সেগুনবাগিচা থেকে আটক কে এই আয়াস, বারবার কেন আলোচনায়
বাংলাদেশ · 2026-10-10 14:48:41 · স্টাফ রিপোর্টার
জুলাই গণ-অভ্যুত্থান ঘিরে কর্মসূচি, ধানমন্ডি ৩২ নম্বরের ঘটনা, রাজনৈতিক প্রতিপক্ষের সঙ্গে সংঘর্ষ এবং নিজে হামলার শিকার হওয়াসহ নানা কারণে আলোচনা-সমালোচনায় এসেছেন আ ন ম আয়াস। এবার রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের গ্রাফিতি মুছতে যাওয়ার অভিযোগে আটক হয়েছেন তিনি। রাষ্ট্র সংলাপ ফোরাম নামের নিজের একটি সংগঠনও আছে। আজ
জুলাই গণ-অভ্যুত্থান ঘিরে কর্মসূচি, ধানমন্ডি ৩২ নম্বরের ঘটনা, রাজনৈতিক প্রতিপক্ষের সঙ্গে সংঘর্ষ এবং নিজে হামলার শিকার হওয়াসহ নানা কারণে আলোচনা-সমালোচনায় এসেছেন আ ন ম আয়াস। এবার রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের গ্রাফিতি মুছতে যাওয়ার অভিযোগে আটক হয়েছেন তিনি। রাষ্ট্র সংলাপ ফোরাম নামের নিজের একটি সংগঠনও আছে।
আজ শনিবার দুপুরে রাজধানীর সেগুনবাগিচায় বাংলাদেশ শিল্পকলা একাডেমির সামনে থেকে তাঁকে আটক করে শাহবাগ থানা-পুলিশ। শাহবাগ থানার কর্তব্যরত উপপরিদর্শক (এসআই) আবদুল খালেক গণমাধ্যমকে বলেন, শিল্পকলার সামনে থেকে আয়াসকে আটক করে থানায় আনা হয়েছে। তিনি সেখানকার ফুটপাতের দেয়ালে আঁকা রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের গ্রাফিতি মুছে দেওয়ার চেষ্টা করেছিলেন।
৫ অক্টোবর সেগুনবাগিচায় শিল্পকলা একাডেমির সামনের ফুটপাত দখলমুক্ত করে ঢাকা দক্ষিণ সিটি করপোরেশন। এরপর ফুটপাতের দেয়ালে শিল্পাচার্য জয়নুল আবেদিন, সত্যজিৎ রায়, রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর ও কাজী নজরুল ইসলামসহ শিল্প, সাহিত্য ও সংস্কৃতিতে অবদান রাখা ১০ গুণী ব্যক্তিত্বের প্রতিকৃতি আঁকা হয়।
প্রেসক্লাবে সংঘর্ষ, পরে মারধরের শিকার
আয়াস এক সময় বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলনের ময়মনসিংহ মহানগর শাখার সদস্যসচিব ছিলেন। তিনি ঢাকায় এসে প্রথম সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে আলোচনায় আসেন ৪ আগস্ট জাতীয় প্রেসক্লাবের সামনে একটা সংঘাতে জড়িয়ে। ওই দিন নতুন ধারা বাংলাদেশ (এনডিবি) এবং রাষ্ট্র সংলাপ ফোরামের নেতা-কর্মীদের মধ্যে সংঘর্ষের ঘটনা ঘটে। ওই ঘটনায় আয়াস নিজেও মারধরের শিকার হন।
এর আগে আয়াস জুলাই গণ-অভ্যুত্থান ও শহীদদের নিয়ে কটূক্তির অভিযোগ তুলে নতুন ধারা বাংলাদেশ নামের একটি সংগঠনের ভাইস চেয়ারম্যান শান্তা ফারজানাকে চড় মেরেছিলেন বলে অভিযোগ ওঠে। এ ঘটনার জেরে দুই সংগঠনের পাল্টাপাল্টি কর্মসূচি চলাকালে সংঘর্ষ হয়।
সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়া একটি ভিডিওতে শান্তা ফারজানাসহ কয়েকজনকে আয়াসের ওপর চড়াও হতে দেখা যায়। একপর্যায়ে আয়াস মাটিতে পড়ে গেলে তাঁকে পাইপ দিয়ে আঘাত করার দৃশ্যও ভিডিওতে দেখা যায়। অন্য একটি ভিডিওতে আয়াসকেও পাল্টা আঘাত করতেও দেখা যায়।
পরে আহত ব্যক্তিরা ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে চিকিৎসা নিতে গেলে সেখানেও দুই পক্ষের মধ্যে মারামারি হয়। এ ঘটনায় আয়াসের ওপর হামলার অভিযোগে করা সন্ত্রাসবিরোধী আইনের মামলায় নতুন ধারা বাংলাদেশের কয়েকজন নেতাকে আসামি করা হয়।
ধানমন্ডি ৩২ নম্বরের ঘটনা
এরপর আয়াস আবার আলোচনায় আসেন ১৫ আগস্ট। ওই দিন ধানমন্ডি ৩২ নম্বরে শেখ মুজিবুর রহমানের ভেঙে দেওয়া বাড়ির সামনে আয়াসের নেতৃত্বে একদল লোক অবস্থান নেন। সেদিন সেখানে ‘জয় বাংলা’ স্লোগান দেওয়া, মুঠোফোনে ভিডিও ধারণ ও শিঙাড়া বিতরণের অভিযোগ তুলে তিন ব্যক্তিকে মারধর করা হয়।
সেদিন সরেজমিনে দেখা যায়, আয়াসের নেতৃত্বে অবস্থান নেওয়া ওই ব্যক্তিরা তিনজনকে মারধর করেন। একপর্যায়ে এক রিকশাচালকের মুঠোফোন পরীক্ষা করে ভিডিওটি যুবলীগের একজনের কাছে পাঠানোর অভিযোগ তোলেন আয়াস। এরপর তাঁর সঙ্গে থাকা কয়েকজন ওই রিকশাচালককে মারধর করেন।
ওই সময় আয়াস সাংবাদিকদের বলেছিলেন, আওয়ামী লীগ ও যুবলীগের নেতা-কর্মীরা যাতে কোনো ধরনের অপতৎপরতা চালাতে না পারেন, সে জন্য তাঁরা সেখানে অবস্থান নিয়েছেন। কাউকে পেলে পুলিশের কাছে তুলে দিচ্ছেন।
সেখানে ‘মব’ সৃষ্টি করে লোকজনকে মারধরের বিষয়ে সাংবাদিকদের প্রশ্নের জবাবে আয়াস দাবি করেছিলেন, তাঁরা কোনো মব সৃষ্টি করছেন না। সন্দেহভাজন ব্যক্তিদের ধরে পুলিশের কাছে সোপর্দ করছেন।
ময়মনসিংহে ছুরিকাঘাতে আহত হয়েছিলেন
এর আগে গত বছরের ২৬ মে ময়মনসিংহে হামলার শিকার হয়েছিলেন আয়াস। সে সময় তিনি বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলনের ময়মনসিংহ মহানগর শাখার সদস্যসচিব ছিলেন। ওই দিন নগরের পাটগুদাম ব্রিজ মোড় এলাকায় একদল ব্যক্তি আয়াসকে মারধর ও ছুরিকাঘাত করেন। পরে তাঁকে ময়মনসিংহ মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে ভর্তি করা হয়।
আয়াস তখন গণমাধ্যমকে জানিয়েছিলেন, পাঁচ থেকে ছয়জন যুবক তাঁকে ছুরি ঠেকিয়ে সড়কের নিচের দিকে নিয়ে যান। বঙ্গবন্ধুর ম্যুরাল ভাঙচুরের প্রসঙ্গ তুলে তাঁকে হুমকি দেওয়া হয়। এরপর লাঠি দিয়ে পেটানো হয়। পালানোর চেষ্টা করলে হাতে ও পায়ে ছুরিকাঘাত করা হয়।
ময়মনসিংহ মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের চিকিৎসকেরা আয়াসের শরীরে আঘাতের চিহ্ন পাওয়ার বিষয়টি নিশ্চিত করেছিলেন। তবে কারা কী কারণে হামলা করেছিলেন, তা তখন নিশ্চিত করতে পারেনি পুলিশ।
ময়মনসিংহে আবার হামলার অভিযোগ
গত ১৬ আগস্ট ময়মনসিংহের ভালুকায় আবার হামলার শিকার হওয়ার অভিযোগ করেন আয়াস। তাঁর দাবি, সংগঠনের কাজে সেখানে গেলে আওয়ামী লীগ ও ছাত্রলীগের ১৫ থেকে ২০ জন নেতা-কর্মী তাঁর ওপর হামলা চালান। একপর্যায়ে তাঁকে একটি মাইক্রোবাসে তুলে নেওয়ার চেষ্টা করা হয়। এ ঘটনার পর আয়াস নিখোঁজ হয়েছেন বলে খবর ছড়িয়ে পড়ে। তবে ওই দিন সন্ধ্যায় তিনি নিজেই ভালুকা মডেল থানায় গিয়ে হামলার মৌখিক অভিযোগ করেন।
থানার তৎকালীন ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা মোহাম্মদ জাহিদুল ইসলাম সাংবাদিকদের জানিয়েছিলেন, আয়াস প্রায় ১০ মিনিট থানায় অবস্থান করেন। তাঁকে পুলিশি সহায়তা দেওয়ার প্রস্তাব দেওয়া হলেও তিনি তা নেননি।
তিন নারীর বিরুদ্ধে জিডি
জুলাই গণ-অভ্যুত্থান ও শহীদদের স্মৃতিচিহ্ন নিয়ে অবমাননাকর মন্তব্য করার অভিযোগে গত ৩ জুলাই অভিনেত্রী মেহের আফরোজ শাওন, চিত্রনায়িকা মাহিয়া মাহি ও নতুন ধারা বাংলাদেশের শান্তা ফারজানার বিরুদ্ধে শাহবাগ থানায় সাধারণ ডায়েরি (জিডি) করেন আয়াসসহ তাঁর সংগঠনের তিন ব্যক্তি। সংগঠনটির অভিযোগ ছিল, ওই তিন নারী সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে জুলাই গণ-অভ্যুত্থান নিয়ে অবমাননাকর মন্তব্য ও কর্মকাণ্ড করেছেন।
পুলিশ তখন জানিয়েছিল, জিডিটি ঢাকা মহানগর পুলিশের গোয়েন্দা বিভাগের সাইবার ইউনিটে পাঠানো হয়েছে।
সাকিবের বাড়ির সামনে ভিডিও ঘিরে সমালোচনা
গত ২০ সেপ্টেম্বর মাগুরায় ক্রিকেটার সাকিব আল হাসানের বাড়ির সামনে আয়াসের একটি কর্মকাণ্ড নিয়েও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে আলোচনা-সমালোচনা হয়। তখন বিভিন্ন সংবাদমাধ্যমে প্রকাশিত একাধিক প্রতিবেদনে বলা হয়, মাগুরা শহরের কেশব মোড়ে সাকিবের বাড়ির ফটকের সামনে প্রস্রাব করার একটি ভিডিও নিজের ফেসবুক অ্যাকাউন্টে প্রকাশ করেন আয়াস। ওই ভিডিও ছড়িয়ে পড়ার পর তাঁর আচরণ নিয়ে সমালোচনা শুরু হয়।
এর আগে জুলাই গণ-অভ্যুত্থানে নিহত ব্যক্তিদের কবর জিয়ারতসহ কয়েকটি কর্মসূচিতে অংশ নিতে মাগুরায় গিয়েছিলেন তিনি।
সর্বশেষ আজ দুপুরে সেগুনবাগিচা থেকে গ্রাফিতি মুছে ফেলার অভিযোগে আয়াসসহ তিনজনকে আটকের পর ঢাকা মহানগর গোয়েন্দা শাখায় (ডিবি) নেওয়া হয়েছে বলে পুলিশ জানিয়েছে।