১১ বছরেও শেষ হয়নি ময়মনসিংহ কারাগারের সম্প্রসারণ কাজ, অতিরিক্ত বন্দির চাপ
বৃহত্তর ময়মনসিংহ · 2026-09-30 07:36:49 · স্টাফ রিপোর্টার
ধারণক্ষমতা ৪২৩ জনের। অথচ ময়মনসিংহ কেন্দ্রীয় কারাগারে বন্দির সংখ্যা ২ হাজার ১৬৪। অর্থাৎ ধারণক্ষমতার পাঁচগুণেরও বেশি বন্দি নিয়ে চলছে কারাগারটির কার্যক্রম। অতিরিক্ত বন্দির চাপ সামলাতে হিমশিম খাচ্ছে কারা কর্তৃপক্ষ। পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে গত দুই মাসে প্রায় ১ হাজার ৮০০ বন্দিকে আশপাশের তিনটি জেলা কারাগারে স্থানান্তর করা হয়েছে। এরপরও কমেনি বন্দির চাপ।
এমন পরিস্থিতিতেও বন্দিদের আবাসন সংকট নিরসনে নেওয়া সম্প্রসারণ ও আধুনিকীকরণ প্রকল্পের কাজ চলছে ধীরগতিতে। ২০১৫ সালে অনুমোদন পাওয়া প্রকল্পটির কাজ শুরু হয় ২০১৭ সালে। প্রাথমিকভাবে ২০১৮ সালের জুনে কাজ শেষ হওয়ার কথা থাকলেও প্রায় ১১ বছরেও তা বাস্তবায়িত হয়নি। কয়েক দফায় বেড়েছে প্রকল্পের মেয়াদ ও ব্যয়। বর্তমানে প্রকল্পের কাজের অগ্রগতি নিয়েও রয়েছে দুই ধরনের হিসাব। গণপূর্ত অধিদপ্তর বলছে, কাজের অগ্রগতি ৭৫ শতাংশ। তবে কারা কর্তৃপক্ষের হিসাবে, দৃশ্যমান অগ্রগতি ৫০ থেকে ৬০ শতাংশের বেশি নয়।
একদিকে অতিরিক্ত বন্দির চাপ, অন্যদিকে কারাগারের ভেতরে চলমান নির্মাণকাজ। দুই সংকটের মধ্যে বন্দিদের ব্যবস্থাপনা ও কারাগারের স্বাভাবিক কার্যক্রম চালাতে বাড়তি চাপের মুখে পড়েছে কর্তৃপক্ষ। সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিরা বলছেন, প্রকল্পের কাজ দ্রুত শেষ না হলে বন্দিদের দুর্ভোগ কমানো কঠিন হবে।
ধারণক্ষমতার কয়েকগুণ বন্দি
কারা কর্তৃপক্ষের দেওয়া তথ্য অনুযায়ী, গতকাল মঙ্গলবার (২৯ সেপ্টেম্বর) বিকেল পর্যন্ত ময়মনসিংহ কেন্দ্রীয় কারাগারে বন্দির সংখ্যা ছিল ২ হাজার ১৬৪। অথচ কারাগারটির ধারণক্ষমতা মাত্র ৪২৩ জন। ফলে নির্ধারিত ধারণক্ষমতার তুলনায় পাঁচ গুণেরও বেশি বন্দিকে ব্যবস্থাপনার দায়িত্ব পালন করতে হচ্ছে কারা কর্তৃপক্ষকে।
কারাগারে থাকা বন্দিদের মধ্যে মাদক ও যৌতুক মামলার আসামির সংখ্যা বেশি। এ ছাড়া নারী নির্যাতনসহ বিভিন্ন মামলার আসামি এবং রাজনৈতিক মামলায় গ্রেপ্তার ব্যক্তিরাও রয়েছেন।
বন্দির চাপ সামাল দিতে গত দুই মাসে প্রায় ১ হাজার ৮০০ জনকে পাশের তিনটি জেলা কারাগারে পাঠানো হয়েছে। এত বিপুলসংখ্যক বন্দি স্থানান্তরের পরও ময়মনসিংহ কেন্দ্রীয় কারাগারে ধারণক্ষমতার তুলনায় কয়েকগুণ বেশি বন্দি রয়েছেন।
ময়মনসিংহ কেন্দ্রীয় কারাগারের জেলার মো. সোহরাব হোসেন বলেন, সম্প্রসারণ প্রকল্পের কাজ চলমান থাকায় বন্দিদের ব্যবস্থাপনায় নানা ধরনের সমস্যা হচ্ছে। প্রকল্পের একটি অংশের কাজ শেষ হওয়ায় নারী বন্দিদের সেখানে স্থানান্তর করা হয়েছে। পুরুষ বন্দিদের অংশের নির্মাণকাজের জন্য ওই জায়গা খালি রাখা হয়েছে।
প্রকল্পের কাজের অগ্রগতি সম্পর্কে কারা কর্তৃপক্ষের কাছে সুনির্দিষ্ট তথ্য নেই জানিয়ে তিনি বলেন, এ বিষয়ে প্রকল্প পরিচালক ও গণপূর্ত বিভাগের কর্মকর্তারা বিস্তারিত বলতে পারবেন। তবে সরেজমিনে দৃশ্যমান কাজের অগ্রগতি ৫০ থেকে ৬০ শতাংশের বেশি বলে মনে হয় না। কারাগারের বিভিন্ন স্থানে নির্মাণকাজ চলায় বন্দিদের ব্যবস্থাপনা ও স্বাভাবিক কার্যক্রম পরিচালনায় সমস্যা হচ্ছে। প্রকল্পের কাজ দ্রুত শেষ হলে বন্দি ধারণক্ষমতা বাড়বে।
প্রকল্পের ব্যয় বেড়ে প্রায় দ্বিগুণ
ময়মনসিংহ কেন্দ্রীয় কারাগারের ইতিহাস প্রায় ২৩৪ বছরের। ১৭৯২ সালে কারাগারটির যাত্রা শুরু হয়। পরে ১৯৯৭ সালে এটিকে কেন্দ্রীয় কারাগারে উন্নীত করা হয়। সময়ের সঙ্গে বন্দির সংখ্যা বাড়তে থাকায় কারাগারটির ধারণক্ষমতা বাড়ানোর উদ্যোগ নেয় সরকার।
এরই অংশ হিসেবে ২০১৫ সালে ‘ময়মনসিংহ কারাগার সম্প্রসারণ ও আধুনিকীকরণ’ প্রকল্প অনুমোদন করা হয়। প্রকল্পের মূল লক্ষ্য ছিল দুই হাজার বন্দি রাখার সক্ষমতা তৈরি এবং প্রয়োজনীয় অবকাঠামো নির্মাণ। শুরুতে প্রকল্পের ব্যয় ধরা হয়েছিল প্রায় ১২৭ কোটি ২৭ লাখ টাকা।
তবে অনুমোদনের পরও প্রকল্পের কাজ শুরু হতে সময় লাগে। ২০১৭ সালে নির্মাণকাজ শুরু হলেও ২০১৮ সালের জুনের মধ্যে তা শেষ করার পরিকল্পনা ছিল। নির্ধারিত সময়ে কাজ শেষ না হওয়ায় প্রথমে দুই বছর মেয়াদ বাড়ানো হয়। পরবর্তী সময়ে আরও মেয়াদ বাড়ানোর পাশাপাশি প্রকল্পের ব্যয়ও বৃদ্ধি পায়।
গণপূর্ত অধিদপ্তর সূত্রে জানা গেছে, প্রকল্পের শুরুতেই পরিকল্পনাগত বিভিন্ন সমস্যা দেখা দেয়। পর্যাপ্ত মাস্টারপ্ল্যান না থাকায় দুই হাজার বন্দির আবাসন, কর্মকর্তা-কর্মচারীদের বাসস্থান, গুদাম ও ওয়াচ টাওয়ারসহ বিভিন্ন স্থাপনার নকশা ও পরিকল্পনায় পরিবর্তন আনতে হয়। ভবনের আয়তন ও নকশা সংশোধনের প্রয়োজনও দেখা দেয়।
এর মধ্যে করোনাভাইরাসের সংক্রমণের কারণে নির্মাণকাজ ব্যাহত হয়। পরবর্তী সময়ে প্রকল্পের উন্নয়ন প্রকল্প প্রস্তাব (ডিপিপি) সংশোধনের উদ্যোগ নেওয়া হয়। ২০২৩ সালের ফেব্রুয়ারিতে প্রথমবারের মতো প্রকল্পটি সংশোধন করা হয়। এতে ব্যয় বেড়ে দাঁড়ায় প্রায় ২৪০ কোটি টাকা। একই সঙ্গে প্রকল্পের কাজের প্যাকেজ ১৩টি থেকে বাড়িয়ে ৩০টি করা হয়। এসব প্যাকেজের কাজ বিভিন্ন ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠান বাস্তবায়ন করছে।
অগ্রগতি নিয়ে দুই ধরনের হিসাব
প্রকল্পের কাজের অগ্রগতি নিয়ে গণপূর্ত অধিদপ্তর ও কারা কর্তৃপক্ষের হিসাবের মধ্যে পার্থক্য রয়েছে। গণপূর্ত অধিদপ্তরের হিসাবে, প্রকল্পের সামগ্রিক অগ্রগতি প্রায় ৭৫ শতাংশ। অন্যদিকে কারা কর্তৃপক্ষের মতে, সরেজমিনে দৃশ্যমান অগ্রগতি ৫০ থেকে ৬০ শতাংশের বেশি নয়।
প্রকল্পটির তদারকির দায়িত্বে থাকা গণপূর্ত অধিদপ্তরের উপসহকারী প্রকৌশলী মো. আজহার আলী জানান, প্রথম সংশোধিত ডিপিপি অনুযায়ী প্রকল্পের বর্তমান মেয়াদ ২০২৭ সালের ২৭ জুন পর্যন্ত। এ সময়ের মধ্যে প্রকল্পের বাকি কাজ শেষ করার আশা করছেন তারা।
আজহার আলী বলেন, সামগ্রিকভাবে প্রকল্পের প্রায় ৭৫ শতাংশ কাজ শেষ হয়েছে। আমরা আশা করছি, ওই সময়ের মধ্যে ডিপিপিতে থাকা কাজগুলো শেষ করতে পারব।
কারাগার ঘুরে দেখা গেছে, সম্প্রসারণ প্রকল্পের আওতায় ছোট-বড় প্রায় ৪০টি স্থাপনা নির্মাণ করা হচ্ছে। এসব স্থাপনার মধ্যে একতলা থেকে ছয়তলা পর্যন্ত বিভিন্ন উচ্চতার ভবন রয়েছে। পাশাপাশি ফাঁসির মঞ্চ ও ডে-টাইম ল্যাট্রিনের মতো স্থাপনাও নির্মাণ করা হচ্ছে।
প্রকল্পের আওতায় নারী বন্দিদের জন্য নির্ধারিত অংশের নির্মাণকাজ শেষ হয়েছে। সম্প্রতি সেখানে পুরুষ বন্দিদের স্থানান্তর করা হয়েছে। অন্যদিকে পুরুষ বন্দিদের আগের অংশের ভবনগুলো ভেঙে নতুন স্থাপনা নির্মাণের প্রস্তুতি চলছে।
তবে এখনো বেশ কিছু গুরুত্বপূর্ণ স্থাপনার কাজ বাকি রয়েছে। এর মধ্যে রয়েছে কনডেমড সেল, সিকিউরিটি সেল, রান্নাঘর, আটা কল, জেল স্কুল ও লাইব্রেরি। এসব ভবনের বেশির ভাগই দোতলা।
আজহার আলী বলেন, নতুন করে কোনো কাজ যুক্ত না হলে আগামী জুনের মধ্যে এগুলো শেষ হবে বলে আমরা আশা করছি। আরডিপিপি সংশোধন না হওয়া এবং করোনার কারণে কাজ ব্যাহত হয়েছে। শুরুতে মাস্টারপ্ল্যানসহ কিছু সংকটও ছিল। এসব কারণে প্রকল্পের মেয়াদ ও ব্যয় বেড়েছে। কাজগুলো সময়মতো শেষ করা গেলে এতদিনে প্রকল্পটি শেষ হয়ে যেত।
তিনি আরও বলেন, পুরোনো স্থাপনাগুলো দ্রুত অপসারণের জন্য সংশ্লিষ্ট ঠিকাদারকে চাপ দেওয়া হচ্ছে। ভবনগুলো দ্রুত ভেঙে ফেলা সম্ভব হলে সেখানে নতুন স্থাপনা নির্মাণের কাজও এগিয়ে নেওয়া যাবে।
নির্মাণকাজের মধ্যেই চলছে কারাগারের কার্যক্রম
কারাগারের ভেতরে বিভিন্ন স্থানে একসঙ্গে নির্মাণকাজ চলায় স্বাভাবিক কার্যক্রম পরিচালনায় বাড়তি চাপ তৈরি হয়েছে। সরেজমিনে দেখা গেছে, প্রতিদিন নতুন বন্দি কারাগারে প্রবেশ করছেন। অন্যদিকে বন্দিদের সঙ্গে দেখা করতে তাদের স্বজনদেরও কারাগারের সামনে ভিড় করতে দেখা যায়।
কারা কর্তৃপক্ষের ভাষ্য, একদিকে বন্দির সংখ্যা ধারণক্ষমতার তুলনায় অনেক বেশি, অন্যদিকে নির্মাণকাজের কারণে কারাগারের বিভিন্ন অংশ ব্যবহারের ক্ষেত্রে সীমাবদ্ধতা রয়েছে। নারী বন্দিদের নতুন অংশে স্থানান্তর করা সম্ভব হলেও পুরুষ বন্দিদের জন্য নির্ধারিত পুরোনো অংশের ভবন ভেঙে নতুন স্থাপনা নির্মাণের কাজ শেষ না হওয়া পর্যন্ত ব্যবস্থাপনার সংকট পুরোপুরি কাটবে না।
বন্দিদের মানবাধিকার নিয়ে উদ্বেগ
কারাগারে ধারণক্ষমতার তুলনায় প্রায় পাঁচগুণ বন্দি রাখার বিষয়টিকে অমানবিক বলে মন্তব্য করেছেন সুশাসনের জন্য নাগরিক (সুজন) ময়মনসিংহ মহানগর শাখার সম্পাদক আলী ইউসুফ। তার মতে, অতিরিক্ত বন্দীর কারণে কারাগারে তাঁদের স্বাভাবিক জীবনযাপন কঠিন হয়ে পড়েছে। একই সঙ্গে মানবাধিকার ক্ষুণ্ন হওয়ার আশঙ্কাও তৈরি হয়েছে।
আলী ইউসুফ বলেন, কারাগারে ধারণক্ষমতার প্রায় পাঁচ গুণ বন্দি রয়েছেন। এভাবে একটি কারাগারে ধারণক্ষমতার প্রায় পাঁচগুণ মানুষকে রাখা অমানবিক। এতে বন্দিদের জীবনযাপন কষ্টকর হয়ে উঠছে এবং তাদের মানবাধিকারও ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে।
তিনি বলেন, দুই হাজার বন্দির ধারণক্ষমতা তৈরির জন্য সরকার প্রকল্প গ্রহণ করলেও সরকারি সংস্থার দীর্ঘসূত্রতার কারণে বছরের পর বছর কাজ শেষ হয়নি। এতে একদিকে সরকারের প্রকল্প ব্যয় বেড়েছে, অন্যদিকে বন্দিদের দুর্ভোগও দীর্ঘায়িত হয়েছে।
আলী ইউসুফ বলেন, গাদাগাদি করে থাকার কারণে বন্দিদের মধ্যে বিভিন্ন রোগব্যাধি ছড়িয়ে পড়ার ঝুঁকি রয়েছে। বন্দিদের জন্য মানবিক পরিবেশ নিশ্চিত করতে তাই প্রকল্পের কাজ দ্রুত শেষ করা জরুরি।