ডেঙ্গু: ময়মনসিংহে আরও দুজনের মৃত্যু, হাসপাতালে ভর্তি ৩৭
বৃহত্তর ময়মনসিংহ · 2026-09-18 09:12:04 · স্টাফ রিপোর্টার
ময়মনসিংহ মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে চিকিৎসাধীন অবস্থায় ডেঙ্গু আক্রান্ত আরও দুই রোগীর মৃত্যু হয়েছে। এ নিয়ে চলতি বছর হাসপাতালটিতে ডেঙ্গুতে মৃতের সংখ্যা দাঁড়িয়েছে ২০ জনে। একই সময়ে ডেঙ্গু আক্রান্ত হয়ে আরও ৩৭ জন হাসপাতালে ভর্তি হয়েছেন।
শুক্রবার (১৮ সেপ্টেম্বর) হাসপাতালের ডেঙ্গু ওয়ার্ডের সহকারী ফোকালপারসন ডা. মো. সেলিম উদ্দিন ২৪ ঘণ্টার সর্বশেষ আপডেটে এসব তথ্য জানান।
মারা যাওয়া দুজন হলেন- নেত্রকোনা জেলার বারহাট্টা উপজেলার ইসহাক মিয়ার স্ত্রী কুলসিমা (৫০) এবং তারাকান্দা উপজেলার নুরুল আমিনের ছেলে আল আমিন (৩৫)।
হাসপাতাল সূত্রে জানা যায়, গত ১৬ সেপ্টেম্বর বিকেল সাড়ে ৩টার দিকে ডেঙ্গু আক্রান্ত হয়ে ময়মনসিংহ মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে ভর্তি হন কুলসুমা। বৃহস্পতিবার রাত ১০টার দিকে চিকিৎসাধীন অবস্থায় তার মৃত্যু হয়।
অন্যদিকে, আল আমিন ১৬ সেপ্টেম্বর রাত সাড়ে ৮টার দিকে ডেঙ্গু আক্রান্ত হয়ে হাসপাতালে ভর্তি হন। বৃহস্পতিবার রাত ১১টার দিকে চিকিৎসাধীন অবস্থায় তার মৃত্যু হয়।
হাসপাতাল সূত্রে জানা গেছে, চলতি বছরের শুরু থেকে এ পর্যন্ত ময়মনসিংহ মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে ২ হাজারের বেশি ডেঙ্গু রোগী ভর্তি হয়েছেন। বর্তমানে হাসপাতালে ১০৩ ডেঙ্গু রোগী চিকিৎসাধীন রয়েছেন। তাদের মধ্যে ৫৭ পুরুষ, ৩৬ নারী ও ১০ শিশু।
পুরুষ রোগীদের মধ্যে একজন আইসিইউতে এবং দুজন কেবিনে চিকিৎসাধীন। অন্যরা সাধারণ ওয়ার্ডে রয়েছেন। নারী রোগীদের সবাই সাধারণ ওয়ার্ডে চিকিৎসা নিচ্ছেন। শিশুদের মধ্যে চার ছেলে ও দুই মেয়ে রয়েছে।
হাসপাতাল কর্তৃপক্ষের তথ্য অনুযায়ী, চলতি বছরের মোট ডেঙ্গু রোগীর বড় একটি অংশ গত জুলাই ও আগস্ট মাসে হাসপাতালে ভর্তি হয়েছেন।
হাসপাতালের মাসভিত্তিক পরিসংখ্যান অনুযায়ী, জানুয়ারিতে ২২ জন, ফেব্রুয়ারিতে ১১ জন, মার্চে ১৫ জন, এপ্রিলে ৯ জন, মে মাসে ২০ জন, জুনে ৫৭ জন এবং জুলাইয়ে ৩৬০ জন, আগস্ট ৯৬৭ জন ডেঙ্গু রোগী হাসপাতালে ভর্তি হন। সেপ্টেম্বরে ১৮ দিনে এ সংখ্যা একলাফে বেড়ে দাঁড়ায় ৯২৯ জনে।
অর্থাৎ, বছরের প্রথম ছয় মাসের তুলনায় জুলাই ও আগস্টে ডেঙ্গু রোগীর সংখ্যা উল্লেখযোগ্যভাবে বেড়েছে। বিশেষ করে আগস্টে রোগী ভর্তির সংখ্যা সর্বোচ্চ পর্যায়ে পৌঁছায়। এতে বর্ষা মৌসুমের শেষভাগে ময়মনসিংহে ডেঙ্গুর প্রকোপ দ্রুত বাড়ার চিত্র পাওয়া যাচ্ছে।
হাসপাতালের তথ্য অনুযায়ী, চলতি বছর ফেব্রুয়ারিতে একজন, জুনে তিনজন, জুলাইয়ে দুজন এবং আগস্টে চারজন ডেঙ্গু আক্রান্ত হয়ে মারা যান। সেপ্টেম্বরে এখন পর্যন্ত আরও ১০ জনের মৃত্যু হয়েছে।
বছরের প্রথম পাঁচ মাসে ডেঙ্গু রোগীর সংখ্যা তুলনামূলক কম ছিল। জানুয়ারি থেকে মে পর্যন্ত প্রতি মাসে ৯ থেকে ২২ রোগী হাসপাতালে ভর্তি হন। জুনে রোগী ভর্তি বেড়ে দাঁড়ায় ৫৭ জনে। জুলাইয়ে তা একলাফে বেড়ে হয় ৩৬০ জন। এরপর আগস্টে পরিস্থিতি আরও অবনতির দিকে যায় এবং এক মাসেই ৯৬৭ জন ডেঙ্গু রোগী হাসপাতালে ভর্তি হন। সেপ্টেম্বরের ১৮ দিনে ৯২৯ রোগী ভর্তি হন।
হাসপাতালে চিকিৎসাধীন ডেঙ্গু রোগী দেলোয়ার হোসেন বলেন, হঠাৎ জ্বর ও শরীর ব্যথা শুরু হলে আমাকে হাসপাতালে নিয়ে আসা হয়। পরীক্ষা-নিরীক্ষার পর ডেঙ্গু শনাক্ত হয়। বর্তমানে হাসপাতালে চিকিৎসা চলছে। প্রতিদিন যেভাবে ডেঙ্গু রোগীর সংখ্যা বাড়ছে, তাতে আমরা খুবই উদ্বিগ্ন।
তিনি বলেন, হাসপাতালে রোগীর এত চাপ যে তিল ধারণের ঠাঁই নেই। দ্রুত মশা নিধনের পাশাপাশি হাসপাতাল ও আশপাশের এলাকা পরিষ্কার-পরিচ্ছন্ন রাখার ব্যবস্থা করা জরুরি।
নগরীর কাচিঝুলি এলাকার বাসিন্দা রিপন মিয়া বলেন, হঠাৎ শরীরে জ্বর আসে। শরীরে পছন্দ ব্যথা শুরু হয়। প্রথমে স্বাভাবিক জ্বর মনে করে বিষয়টি গুরুত্ব দিইনি। কিন্তু পরদিন হঠাৎ জ্ঞান হারিয়ে ফেলি। পরে দ্রুত আমাকে হাসপাতালে নিয়ে আসা হয়। পরীক্ষা-নিরীক্ষার পর জানা যায়, আমি ডেঙ্গুতে আক্রান্ত।
ময়মনসিংহ মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের সহকারী পরিচালক (প্রশাসন) ডা. মোহাম্মদ মাইনউদ্দিন খান বলেন, ‘প্রতিবছর বর্ষা মৌসুমে ডেঙ্গু রোগীর সংখ্যা বাড়ে। বিষয়টি বিবেচনায় নিয়ে শুরু থেকেই হাসপাতালের ২৭ নম্বর ওয়ার্ডকে ডেঙ্গু রোগীদের জন্য আইসোলেটেড ওয়ার্ড হিসেবে ঘোষণা করা হয়েছে। সেখানে বিশেষ ব্যবস্থাপনা টিমের মাধ্যমে ডেঙ্গু রোগীদের চিকিৎসা দেওয়া হচ্ছে। চিকিৎসক, নার্সসহ প্রয়োজনীয় জনবল নিয়ে এ টিম গঠন করা হয়েছে।’
তিনি আরও বলেন, ‘ডেঙ্গু ব্যবস্থাপনায় হাসপাতালের ফোকালপারসন হিসেবে দায়িত্ব পালন করছেন অধ্যাপক ডা. এমদাদ এবং অ্যাসিস্ট্যান্ট ফোকালপারসন হিসেবে দায়িত্ব পালন করছেন ডা. সেলিম। তাদের তত্ত্বাবধানে ডেঙ্গু রোগীদের চিকিৎসা কার্যক্রম পরিচালিত হচ্ছে। পাশাপাশি হাসপাতালের পরিচালক, উপপরিচালক, সহকারী পরিচালকসহ প্রশাসনের কর্মকর্তারা নিয়মিত চিকিৎসাসেবা ও সার্বিক পরিস্থিতি তদারকি করছেন।’
ডা. মোহাম্মদ মাইনউদ্দিন খান বলেন, ‘ময়মনসিংহ মেডিকেল কলেজ হাসপাতাল ১ হাজার শয্যার। ডেঙ্গু রোগীর সংখ্যা আরও বেড়ে গেলে অতিরিক্ত রোগীদের জন্য জায়গা ব্যবস্থাপনা কিছুটা কঠিন হয়ে পড়তে পারে। তবে এটি জাতীয় পর্যায়ের একটি সংকট। পরিস্থিতি বিবেচনায় রেখে হাসপাতাল কর্তৃপক্ষ প্রয়োজনীয় প্রস্তুতি রাখছে।