ময়মনসিংহ মেইল

জালাল উদ্দীন খাঁ'র তত্ত্বদর্শন (পর্ব-৪)

সাহিত্য সংস্কৃতি · 2026-08-30 14:00:57 · রব নেওয়াজ খোকন

পরমতত্ত্বআত্মতত্ত্ব বিষয়ক আলোচনায় ইতোপূর্বে 'পরম' শব্দটিও এসেছে। পরম শব্দের আভিধানিক অর্থ- প্রথম, আদ্য, প্রকৃত, প্রধান ইত্যাদি। আধ্যাত্মবাদের পরিভাষায় 'পরম' শব্দটি দিয়ে মহাজগতের অধিষ্ঠাতা বা মহাসত্তা ঈশ্বরকে বোঝানো হয়। পরমাত্মা বলতে বোঝানো হয় ঈশ্বরাত্মাকে। সাধকের মতে আত্মাকে শক্তি এবং পরমাত্মাকে মহাশক্তি হিসেবে কল্পনা করা হয়। মহাজগত মহাশক্তিরই মহাপ্রকাশ। এ মহাশক্তি সকল জাগতিক শক্তির উৎস বা আধার। জীবাত্মা তাঁরই অংশবিশেষ। সেই সমীকরণে উভয় প্রকার আত্মার মধ্যকার সম্পর্ক অত্যন্ত নিবিড় ও গভীর, এমনকি ক্ষেত্রবিশেষে অবিচ্ছেদ্য। তত্ত্বালোচনায় এ দ্বৈতসত্তা সম্পর্কিত বহুবিধ বৈচিত্র নিয়ে আলোচনা করা হয়। জালালদর্শনে এ তত্ত্ব প্রাধান্য পেয়েছে। কবির পরমতত্ত্ব নিয়ে  একটি উল্লেখযোগ্য জনপ্রিয় গান:
কী ছুরত বানাইলে খোদারূপ মিশায়ে আপনার,এই ছুরত দোজখে যাবেযে বলে সে গোনাহ্গার।।
মানব-ছুরতের মাঝেতুমি আছো তোমার কাজে,আদম বানিয়ে কী বনলে?লীলা বোঝা হলো ভার।।
মানব দেহেতে খোদাদম থাকতে না হবে জুদাকে-বা আদম কে-বা খোদা?কে করিবে কার বিচার।।
দেখিলাম দুনিয়া ঘুরেদুই ছুরত এক মিল না পড়ে,লক্ষ-কোটি আকার ধরেসাজিলে তুই নিরাকার।।
এতো রূপ যে ধরতে পারেতোমরা কী বলো গো তারে?হয় কী নাহয় এই আকারেবেহদ্দ রূপে আপনার।।
যে ডুবে ঐ রূপের শানেকালির লেখা আর কি মানে?জালাল উদ্দীন এ-জীবনেসার বুঝেছে একাকার।।
জীব-পরম সম্পর্কের গভীরতা কবির যৌক্তিক ব্যাখ্যায় রচনাটিতে প্রাণবন্ত রূপ ধারণ করেছে। নিজের রূপ মিশিয়ে তৈরিকরা সৃষ্টিকে দোজখে পাঠাবেন স্রষ্টা? এ-যেন নিজের বিচার নিজে করার শামিল! সাধক প্রচলিত এ বিচার ব্যবস্থার বিশ্বাসে প্রশ্ন তুলেছেন। এমন কি যারা এটি বলে বা বিশ্বাস করে, তাদের গোনাহ্গার বলতেও দ্বিধা করেননি। মহাসত্তায় নিজেকে বিলীনের মধ্যদিয়ে আত্মপ্রত্যয়ের এমন দৃষ্টান্ত স্থাপন খুব কম সাধকই করতে পারেন। বস্তুুত সূফীসাধকগণ স্বর্গ-নরক বা বেহেশত-দোযখকে মুখ্য হিসেবে না দেখে বরং এসবের যিনি নিয়ন্তা, তাঁকেই প্রাধান্য দিয়ে থাকেন। তাঁর নৈকট্যপ্রাপ্তিই সাধকের লক্ষ্য। মানব ছুরতে নিজেকে উৎসর্গ করে, মানবে রূপান্তর হয়ে, স্রষ্টা যে কর্মযজ্ঞে মেতেছেন; তাতে তিনি কীসের আত্মগৌরব প্রচার করেন? এ নিয়েও কবির প্রশ্ন। লক্ষ-কোটি রূপে নিজেকে প্রকাশ করে, নিরাকার সাজার মানেটা জালাল ঠিক বুঝে নিয়েছেন। দ্বৈতবাদের ঝামেলা থেকে নিজেকে মুক্ত করে নিয়েছেন। তিনি আর কালির লেখা মানতে চান না। যাঁর রূপ, স্বরূপে ধরা পড়েছে, তাঁর খুঁজে আর বাইরে তাকাতে চান না। আত্মমগ্ন হয়েই স্বর্গীয় শান্তি উপভোগ করতে চান। মহাচৈতন্যের এ বিশাল স্বর্গভূমিতে পা রেখে জালাল আত্মবিস্মৃত হয়েছেন। নিজেকে স্থাপন করছেন চুড়ান্ত লক্ষ্যে। এমতাবস্থায়  বেহেশত-দোযখ নিয়ে মাথাব্যথা থাকার কথা নয়। তাসাউফ তত্ত্বমতে সিদ্ধাত্মারা ইল্লিনের আলোয় মিশে যায়। পাপাত্মা মিশে সিজ্জিনের অন্ধাকারে। অতএব, ইল্লিনের আলোয় যাঁর অবগাহন, দোযখ কিংবা পাপ তাঁর জন্য হুমকি বা ভীতিপ্রদ হতে পারে না।
পরমতত্ত্বের অন্য একটি গানে পরমকে বেঁধেছেন কবি গোলকধাঁধার জালে।
গোলক ধাঁধা গোলে বাঁধাগোল নিয়ে মোর বাঁধলো গোলএই পারে গোল, সেই পারে গোলগোলের নাহি আছে কূল।।
প্রকৃতির স্বভাব গোলচন্দ্র-সূর্য গ্রহ গোল,আকাশ-পাতাল যে করলো গোলতারে নিয়ে মহা গোল।।
গোল বিন্দুতে সৃষ্টি সবারগর্ভে থাকতে সব গোলাকার,গোলের দুগ্ধ খেয়ে আবারগোলের লাগি হয় ব্যাকুল।।
গোল কড়িতে গোল বড়িতেদেহরাজ্যের গোল মিটাইতে,কূল না পেয়ে শেষ কালেতেগোল গুটিতে দিতে হয় গুল।।
গোল বাসনে অন্ন খেয়েবিষম গোলে দিন কাটিয়ে,সদায় ব্যস্ত যে গোল নিয়েসকল গোলের হয় সে মূল।।
জালাল উদ্দীন ভেবে কয়সকলি গোল বিশ্বময়,গোল ভাঙলে হয় গোল পরিচয়গোলবাগিচায় ফুটবে গুল।।
'গোল' শব্দটি এতো বিচিত্র ও বহুমুখী অর্থের সমৃদ্ধি নিয়ে, পৃথিবীর আর কোনো কবির কাব্যে উঠে এসেছে কিনা আমার জানা নেই। আর কোনো সাধক এ শব্দটিকে এতো সুক্ষ্মভাবে পর্যবেক্ষণ করেছেন কিনা তাও জানা নেই। জালাল উদ্দীন খাঁর এ গোলতত্ত্বের সঠিক মীমাংসাও  আমার জানা নেই। এমন কি কারো জানা আছে বলেও বিশ্বাস করতে পারছি না। এ গোলকধাঁধার প্রকৃতি জাগতিক অন্যান্য ধাঁধার মতো নয়। এ ধাঁধা মহকালের মহারহস্যের জালে আবৃত। এপার-ওপার সর্বত্রব্যাপি গোল বা রহস্যের সঠিক মীমাংসা কোনো সসীম জীবের পক্ষে পাওয়া সম্ভব নয়। অনন্ত মহাজগতের তুলনায় মানুষ অতি নগন্য এক ক্ষুদ্র জীব। তার পক্ষে এ সৃষ্টিজগতের সঠিক উদ্দেশ্য কিংবা বিধেয় কোনোটাই জানা সম্ভব নয়। কারণ, কবির ভাষায় প্রকৃতির স্বভাব গোলাকার, চন্দ্র-সূর্য, গ্রহ গোলাকার। অতএব এসব যিনি সৃষ্টি করেছেন, তাঁর প্রকৃতি নিয়ে গোল বাঁধা স্বাভাবিক। গোলবিন্দু থেকে অর্থাৎ গোলাকার জরায়ুতে জীবের প্রাথমিক অবস্থান। আবার সে গোলকধারী মায়ের  মাতৃস্তন্যের আকারও গোলাকার। যে গোলের দুগ্ধপোষ্য হয় জীবশিশু, সে শিশু বড় হয়ে এর জন্যই বিপরীত অর্থে উন্মাদ হয়ে ওঠে। এসব যেনো গোলেরই গোলমেলে বৈশিষ্ট্য। গোল কড়িতে কেনা গোল বড়ি খেয়ে, দেহরাজ্যের গোলমাল মিটাতে ব্যর্থ হয়ে শেষে গুল গুটিতে গুল দিতে হয়। গোল বাসনে খাবার খেয়ে বেঁচে থাকা জীবনের গোল মিটাতে গিয়ে ব্যর্থতা নেমে আসে। এসব গোলের মূলে যে মহাগোলেরই কারসাজি। এই যে গোল নিয়ে মহাগোলের কারখানা, এ থেকে জালাল উদ্দীন খাঁ শিক্ষা নিতে সাধকদের তাগিদ দিচ্ছেন। লম্বা-বেঁটে বাদ দিয়ে জগতের গোল প্রকৃতির সাথে একাত্ম হতে বলেছেন। তবেই মিটে যাবে সকল গোল। এবং গুলবাগিচায় গুল ফুটবে। সাধকের বাস্তব জীবনেও প্রতিকী হিসেবে এ গোলতত্ত্বের ইংগিত রেখেছেন। তাঁর বসত বাড়ির আঙ্গিনায় নির্মাণ করে রেখে গেছেন গোলাকৃতির একটি বিশেষ ঘর। জানা যায় সে ঘরে বসে তিনি কাব্যচর্চা করতেন ও ধ্যানমগ্ন থাকতেন।
পরমসত্তাকে গোলের গোলা থেকে কবি কখনো টেনে এনেছেন একেবারে ক্বালবের  ভেতর। যেখানে সকল দূরত্বের অবসান ঘটিয়েছেন।
দিলের খবর জানো খোদাজানে রুহ্ ইনছানি,কেউরে করাও ধরম-করমআমায় করাও শয়তানি।।
কালবে রূহ্ গায়বে খোদামোকাম মঞ্জিল মাহমুদা,ধ্যানে দিদার নুরুল হূদাজাল্লে জালাল নূরানি।।
সেই দেশেতে করো দাখিলচাই না তোর দরবেশি হাসিল,খুলিয়া দাও কপাটের খিলফুল ফুটায়ে আসমানি।।
নীল আকাশে থরে থরেমেঘ ছুটে যায় বায়ুভরে,তজল্লি-শান তার উপরেআরশে-আলা রব্বানি।।
বেহেশত খানায় যাব না আরপুলসেরাত না হইব পার,চাই তোমারই হুব্বে দিদারএশকে মৌলার দেওয়ানি।।
যে পিরিতে দেওয়ান হাফেজগাউসুল আজম শামছ-তবরেজ,শরাতে হয় মনসুর খারেজশূলেতে যার কোরবানি।।
সেই বাতাস লাগাও হে অঙ্গেজালাল উদ্দীন তোমার সঙ্গে,নেচে গাইবে প্রেম তরঙ্গেযেখানে পীর জিলানি।।দিল বা মনের খবর জানার ক্ষমতা রয়েছে একমাত্র পরমের। আর জানে ইনছানি রূহ্ বা জীবাত্মা। সে অনন্য ক্ষমতা যাঁর, তিনিই সকল ভালো-মন্দের নিয়ন্তা। ক্বালবের সাথে সংশ্লিষ্ট জীবাত্মা ও পরমাত্মার পাশাপাশি রয়েছে নূরে-মোহাম্মদীয় আত্মার উপস্থিতি। কবি মোহাম্মদীয় আত্মাকে মোকামে মঞ্জিল বলে উল্লেখ করেছেন। কবির প্রার্থনা, সে মঞ্জিলের কপাট যেনো খুলে দেয়া হয়। দরবেশি হাসিলের চেয়ে পরম স্রষ্টার সান্নিধ্যই তাঁর মুখ্য চাওয়া। নীলাকাশের মেঘের ভেলায় চড়ে উড়ে যাওয়া বাতাস ভেদ করে, উর্ধ্বলোকের পরমের নিকট পৌঁছার কল্পনায় কবি উন্মুখ।পুলসিরাত পার হয়ে বেহেশতে যাবার কোনো বাসনা তাঁকে আলোড়িত করে না। তিনি মৌলার প্রেমের পাগল। তাঁর প্রেমাষ্পদের নৈকট্যই একমাত্র কাম্য। সাধককবি হাফেজ, শামছ-তবরেজ সাধনার বলে যাঁর কাছে পৌঁছেছিলেন, কিংবা মনসুর হাল্লাজকে যাঁর প্রেমের অপরাধে শূলে চড়ানো হয়েছিলো, সেই পরম প্রভুর কাছে পৌঁছাই তাঁর একমাত্র ব্রত। 
মূল্যবোধ:পরমতত্ত্বে জালাল পরমকে দূরের-কাছের, প্রকাশ্য-অপ্রকাশ্য এসব বৈপরীত্যযুক্ত বৈচিত্রে চিত্রায়িত করে, দ্বৈতরসের রসময়তায় সিক্ত করেছেন। তাতে প্রচলিত  শরিয়া আইন লংঘিত হয়েছে বটে, তবে তাসাউফের উচ্চতর বিজ্ঞানচিন্তার মূর্ত প্রতিফলন ঘটেছে। সাধারণ শ্রেণির ধর্মচিন্তায় তা ব্যাঘাত সৃষ্টি করলেও, ঐশী প্রেমে মজ্জুব সাধকের জন্য বয়ে এনেছে মৌলিক বার্তা। প্রেমিক হৃদয়ের স্বকীয় ভাবাবেগ এখানে প্রাধান্য পেয়েছে।  অতএব আমরা যেনো প্রেমিক কবিকে ভুল না বুঝি। (চলবে)

আরও পড়ুন

সাম্প্রতিক সংবাদ

সর্বাধিক পঠিত