কলেজের সীমানাপ্রাচীর নির্মাণে ঝুঁকিতে দুই যুগের ২৪ মেহগনি গাছ
বৃহত্তর ময়মনসিংহ · 2026-10-11 05:39:24 · স্টাফ রিপোর্টার
জামালপুরের ঐতিহ্যবাহী সরকারি আশেক মাহমুদ কলেজে প্রায় ৬ কোটি টাকা ব্যয়ে সীমানা প্রাচীর নির্মাণের কাজটি এখন হিতে বিপরীত হয়ে দাঁড়িয়েছে। প্রকৃত সীমানা বাদ দিয়ে অপরিকল্পিতভাবে প্রাচীর নির্মাণ এবং গাছের গোড়া থেকে মাটি সরিয়ে নেওয়ায় দীর্ঘ দুই যুগের প্রায় ২৪টি মেহগনি গাছ চরম ঝুঁকিতে রয়েছে।
এর মধ্যে গত বৃহস্পতিবার একটি গাছ ভেঙেও পড়েছে। প্রকৃতি ধ্বংসকারী এ কাজের তীব্র নিন্দা জানিয়ে পরিবেশ রক্ষা করে প্রাচীর নির্মাণের কাজ পরিচালনার দাবি জানিয়েছেন সাধারণ শিক্ষার্থী ও স্থানীয়রা।
জামালপুরের ঐতিহ্যবাহী সরকারি আশেক মাহমুদ কলেজ ১৯৪৭ সালে প্রতিষ্ঠিত। ময়মনসিংহ বিভাগের সর্ববৃহৎ এই বিদ্যাপীঠ কেবল সুনামের জন্যই নয়, এর বিশাল আয়তন ও অনন্য প্রাকৃতিক সৌন্দর্যের জন্য দেশজুড়ে সমাদৃত। তবে প্রতিষ্ঠার সময় শত একরের বেশি জমি থাকলেও কোনো দৃশ্যমান সীমানা প্রাচীর না থাকায় দীর্ঘ দিন ধরে স্থানীয় প্রভাবশালী ও দখলদারদের গ্রাসে ছোট হয়ে এসেছে ক্যাম্পাসের আয়তন। শিক্ষার্থী ও শিক্ষকদের দীর্ঘদিনের দাবির ফলে কলেজের জমি রক্ষা করতে জামালপুর শিক্ষা প্রকৌশল অধিদপ্তর, ৬ কোটি ব্যয়ে প্রায় ১,৪৪৯ মিটার সীমানা প্রাচীর নির্মাণের একটি প্রকল্প হাতে নেওয়া হয়। যেটির কাজ শুরু হয় গত সপ্তাহে।
দরপত্রের মাধ্যমে কাজটি দেওয়া হয় ঢাকার ‘মেসার্স এম এ ইঞ্জিনিয়ারিং’ নামের একটি প্রতিষ্ঠানকে। তবে কাগজে-কলমে ঢাকার ঠিকাদারের নাম থাকলেও বাস্তবে কাজটি পরিচালনা করছেন জামালপুর জেলা মৎস্যজীবী দলের সভাপতি আব্দুল হালিম। তবে সুরক্ষার এই প্রকল্পই এখন কলেজের সৌন্দর্য ধ্বংসের বড় কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছে বলে অভিযোগ সাধারণ শিক্ষার্থীদের। শিক্ষার্থীরা বলছেন, সীমানা প্রাচীরটি প্রকৃত সীমানায় নির্মাণ না করে, কলেজের মূল প্রবেশপথের পাশের সৌন্দর্যমণ্ডিত রাস্তার পাশে ও পুকুরের ধার দিয়ে অপরিকল্পিতভাবে তোলা হচ্ছে। সবচেয়ে উদ্বেগের বিষয় হলো- দেয়াল নির্মাণের সুবিধার্থে রাস্তার পাশে থাকা প্রায় দুই যুগের পুরোনো ২৫টি মেহগনি গাছের গোড়া থেকে মাটি সরিয়ে নেওয়া হয়েছে। গাছের গোড়ায় পর্যাপ্ত মাটির না থাকায় গত বৃহস্পতিবার (৮ অক্টোবর) একটি মেহগনি গাছ ভেঙে পড়ে যায়। বাকি প্রায় ২৪টি গাছও এখন মারাত্মক ঝুঁকিতে রয়েছে।
এদিকে গাছ পড়ে যাওয়া নিয়ে নির্মাণকাজে নিয়োজিতরা দিচ্ছে অদ্ভুত ব্যাখ্যা। তারা বলছেন, পুকুরে থাকা ‘গাছ কার্প’ মাছ নাকি মেহগনি গাছের গোড়ায় ঠোকর দিয়ে মাটি খেয়ে ফেলেছে, যার ফলে গাছটি পড়ে গেছে! নির্মাণকারীদের এমন হাস্যকর দাবিতে ক্ষোভে ফেটে পড়েছেন শিক্ষার্থী ও পরিবেশবাদীরা। জামালপুর ‘পরিবেশ বাঁচাও আন্দোলন’-এর সদস্যরা পরিষ্কার বার্তা দিয়েছেন। তারা বলছেন- কোনোভাবেই পরিবেশ ও প্রকৃতি ধ্বংস করে উন্নয়নমূলক কাজ করা যাবে না। অতিদ্রুত গাছগুলো রক্ষা করে প্রাচীর নির্মাণের আহ্বান জানিয়েছেন তারা।
ইসলামী ছাত্র আন্দোলন জামালপুর জেলা শাখার সভাপতি ও সরকারি আশেক মাহমুদ কলেজের শিক্ষার্থী আল আমিন রুহানি বলেন, আমাদের কলেজের অনেক জমি দখল হয়ে যাচ্ছে। সেদিকে কেউ কোনো নজর দিচ্ছে না। এখন যেখানে প্রাচীর নির্মাণ করা হচ্ছে- সেখানে তো এ প্রাচীর দরকার নেই। এখানে প্রাচীর না করে যদি যেদিকে জমি দখল হচ্ছে সেখানে করতো। তবে কলেজের জমি দখলদারদের হাত থেকে রক্ষা পেতো। পাশাপাশি গাছগুলো রক্ষা পেতো। আমরা চাই আমাদের কলেজের পরিবেশ সুন্দর থাকুক। আর পরিবেশকে সুন্দর রাখতে গাছের কোনো বিকল্প নেই।
কাজটি পরিচালনাকারী জামালপুর জেলা মৎস্যজীবী দলের সভাপতি আব্দুল হালিম ঢাকা পোস্টকে বলেন, গাছের কোনো ক্ষতি হয়নি। যে গাছগুলোর মাটি সরে গিয়েছিল সেই গাছগুলোকে বাঁশ দিয়ে ঠেকা দিয়েছি।
সরেজমিনে কথা হয় নির্মাণকাজে নিয়োজিত হেড মিস্ত্রি (ওস্তাগার) এর সাথে। তিনি ব্যাখ্যা দিয়ে বলেন, গাছগুলো পড়ে যাওয়ার মূল কারণ হলো এখানে ‘গাছ কার্প’ মাছ চাষ করা হতো। সেই মাছগুলো গাছের গোড়ার মাটি খেয়ে ফেলেছে। তাই গাছগুলো পড়ে গেছে।
জামালপুর জেলা পরিবেশ বাঁচাও আন্দোলনের সাধারণ সম্পাদক অ্যাডভোকেট ইউসুফ আলী বলেন, পরিবেশকে নষ্ট করে কোনো নির্মাণকাজ করা যাবে না। সবার আগে গাছ ও পরিবেশের সৌন্দর্যের কথা ভাবতে হবে। যে গাছগুলো নষ্ট হলো এবং যে গাছগুলো হুমকির মুখে রয়েছে; সেগুলোর কথা মাথায় রেখে কাজ করার দরকার ছিল। বাকি গাছগুলোর যাতে কোনো ক্ষতি না হয় সেদিকে লক্ষ্য রেখে কাজ করার আহ্বান জানান তিনি।
এ বিষয়ে সরকারি আশিক মাহমুদ কলেজের অধ্যক্ষ প্রফেসর মো. আব্দুল বার্সেদ বলেন, আমি এ কলেজে গত মাসে যোগদান করেছি। এ প্রকল্পটি আমি আসার আগেই গ্রহণ করা হয়েছে। গাছের বিষয়ে আমি ঠিকাদার ও ইঞ্জিনিয়ারকে বলেছিলাম। কিন্তু তারা আমাকে না জানিয়ে কাজ শুরু করেছে। এ গাছ পড়ার কারণে আমার কলেজের বিদ্যুৎ লাইনে সমস্যা হয়েছিল। এতে একদিন কলেজের একটি ভবনে বিদ্যুৎ সংযোগ ছিল না। আমার মনে হয় বাকি গাছগুলো বেশিদিন বাঁচবে না।
এ বিষয়ে জামালপুর শিক্ষা প্রকৌশলী অধিদপ্তরের নির্বাহী প্রকৌশল জয়িতা অধিকারী ঢাকা পোস্টকে বলেন, কলেজ কর্তৃপক্ষ আমাদের যে জায়গাগুলোর দিকে বাউন্ডারি ওয়াল করার জন্য চাহিদা দিয়েছেন, আমরা সেদিক দিয়েই কাজগুলো করেছি। এখানে কাজটি করার সময় বৃষ্টি হচ্ছিল, তাই অনাকাঙ্ক্ষিতভাবে একটি গাছ কিছুটা ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। আমরা চাই না যে এভাবে আর কোনো গাছ ক্ষতিগ্রস্ত হোক। বাকি কাজগুলো করতে গিয়ে গাছগুলো যেন ক্ষতিগ্রস্ত না হয়, আমরা সেদিকে খেয়াল রেখে বাকি নির্মাণ কাজটি পরিচালনা করব।