করার ব্যবস্থাও রয়েছে। একটি মাইক্রোকন্ট্রোলার পরিবেশের তথ্য সংগ্রহ ও বিশ্লেষণ করে প্রয়োজন অনুযায়ী ফ্যান চালু বা বন্ধ করতে পারে। ফলে সংরক্ষণ কক্ষের ভেতরে বায়ুচলাচল নিয়ন্ত্রণ করা সম্ভব হয়।
গবেষণার পরীক্ষায় আইওটি নির্ভর ব্যবস্থায় তাপমাত্রা ১৮ দশমিক ৮১ থেকে ২৮ দশমিক ১৭ ডিগ্রি সেলসিয়াস এবং আপেক্ষিক আর্দ্রতা ৫৪ দশমিক ৩২ থেকে ৮২ দশমিক ৬০ শতাংশের মধ্যে ছিল। প্রচলিত কৃষক পর্যায়ের সংরক্ষণ ব্যবস্থার তুলনায় এতে পরিবেশের স্থিতিশীলতা বেশি পাওয়া গেছে। তবে এটি শীতাতপনিয়ন্ত্রিত ব্যবস্থা নয়; বরং সেন্সরের তথ্যের ভিত্তিতে বায়ুচলাচল নিয়ন্ত্রণ করে সংরক্ষণ পরিবেশ উন্নত করার প্রযুক্তি।
অধ্যাপক মো. রোস্তম আলী এশিয়া পোস্টকে বলেন, পেঁয়াজ সংরক্ষণের সময় তাপমাত্রা, আর্দ্রতা ও বায়ু চলাচলের পরিবর্তন নজরে রাখা জরুরি। এসব বিষয় নিয়ন্ত্রণের বাইরে থাকলে পেঁয়াজের ওজন কমে যায়, অঙ্কুর গজায় এবং পচন দেখা দেয়। তুলনামূলক কম খরচে পরিবেশ পর্যবেক্ষণ ও বায়ু চলাচল নিয়ন্ত্রণের মাধ্যমে এ ক্ষতি কমানোই তাদের গবেষণার উদ্দেশ্য।
৮০ দিনের পরীক্ষায় কী পাওয়া গেল
গবেষণায় ১৩৪ কেজি মুরি কাটা জাতের পেঁয়াজ প্রায় ৮০ দিন সংরক্ষণ করে আইওটি নির্ভর ব্যবস্থা ও প্রচলিত সংরক্ষণ পদ্ধতির ফলাফল তুলনা করা হয়। পরীক্ষায় প্রচলিত পদ্ধতিতে মোট ওজন হ্রাস ছিল ২৭ দশমিক ২৭ শতাংশ। নতুন এই ব্যবস্থায় তা কমে ১৯ দশমিক ৯৬ শতাংশে দাঁড়ায়। অর্থাৎ ওজন হ্রাসের হার কমেছে ৭ দশমিক ৩১ শতাংশ।
অন্যদিকে, বাজারজাত যোগ্য পেঁয়াজের পরিমাণ প্রচলিত পদ্ধতিতে ছিল ৬৮ দশমিক ২২ শতাংশ। নতুন ব্যবস্থায় তা বেড়ে ৭৬ দশমিক ৮১ শতাংশ হয়েছে। অঙ্কুর গজানোর কারণে ক্ষতির হারও ১ দশমিক ৫৩ শতাংশ থেকে কমে শূন্য দশমিক ৩৭ শতাংশ হয়েছে। তবে পচে যাওয়া পেঁয়াজের ক্ষতির ক্ষেত্রে দুই পদ্ধতির মধ্যে পারিসাংখ্যিকভাবে তাৎপর্যপূর্ণ পার্থক্য পাওয়া যায়নি।
গবেষণায় ব্যবহৃত গ্যাস সেন্সরটি পচন শনাক্তকরণে গড়ে প্রায় ৮৫ শতাংশ কার্যকারিতা দেখিয়েছে বলে গবেষণাপত্রে উল্লেখ করা হয়েছে। এ ফলাফল সংরক্ষণ কক্ষের পরিবেশ পর্যবেক্ষণ ও পেঁয়াজের অবস্থা শনাক্ত করার ক্ষেত্রে প্রযুক্তিটির সম্ভাবনা তুলে ধরে।
কৃষকের যেভাবে উপকৃত হতে পারে
পেঁয়াজের দাম ও সংরক্ষণ ব্যবস্থার ওপর কৃষকের প্রকৃত লাভ নির্ভর করবে। তবে পরীক্ষায় বাজারজাত যোগ্য পেঁয়াজের পরিমাণ বৃদ্ধির ফলে কৃষক সরাসরি লাভবান হতে পারে। প্রতি ৫০০ কেজি পেঁয়াজের ক্ষেত্রে পরীক্ষার দুই পদ্ধতির বাজারজাত যোগ্য ফলনের পার্থক্য ৮ দশমিক ৫৯ শতাংশ। তাই নতুন ব্যবস্থায় প্রায় ৪৩ কেজি বেশি পেঁয়াজ বাজারজাত যোগ্য হতে পারে। যন্ত্রটি প্রয়োজনে ১০০০ কেজি পেঁয়াজ সংরক্ষণের যোগ্য করেও গড়ে তোলা সম্ভব।
গবেষকদের দেওয়া তথ্য অনুযায়ী, প্রায় ৫০০ কেজি পেঁয়াজ ধারণক্ষমতার প্রযুক্তিটি তৈরিতে আনুমানিক ২৫ হাজার টাকা খরচ হতে পারে। এ ব্যয় দীর্ঘমেয়াদে কতটা সাশ্রয়ী হবে, তা প্রযুক্তিটির স্থায়িত্ব, বার্ষিক ব্যবহারের সংখ্যা ও পরিচালনব্যয়ের ওপর নির্ভর করবে।
উৎপাদন বেশি, তবু আমদানি করতে হয় পেঁয়াজ
কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের ২০২৫-২৬ অর্থবছরের হিসাব অনুযায়ী, দেশে প্রায় ৪২ লাখ ৬৪ হাজার টন পেঁয়াজ উৎপাদনের লক্ষ্যমাত্রা ছিল। বিপরীতে, বার্ষিক চাহিদা প্রায় ৩৫ থেকে ৩৬ লাখ টন। অর্থাৎ, লক্ষ্যমাত্রা অনুযায়ী উৎপাদন হলে চাহিদার তুলনায় প্রায় ৬ লাখ ৬৪ হাজার থেকে ৭ লাখ ৬৪ হাজার টন পেঁয়াজ উদ্বৃত্ত থাকার কথা।
এরপরও ২০২৫-২৬ অর্থবছরে দেশে প্রায় ৮৬ হাজার ৪০০ টন পেঁয়াজ আমদানি হয়েছে। বাংলাদেশ সংবাদ সংস্থার (বাসস) প্রকাশিত তথ্য অনুযায়ী, ২০২৪-২৫ অর্থবছরে আমদানির পরিমাণ ছিল প্রায় ৪ লাখ ৭৪ হাজার টন। সংরক্ষণ ও বিপণনের বিভিন্ন পর্যায়ে দেশে উৎপাদিত পেঁয়াজের প্রায় ২৫ থেকে ৩০ শতাংশ ক্ষতিগ্রস্ত হয় ।
উৎপাদনের লক্ষ্যমাত্রা ও বার্ষিক চাহিদার মধ্যে ব্যবধান থাকলেও বছরের সব সময়ে বাজারে পেঁয়াজের সরবরাহ সমান থাকে না। মৌসুমে একসঙ্গে বিপুল পরিমাণ পেঁয়াজ বাজারে আসায় দাম কমে যায়। পরে সংরক্ষিত পেঁয়াজের ঘাটতি দেখা দিলে বাজারে সরবরাহ কমে দাম বাড়তে পারে। সংরক্ষণ ও বিপণনব্যবস্থার সীমাবদ্ধতা এ পরিস্থিতিকে আরও জটিল করে তোলে।
বাকৃবির গবেষকদের প্রযুক্তি মাঠপর্যায়ে কার্যকর প্রমাণিত হলে সংরক্ষণ কালে ওজন হ্রাস ও অঙ্কুর গজানোর ক্ষতি কমানো সম্ভব হতে পারে। এতে বাজারজাত যোগ্য পেঁয়াজের পরিমাণ বাড়বে। কৃষকেরা উৎপাদিত পেঁয়াজের একটি বড় অংশ সংরক্ষণ করে পরবর্তী সময়ে বিক্রির সুযোগ পেলে মৌসুমে কম দামে বিক্রির চাপও কমতে পারে।
মাঠপর্যায়ে প্রয়োগের অপেক্ষা
প্রধান গবেষক অধ্যাপক মো. রোস্তম আলী জানান, প্রযুক্তিটির কার্যকারিতা আরও উন্নত করা এবং বাস্তব সংরক্ষণ পরিস্থিতিতে বড় পরিসরে পরীক্ষা করা প্রয়োজন। আমরা পেঁয়াজের পাশাপাশি আলু ও রসুন নিয়েও এর কার্যকারিতা যাচাই করছি। যন্ত্রটি পুরোপুরি সোলার প্যানেলে চালানো যায় এই ব্যবস্থা নিয়ে কাজ চলছে।
তিনি আরও বলেন, ফলাফল সন্তোষজনক হলে কৃষক ও বাণিজ্যিক সংরক্ষণ কেন্দ্রে পরীক্ষামূলকভাবে এটি চালুর পরিকল্পনা রয়েছে। প্রয়োজনীয় আর্থিক ও কারিগরি সহায়তা পাওয়া গেলে এক থেকে দুই বছরের মধ্যে মাঠপর্যায়ে ব্যবহারের উপযোগী মডেল তৈরি করা সম্ভব।