আবর্জনার দুর্গন্ধ ছাপিয়ে ৮০০ ফুট দেয়ালে সবুজের উৎসব, নজরে এলো প্রধানমন্ত্রীর
বৃহত্তর ময়মনসিংহ · 2026-10-11 06:56:16 · স্টাফ রিপোর্টার
একসময় যে সড়কের দুই পাশে জমে থাকত ময়লা-আবর্জনা, দুর্গন্ধে চলাচল করাও ছিল কষ্টকর, সেই সড়কই এখন ফুলের সুবাস আর সবুজ পাতার সৌন্দর্যে মুগ্ধতা ছড়াচ্ছে। ফেলে দেওয়া ঝুড়ি, বালতি ও মগে গাছ লাগিয়ে প্রায় ৮০০ ফুট সড়কের দুই পাশের দেয়ালকে বাগানে রূপ দিয়েছেন চার তরুণ। তাদের উদ্যোগে বদলে গেছে ময়মনসিংহ নগরের বাঁশবাড়ি কলোনির পরিবেশ, বেড়েছে পরিচ্ছন্নতা ও পরিবেশ রক্ষায় মানুষের সচেতনতা। ব্যতিক্রমী এই উদ্যোগ নজর কেড়েছে প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানেরও। তার নির্দেশে সম্প্রতি কলোনির দেয়াল বাগান পরিদর্শন করেছেন পরিবেশ, বন ও জলবায়ু পরিবর্তনমন্ত্রী আবদুল আউয়াল মিন্টু।
অল্প জায়গা, সীমিত উপকরণ আর সম্মিলিত সদিচ্ছা যে একটি এলাকার চেহারা বদলে দিতে পারে, বাঁশবাড়ি কলোনি তারই দৃষ্টান্ত। দেয়ালে ঝুলছে নানা প্রজাতির ফুল ও পাতাবাহারের গাছ। কোথাও অর্কিড, কোথাও সুগন্ধি ফুল, কোথাও আবার সবুজ পাতার সমারোহ। সন্ধ্যার পর হাসনাহেনার সুবাসে ভরে ওঠে চারপাশ। দেয়ালের গায়ে সাজানো এসব গাছের পাত্রের বেশির ভাগই একসময় ছিল পরিত্যক্ত।
স্থানীয় সূত্রে জানা যায়, ২০২৩ সালে ময়মনসিংহ সিটি করপোরেশন বাঁশবাড়ি কলোনির ভাঙাচোরা সড়ক ও নালা সংস্কার করে। সড়ক সংস্কার ও পয়োনিষ্কাশন ব্যবস্থার উন্নয়নের পর এলাকার পরিবেশ আরও সুন্দর করে তোলার পরিকল্পনা করেন চার তরুণ মুরাদ হাসান কানন, মেহেদী হাসান মুহিত, সাইফুল ইসলাম ও উত্তম সরকার। তারা এলাকার বাসিন্দাদের সঙ্গে আলোচনা করে দেয়ালে বাগান গড়ে তোলার প্রস্তাব দেন। বাসিন্দারাও তাতে সাড়া দেন।
এরপর শুরু হয় দেয়ালজুড়ে সবুজায়নের কাজ। পরিত্যক্ত ঝুড়ি, বালতি ও মগ সংগ্রহ করে সেগুলোতে মাটি ভরে লাগানো হয় বিভিন্ন প্রজাতির ফুল ও পাতাবাহার। পরিকল্পিতভাবে দেয়ালে ঝুলিয়ে দেওয়া হয় গাছের পাত্র। মাত্র তিন মাসের মধ্যে প্রায় ৮০০ ফুট সড়কের দুই পাশের দেয়াল হয়ে ওঠে সবুজ বাগান। যে দেয়ালগুলো একসময় আবর্জনা আর অপরিচ্ছন্নতার প্রতীক ছিল, সেগুলোই এখন এলাকার সৌন্দর্য বাড়াচ্ছে।
দেয়ালে ঝুলে থাকা গাছের ফাঁকে ফাঁকে চোখে পড়ে ছোট ছোট কাগজে লেখা একটি বার্তা, ‘এ গাছগুলো বিক্রির জন্য নহে’। বার্তাটি গাছের মালিকানা বোঝানোর পাশাপাশি বাসিন্দাদের সম্মিলিত উদ্যোগ ও ভালোবাসার কথাও জানায়। গাছের পরিচর্যায় অংশ নিচ্ছেন এলাকার মানুষ নিজেরাই। কেউ পানি দিচ্ছেন, কেউ নতুন গাছ লাগাচ্ছেন, কেউবা পুরোনো গাছের যত্ন নিচ্ছেন। নিজেদের কলোনিকে আরও সবুজ ও সুন্দর করে তোলার এই প্রচেষ্টায় যুক্ত হয়েছেন বিভিন্ন বয়সী মানুষ।
উদ্যোক্তা মুরাদ হাসান কানন বলেন, ‘আমাদের ছোট একটি উদ্যোগ এলাকার পরিবেশ বদলে দিয়েছে। কখনো ভাবিনি, আমাদের এই ছোট রাস্তাটি প্রধানমন্ত্রীর নজরে আসবে। দেশের আনাচকানাচের খবর রাখেন প্রধানমন্ত্রী, আমাদের বাঁশবাড়ি কলোনি তার একটি উদাহরণ। পরিবেশমন্ত্রী এসে এলাকাটি ঘুরে দেখেছেন। এটি আমাদের জন্য অনেক বড় প্রেরণা। আমরা চাই, আমাদের এই উদ্যোগ দেখে অন্য এলাকার মানুষও নিজেদের চারপাশ পরিচ্ছন্ন ও সবুজ করে তুলতে উৎসাহিত হোক।’
কলোনির বাসিন্দাদের কাছেও এই পরিবর্তন এখন গর্বের বিষয়। আগে সড়কের দুই পাশে ময়লা ফেলার কারণে পরিবেশ নোংরা থাকত। দুর্গন্ধে চলাচল করাও ছিল কষ্টকর। এখন সড়ক পরিচ্ছন্ন রাখার পাশাপাশি দেয়ালজুড়ে গাছ লাগানোয় বদলে গেছে পুরো এলাকার চেহারা। উদ্যোগটি দেখতে বাইরের মানুষও আসছেন। কেউ ছবি তুলছেন, কেউ ঘুরে দেখছেন, আবার কেউ নিজেদের এলাকায় এমন বাগান গড়ে তোলার পরিকল্পনা করছেন। শিশু-কিশোরদের মধ্যেও গাছের প্রতি ভালোবাসা ও পরিবেশ রক্ষার আগ্রহ তৈরি হচ্ছে।
স্থানীয় বাসিন্দা বেদেনা আক্তার বলেন, ‘আগে রাস্তা ভালো ছিল না। দুই পাশে সবাই ময়লা ফেলত। এখন রাস্তাও সুন্দর হয়েছে, দেয়ালগুলোতেও গাছ লাগিয়ে সাজানো হয়েছে। এতে পুরো কলোনির চেহারাই পাল্টে গেছে। আগে যে জায়গাটা নোংরা ছিল, এখন সেখানে আসতে ভালো লাগে।’
বাঁশবাড়ি কলোনির এই উদ্যোগের খবর প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের নজরে এলে তিনি পরিবেশ, বন ও জলবায়ু পরিবর্তনমন্ত্রী আবদুল আউয়াল মিন্টুকে বিষয়টি খোঁজখবর নিতে বলেন। এর পরিপ্রেক্ষিতে গত শুক্রবার সন্ধ্যায় এলাকাটি পরিদর্শন করেন মন্ত্রী।
ময়মনসিংহ সিটি করপোরেশনের প্রশাসক মো. রুকুনুজ্জামান বলেন, ‘বাঁশবাড়ি কলোনির দেয়াল বাগানের বিষয়টি প্রধানমন্ত্রীর নজরে আসার সঙ্গে সঙ্গেই তিনি সংশ্লিষ্টদের খোঁজখবর নেওয়ার নির্দেশ দেন। এর পরিপ্রেক্ষিতে গতকাল শুক্রবার সন্ধ্যায় পরিবেশ, বন ও জলবায়ু পরিবর্তনমন্ত্রী আবদুল আউয়াল মিন্টু এলাকাটি পরিদর্শন করেন।’
তিনি বলেন, ‘বাঁশবাড়ি কলোনির বাসিন্দারা নিজেদের উদ্যোগে দেয়ালগুলোকে বাগানে রূপ দিয়েছেন। এটি অত্যন্ত শিক্ষণীয় ও অনুকরণীয় উদ্যোগ। ইচ্ছা থাকলে নিজের চারপাশের পরিবেশ সুন্দর ও সবুজ রাখা সম্ভব। আমরা আশা করি, নগরীর অন্যান্য এলাকার বাসিন্দারাও নিজেদের বাসাবাড়ি ও আশপাশের পরিবেশ সবুজ গাছপালা ও ফুল দিয়ে সাজিয়ে তুলবেন। সম্মিলিত উদ্যোগের মাধ্যমেই একটি সুন্দর, পরিচ্ছন্ন ও পরিবেশবান্ধব নগর গড়ে তোলা সম্ভব।’
প্রশাসক আরও বলেন, ‘পরিবেশ রক্ষায় বড় উদ্যোগ নিতে সব সময় বিপুল অর্থায়ন কিংবা বিশাল আয়োজনের প্রয়োজন হয় না। বাঁশবাড়ি কলোনির দেয়াল বাগান সেই বার্তাই দিচ্ছে। পরিত্যক্ত উপকরণের পুনর্ব্যবহার, স্থানীয় মানুষের অংশগ্রহণ এবং কয়েকজন তরুণের সদিচ্ছা মিলেই এখানে গড়ে উঠেছে ব্যতিক্রমী এক দৃষ্টান্ত।’
তিনি বলেন, ‘নগরজীবনে দিন দিন সবুজের সংকট বাড়ছে। এমন পরিস্থিতিতে বাঁশবাড়ি কলোনির এই উদ্যোগ পরিবেশ সংরক্ষণে জনসচেতনতা বাড়ানোর পাশাপাশি নগরীর অন্যান্য এলাকার বাসিন্দাদেরও অনুপ্রাণিত করবে। পরিকল্পিতভাবে সম্মিলিত উদ্যোগ নেওয়া হলে নগরীর বিভিন্ন এলাকায় এ ধরনের দেয়াল বাগান গড়ে তোলা সম্ভব, যা ময়মনসিংহকে আরও সবুজ, সুন্দর ও বাসযোগ্য নগর হিসেবে গড়ে তুলতে ভূমিকা রাখবে।’