অটোরিকশার দখলে ময়মনসিংহ নগরী, যানজটের সঙ্গে বাড়ছে বিদ্যুতের চাপ
বৃহত্তর ময়মনসিংহ · 2026-09-19 08:51:01 · স্টাফ রিপোর্টার
ময়মনসিংহ নগরীতে যানজট এখন নিত্যদিনের দুর্ভোগ। সকাল থেকে গভীর রাত পর্যন্ত প্রধান সড়ক, গুরুত্বপূর্ণ মোড় থেকে শুরু করে অলিগলি—প্রায় সর্বত্রই ইজিবাইক ও ব্যাটারিচালিত রিকশার আধিক্য চোখে পড়ে। ধারণক্ষমতার তুলনায় কয়েক গুণ বেশি অটোরিকশা চলাচলের কারণে বাড়ছে যানজট, সড়কে বিশৃঙ্খলা এবং দুর্ঘটনার ঝুঁকি। এর পাশাপাশি এসব অটোরিকশার ব্যাটারি চার্জে প্রতি মাসে খরচ হচ্ছে বিপুল পরিমাণ বিদ্যুৎ।সরেজমিনে নগরীর শম্ভুগঞ্জ মোড়, বাইপাস মোড়, পাটগুদাম ব্রিজ মোড়, চরপাড়া, মিন্টু কলেজ রোড, গাঙ্গিনারপাড়, ত্রিশাল বাসস্ট্যান্ড, নতুন বাজার, জিলা স্কুল মোড়, টাউন হল, বাতিরকল ও আকুয়া মাদ্রাসা কোয়ার্টার এলাকায় দেখা যায় সকাল থেকে রাত পর্যন্ত যানবাহনের চাপ লেগেই আছে।
বিশেষ করে স্কুল-কলেজ ছুটির পর নতুন বাজার ও জিলা স্কুল মোড়ে শত শত ইজিবাইক ও রিকশা একসঙ্গে আটকে পড়ে। কোথাও যাত্রী ওঠানামা, কোথাও সড়কের ওপর দাঁড়িয়ে অপেক্ষা, আবার কোথাও গড়ে উঠেছে অনুমোদনহীন স্ট্যান্ড। একটি অটোরিকশা সড়কে দাঁড়িয়ে যাত্রী তুলতে শুরু করলেই পেছনে আটকে পড়ে অন্য যানবাহন। ছোট একটি জট একপর্যায়ে দীর্ঘ যানজটে রূপ নেয়।
নগরীর চরপাড়া থেকে পলিটেকনিক মোড় পর্যন্ত সড়কেও রয়েছে বাড়তি চাপ। দুই লেনের এই সড়কের বিভিন্ন অংশে হকারদের দখলের পাশাপাশি রাস্তার পাশে দাঁড়িয়ে থাকে মোটরসাইকেল ও ব্যক্তিগত গাড়ি। এতে সড়কের ব্যবহারযোগ্য অংশ সংকুচিত হয়ে পড়ে।
এর সঙ্গে রয়েছে ময়মনসিংহ মেডিকেল কলেজ হাসপাতাল ও আশপাশের অসংখ্য ক্লিনিক-ডায়াগনস্টিক সেন্টার। ফলে রোগী, স্বজন, চিকিৎসক ও কর্মচারীদের ব্যাপক চলাচলে হাসপাতাল এলাকার যানজট প্রায়ই তীব্র আকার ধারণ করে। জরুরি বিভাগের সামনে অ্যাম্বুলেন্সের ভিড়ে তৈরি হয় অচলাবস্থা। এতে মুমূর্ষু রোগীদের দ্রুত হাসপাতালে পৌঁছানোও ব্যাহত হয়।
ময়মনসিংহ সিটি করপোরেশনের তথ্য অনুযায়ী, নগরীতে লাইসেন্সধারী চিকন চাকার রিকশা ৫ হাজার ৫০০টি, মোটা চাকার মিশুক ৬ হাজার এবং লম্বা অটোরিকশা ৫ হাজার ৯৪৫টি। অর্থাৎ লাইসেন্সধারী যানবাহনের সংখ্যা ১৬ হাজারেরও কম। এর বাইরে অনুমোদনহীন অটোরিকশার সংখ্যা প্রায় ২৫ হাজার বলে জানিয়েছে সিটি করপোরেশন।
এদিকে জেলার ১৩টি উপজেলায় প্রায় ৪৮ হাজার অটোরিকশা চলাচল করে। এর একটি অংশ প্রতিদিন নগরীতে প্রবেশ করে। প্রশাসনের তথ্য অনুযায়ী, বিভিন্ন এলাকা থেকে প্রতিদিন নগরীতে আরও ২০ থেকে ২৫ হাজার অটোরিকশা ঢোকে। ফলে নগরীতে বৈধ-অবৈধ মিলিয়ে অটোরিকশার প্রকৃত সংখ্যা নিয়ন্ত্রণের বাইরে চলে যাওয়ার অভিযোগ রয়েছে।
অটোরিকশার এই আধিক্যের প্রভাব পড়ছে বিদ্যুৎ ব্যবস্থাতেও। সংশ্লিষ্টদের হিসাবে, নগরীতে প্রায় ৩৭ থেকে ৪০ হাজার অটোরিকশা চলাচল করছে। এসব যানবাহনের ব্যাটারি চার্জে প্রতি মাসে আনুমানিক ১৯ লাখ ২২ হাজার ইউনিট বিদ্যুৎ ব্যবহৃত হচ্ছে। এর বিপরীতে মাসে বিদ্যুৎ বিল আসে প্রায় ১ কোটি ৭৭ লাখ ৮৪ হাজার টাকা। অর্থাৎ বছরে এই খাতে বিদ্যুতের ব্যয় দাঁড়ায় প্রায় ২১ কোটি ৩৪ লাখ টাকা।
অভিযোগ রয়েছে, কিছু এলাকায় অবৈধ সংযোগ ব্যবহার করেও অটোরিকশার ব্যাটারি চার্জ দেওয়া হচ্ছে। এতে বিদ্যুতের ওপর বাড়তি চাপের পাশাপাশি সরকার রাজস্ব থেকেও বঞ্চিত হচ্ছে।
টিআইবি ময়মনসিংহ জেলা শাখার সহসভাপতি শরীফুজ্জামান টিটুর মতে, অটোরিকশার সংখ্যা নিয়ন্ত্রণ করে নির্ধারিত সংখ্যক যানবাহনকে বৈধ লাইসেন্সের আওতায় আনা প্রয়োজন। এতে একদিকে যানজট ও জনদুর্ভোগ কমবে, অন্যদিকে ব্যাটারি চার্জে অতিরিক্ত বিদ্যুৎ ব্যবহারের চাপও কমতে পারে।
ময়মনসিংহের অতিরিক্ত পুলিশ সুপার আব্দুল্লাহ আল মামুন জানান, জনবহুল এই শহরে শিক্ষা, চিকিৎসা ও প্রশাসনিক কাজে প্রতিদিন বিপুলসংখ্যক মানুষ আসেন। অটোরিকশা ও ইজিবাইক মানুষের অন্যতম প্রধান যাতায়াতের মাধ্যম হওয়ায় এসব যানবাহনের সংখ্যা বেশি। এর সঙ্গে সংকীর্ণ সড়ক যুক্ত হয়ে যানজট বাড়াচ্ছে। যানজট নিরসনে পুলিশসহ সংশ্লিষ্ট সংস্থাগুলো কাজ করছে এবং বিভিন্ন প্রস্তাব বাস্তবায়নের উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে।
অন্যদিকে ময়মনসিংহ সিটি করপোরেশনের প্রশাসক মো. রুকুনোজ্জামান রুকুন জানিয়েছেন, অবৈধ অটোরিকশা নিয়ন্ত্রণ ও যানজট নিরসনে নতুন সমন্বিত ব্যবস্থা নেওয়া হচ্ছে। সিটি করপোরেশনের পুরো ব্যবস্থাকে ডিজিটালাইজ করার পরিকল্পনা রয়েছে। প্রতিটি অটোরিকশার সামনে ও পেছনে ডিজিটাল প্লেট থাকবে এবং অ্যাপের মাধ্যমে সহজেই শনাক্ত করা যাবে কোনটি বৈধ আর কোনটি অবৈধ।
চালকদের ছবিসহ ড্রাইভিং লাইসেন্স দেওয়ার পাশাপাশি ১৮ বছরের কম বয়সীদের লাইসেন্স না দেওয়ার পরিকল্পনাও রয়েছে। লাইসেন্স ছাড়া কেউ অটোরিকশা চালালে ডিজিটাল ব্যবস্থার মাধ্যমে তা শনাক্ত করা যাবে।
যানজট নিয়ন্ত্রণে নির্দিষ্ট এলাকায় ‘রেস্ট্রিক্টেড জোন’ চালুর পরিকল্পনাও জানিয়েছে সিটি করপোরেশন। এতে প্রতিদিন সব অটোরিকশা নির্দিষ্ট এলাকায় প্রবেশ করতে পারবে না; পালাক্রমে প্রবেশের সুযোগ দেওয়া হবে।
তবে সংশ্লিষ্টদের মতে, শুধু অটোরিকশার সংখ্যা কমালেই সমস্যার পুরো সমাধান হবে না। অবৈধ স্ট্যান্ড উচ্ছেদ, সড়ক দখলমুক্ত করা, যত্রতত্র পার্কিং বন্ধ, নির্দিষ্ট রুট ও স্ট্যান্ড নির্ধারণ এবং ট্রাফিক আইন কার্যকর করা জরুরি।
অটোরিকশা বন্ধ নয়—নগরীর প্রয়োজন অনুযায়ী সংখ্যা নির্ধারণ করে বৈধ যানবাহনকে সুশৃঙ্খল ব্যবস্থাপনার আওতায় আনা, একই সঙ্গে সড়ক দখলমুক্ত করা ও হাসপাতাল এলাকায় বিশেষ ট্রাফিক ব্যবস্থাপনা নিশ্চিত করা গেলে যানজটের বড় একটি অংশ কমানো সম্ভব বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা।