এক মিনিটের ঝড়ে অনেক পরিবারে নেমে এলো দুর্দশা
বৃহত্তর ময়মনসিংহ · 2026-09-20 14:19:03 · স্টাফ রিপোর্টার
ময়মনসিংহের হালুয়াঘাটে মাত্র এক মিনিটের আকস্মিক ঝড়ে অর্ধশতাধিক ঘরবাড়ি ও স্থাপনা ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। উপড়ে পড়েছে অনেক গাছ ও বৈদ্যুতিক খুঁটি। বন্ধ হয়ে গেছে বিদ্যুৎ সরবরাহ। ঝড়ের পর থেকে গুঁড়ি গুঁড়ি বৃষ্টি হওয়ায় ক্ষতিগ্রস্ত পরিবারগুলো চরম দুর্ভোগে পড়েছে।
রোববার (২০ সেপ্টেম্বর) ভোর সাড়ে ৪টার দিকে হালুয়াঘাট উপজেলার ধুরাইল ইউনিয়নের পশ্চিম পাবিয়াজুরী ও গোরকপুর এলাকায় আকস্মিক এ ঝড় বয়ে যায়। এতে বসতঘরের টিনের চাল উড়ে যাওয়ার পাশাপাশি অনেক গাছ ও বৈদ্যুতিক খুঁটি উপড়ে পড়ে।
গাছ পড়ে যাওয়ার কারণে যানবাহন চলাচলও ব্যাহত হয়। পাশের জেলা শেরপুরের নালিতাবাড়ী উপজেলার মরিচপুরান ও মাথাফাটা এলাকাতেও ঝড়ের প্রভাব পড়ে।
স্থানীয় ও প্রশাসন সূত্রে জানা যায়, ভোর সাড়ে ৪টার দিকে হঠাৎ আকাশে বিদ্যুৎ চমকাতে শুরু করে। এরপর শুরু হয় ঝড়ো হাওয়া ও বজ্রপাত। একপর্যায়ে মাত্র এক মিনিটের তীব্র দমকা হাওয়ায় ছোট-বড় গাছ উপড়ে পড়ে। পশ্চিম পাবিয়াজুরী ও গোরকপুর এলাকায় অর্ধশতাধিক ঘরবাড়ি ও বিভিন্ন স্থাপনা ক্ষতিগ্রস্ত হয়। ঝড়ের পর থেকেই অনেক এলাকায় বিদ্যুৎ সরবরাহ বন্ধ রয়েছে।
ঝড়ে সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্তদের একজন গোরকপুর উত্তরপাড়ার বাসিন্দা শফিকুল ইসলাম। তার বসতঘর ও রান্নাঘর ঝড়ে বিধ্বস্ত হয়েছে। উড়ে গেছে ঘরের টিনের চালা। এক মুহূর্তের ঝড়ে মাথা গোঁজার ঠাঁই হারিয়ে দিশাহারা হয়ে পড়েছেন তিনি।
রোববার বেলা ১১টার দিকে ঘটনাস্থলে গিয়ে দেখা যায়, শফিকুল ইসলামের ঘরের টিনের চাল নেই। ঘরের বিভিন্ন অংশ ভেঙে পড়ে আছে। চারদিকে ছড়িয়ে-ছিটিয়ে রয়েছে টিন ও কাঠের খুঁটি। ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে ধানের মাচাও।
শফিকুল ইসলাম বলেন, ‘আমি দৃষ্টিপ্রতিবন্ধী। এক চোখে দেখতে পাই না। অটোরিকশা চালিয়ে কোনো রকমে সংসার চালাই। অনেক কষ্ট করে ভিটায় নতুন ঘর করেছিলাম। কিন্তু মাত্র এক মিনিটের ঝড়ে আমার সব শেষ হয়ে গেল। ঘরের একটি চালা উড়ে গিয়ে প্রায় ১০০ গজ দূরে পড়ে আছে। বিদ্যুতের মিটারটি এখনও খুঁজে পাইনি।’
শুধু শফিকুল ইসলাম নন, গোরকপুর ও পশ্চিম পাবিয়াজুরী এলাকার বহু পরিবার ঝড়ে ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে।
গোরকপুর এলাকার বিধবা রাহিলার বসতঘরও ঝড়ে ভেঙে গেছে। তিনি বলেন, ‘আমার স্বামী নেই। অনেক কষ্টে দিন কাটে। ঝড়ে আমার ঘরটাও ভেঙে গেছে। আমার একটা ব্যবস্থা করে দেন।’
পশ্চিম পাবিয়াজুরী এলাকার বাসিন্দা রুবেল পরিবারের সদস্যদের নিয়ে ঘরে ছিলেন। হঠাৎ ঝড়ে তার ঘরের চালা উড়ে যায়। ভেঙে পড়া খুঁটির নিচে চাপা পড়ে তিনি গুরুতর আহত হন।
রুবেলের স্ত্রী রেনুয়ারা জানান, রুবেলকে নালিতাবাড়ী উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে ভর্তি করা হয়েছে।
গোরকপুর বাজারে হেলাল উদ্দিনের দোকান ঝড়ে বিধ্বস্ত হয়েছে। পশ্চিম পাবিয়াজুরী এলাকার বাসিন্দা আজি রহমানের বসতঘর ও গোয়ালঘর ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। তার ঘরের চারটি চালা নষ্ট হয়েছে। তার দুই ছেলে আহত হয়েছেন। গোয়ালঘরে থাকা একটি গরুর পা কেটে গেছে।
গোরকপুর উত্তরপাড়া সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয় ভবনও ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। বিদ্যালয়ের সহকারী শিক্ষক শফিকুল ইসলাম বলেন, ‘ভোরের ঝড়ে বিদ্যালয়ের বেশ কয়েকটি গাছ ভেঙে গেছে।’
ঝড়ে সবজি ক্ষেতেরও ব্যাপক ক্ষতি হয়েছে। স্থানীয়রা গাছপালা সরিয়ে সড়কে যান চলাচল স্বাভাবিক করার চেষ্টা করছেন।
এদিকে গোরকপুর এলাকায় ৩টি ট্রান্সফরমার ও কয়েকটি বিদ্যুতের খুঁটি ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ায় বিদ্যুৎ সরবরাহ বন্ধ রয়েছে। ঝড়ের পর থেকেই বিদ্যুৎ না থাকায় চরম ভোগান্তিতে রয়েছেন স্থানীয় বাসিন্দারা।
ধুরাইল ইউনিয়ন পরিষদের ৫ নম্বর ওয়ার্ডের সাবেক ইউপি সদস্য মোস্তফা কামাল বলেন, দুই গ্রামে প্রায় দেড় কোটি টাকার ক্ষয়ক্ষতি হয়েছে বলে তারা অনুমান করছেন। তিনি বলেন, ‘মুহূর্তের মধ্যেই অর্ধশতাধিক ঘরবাড়ি ভেঙে গেছে, গাছ উপড়ে গেছে। ক্ষতিগ্রস্ত পরিবারগুলো এখন মানবেতর অবস্থায় রয়েছে। আমরা দ্রুত প্রশাসনের সহযোগিতা কামনা করছি।’
ঝড়ের খবর পাওয়ার পরপরই স্থানীয় সংসদ সদস্য সালমান ওমর রুবেলের নির্দেশে তার একটি প্রতিনিধি দল ক্ষতিগ্রস্ত এলাকায় ছুটে যায়। প্রতিনিধি দলের সদস্যরা ঘটনাস্থল সরেজমিনে পরিদর্শন করেন এবং ক্ষতিগ্রস্ত পরিবারগুলোর সঙ্গে কথা বলে তাদের দুর্ভোগ ও ক্ষয়ক্ষতির বিষয় অবহিত হন। ক্ষতিগ্রস্তদের প্রয়োজনীয় সহায়তা দেওয়ার উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে।
প্রতিনিধি দলের সদস্য ফয়সাল আহমেদ বলেন, ‘ঝড়ে ক্ষয়ক্ষতির খবর পাওয়ার সঙ্গে সঙ্গেই আমাদের সংসদ সদস্য সালমান ওমর রুবেলের নির্দেশে আমরা ঘটনাস্থলে ছুটে যাই। সেখানে ক্ষতিগ্রস্ত পরিবারগুলোর সঙ্গে কথা বলে তাদের দুর্ভোগ ও ক্ষয়ক্ষতির বিষয়টি সরেজমিনে দেখেছি। যাতে দ্রুত প্রয়োজনীয় সহায়তা দেওয়া যায়, সে বিষয়ে ব্যবস্থা নেওয়া হয়েছে।’
তিনি বলেন, ‘আমাদের এমপি সালমান ওমর রুবেল ক্ষতিগ্রস্তদের পাশে থাকার আশ্বাস দিয়েছেন। ক্ষতিগ্রস্ত পরিবারগুলো যেন দ্রুত প্রয়োজনীয় সহযোগিতা পায়, সে বিষয়ে সংশ্লিষ্টদের সঙ্গে সমন্বয় করে কাজ করা হচ্ছে। পরিস্থিতি বিবেচনায় নিয়ে পরবর্তী সময়েও ক্ষতিগ্রস্তদের পাশে থেকে প্রয়োজনীয় সহযোগিতা অব্যাহত রাখার উদ্যোগ নেওয়া হবে।’
হালুয়াঘাট উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) ফয়সাল আহমেদ বলেন, ‘ঝড়ে ক্ষয়ক্ষতির বিষয়টি উপজেলা প্রশাসনের নজরে এসেছে। প্রাথমিকভাবে প্রায় ১৫টি পরিবার ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ার তথ্য পাওয়া গেছে। ক্ষয়ক্ষতির পরিমাণ ও প্রকৃত অবস্থা জানতে উপজেলা প্রশাসনের একটি টিম ঘটনাস্থল সরেজমিনে পরিদর্শন করেছে।’
তিনি আরও বলেন, ‘ক্ষতিগ্রস্ত পরিবারগুলোর বিষয়ে প্রয়োজনীয় তথ্য সংগ্রহ করা হচ্ছে। ক্ষয়ক্ষতির পূর্ণাঙ্গ তালিকা ও পরিস্থিতি পর্যালোচনা করে প্রশাসনের পক্ষ থেকে ক্ষতিগ্রস্তদের পাশে দাঁড়ানোর জন্য প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়া হবে। তাদের প্রয়োজন অনুযায়ী সরকারি সহায়তা দেওয়ার বিষয়টিও গুরুত্বের সঙ্গে বিবেচনা করা হচ্ছে। পাশাপাশি ঝড়ে ক্ষতিগ্রস্ত অন্যান্য এলাকা ও পরিবারের বিষয়েও খোঁজখবর নেওয়া হচ্ছে।’