কৃষি ব্যাংক নান্দাইল শাখায় ১১০ কোটি ঋণ, ১০০ কোটি টাকাই অনাদায়ী
বৃহত্তর ময়মনসিংহ · 2026-09-27 05:26:02 · ফরিদ মিয়া
ময়মনসিংহের নান্দাইল কৃষি ব্যাংক শাখায় ঋণ বিতরণ ও আদায় নিয়ে চরম অচলাবস্থা সৃষ্টি হয়েছে। এই শাখা থেকে উপজেলার ১৩ হাজার ২০০ জন গ্রাহককে প্রায় ১১০ কোটি টাকা ঋণ দেওয়া হলেও এর মধ্যে প্রায় ১০০ কোটি টাকাই এখন বকেয়া (খেলাপি)। চাঞ্চল্যকর এই তথ্য প্রকাশ্যে আসার পর স্থানীয়দের মধ্যে বিষয়টি ব্যাপক আলোচনার জন্ম দিয়েছে। ঋণ খেলাপি হওয়ায় ব্যাংক কর্তৃপক্ষ গত কয়েক বছর ধরে নতুন ঋণ দেওয়াও প্রায় বন্ধ রেখেছে। এতে হতাশা দেখা দিয়েছে এলাকার প্রকৃত কৃষকদের মধ্যে। তাদের অভিযোগ, জমির সঠিক ও বৈধ কাগজপত্র দেখানোর পরও নানা অজুহাতে তাদের ঋণ দেওয়া হচ্ছে না।অভিযোগ উঠেছে, শর্ত পূরণ হয়নি এমন লোকদেরও ঋণ দিয়েছেন ব্যাংকের কর্মকর্তারা। ফলে বিপুল পরিমাণ ঋণ খেলাপি হয়েছে। এতে ঋণ থেকে বঞ্চিত হচ্ছেন প্রকৃত কৃষক। ঋণের জন্য আসা নান্দাইল উপজেলার গাঙাইল ইউনিয়নের পালাহার গ্রামের কৃষক আক্কাস আলী ক্ষোভ প্রকাশ করে জানান, তিনি প্রায় দেড় বছর আগে তার আগের বকেয়া ৯০ হাজার টাকা সুদে-আসলে পরিশোধ করেছেন।
ওই সময় ব্যাংক থেকে তাকে আশ্বাস দেওয়া হয়েছিল দ্রুত নতুন ঋণ দেওয়ার। কিন্তু এরপর এখন পর্যন্ত নতুন ঋণ পাননি তিনি। একই আক্ষেপের কথা জানিয়েছেন কান্দিউড়া গ্রামের আল-আমীন ও শ্রীরামপুর গ্রামের দেলোয়ার হোসেন। তারা জানান, প্রায় এক বছর ধরে জমির সঠিক ও বৈধ কাগজপত্র নিয়ে ব্যাংকে এসে ঘোরাঘুরি করছেন তারা। কিন্তু ব্যাংক নানা অজুহাতে তাদের ফিরিয়ে দিচ্ছে।
চণ্ডীপাশা গ্রামের ফরিদ আহম্মেদ জানান, প্রায় এক বছর আগে কাগজপত্র দেখে ব্যাংক থেকে বলা হয়েছিল গোয়ালঘর রাখার জন্য। সেই কথার ওপর ভিত্তি করে সব ঠিকঠাক রাখলেও তাকে ঋণ দেওয়া হচ্ছে না। এতে তার কৃষিকাজ ব্যাহত হচ্ছে। বৃহস্পতিবার সকালে সরেজমিন নান্দাইল কৃষি ব্যাংক শাখায় গিয়ে দেখা যায়, অনেক কৃষক ঋণের জন্য কর্মকর্তাদের সঙ্গে কথা বলতে এসেছেন। তবে তাদের ফিরিয়ে দেওয়া হচ্ছে। ব্যাংক থেকে জানিয়ে দেওয়া হচ্ছে আপাতত সব ধরনের ঋণ কার্যক্রম বন্ধ। ব্যাংক সূত্রে জানা গেছে, জনবল সংকটে ভুগছে শাখাটি। ১৬ জন কর্মকর্তা থাকার কথা থাকলেও বর্তমানে সেখানে কর্মরত রয়েছেন মাত্র আটজন। এই লোকবল নিয়ে মাঠপর্যায়ে বকেয়া পরিশোধের তাগাদা দেওয়া বা তদারকি করা প্রায় অসম্ভব হয়ে পড়েছে।
এদিকে, বকেয়া টাকা আদায়ে ব্যাংক কর্তৃপক্ষ কঠোর আইনি পদক্ষেপ নিয়েছে বলে জানা গেছে। এরইমধ্যে বকেয়া পরিশোধ না করায় প্রায় এক হাজার কৃষককে লিগ্যাল নোটিশ এবং ৫০০ জনকে উকিল নোটিশ পাঠানো হয়েছে। এছাড়া ঋণখেলাপিদের বিরুদ্ধে ৪৬টি চেক জালিয়াতির মামলা এবং ৬৫টি সনদ মামলা দায়ের করা হয়েছে। নির্দিষ্ট সময়ের মধ্যে টাকা ফেরত না দিলে বাকিদের বিরুদ্ধেও পর্যায়ক্রমে মামলা করা হবে বলে ব্যাংক সূত্রে জানা গেছে।
এ ব্যাপারে নান্দাইল শাখার নবনিযুক্ত ব্যবস্থাপক আলমগীর হোসাইন জানান, তিনি মাত্র এক মাস আগে এই শাখায় যোগ দিয়েছেন। আগের ব্যবস্থাপকের সময়ে ঋণ আদায়ের জন্য লিগ্যাল নোটিশ বা মামলা-মোকদ্দমা করা হয়ে থাকতে পারে। তাই পেছনের বিষয়গুলো সম্পর্কে তিনি এখনো পুরোপুরি অবগত নন। তবে ঋণ কার্যক্রম সম্পূর্ণ বন্ধ থাকার বিষয়টি অস্বীকার করেছেন ময়মনসিংহ কৃষি ব্যাংকের উপ-মহাব্যবস্থাপক কামরুল ইসলাম। তিনি বলেন, ‘ঋণ কার্যক্রম বন্ধ- এ কথা বলা যাবে না। যদি কেউ সঠিক ও বৈধ কাগজপত্র নিয়ে আসেন, তবে তা যথাযথভাবে যাচাই-বাছাই করে ঋণ দেওয়া যেতে পারে।
উপ-মহাব্যবস্থাপক আরো বলেন, ‘অনেকে এমন সব কাজের জন্য ঋণ নিতে আসেন, যা শুধু কৃষি ব্যাংকের পক্ষে দেওয়া সম্ভব নয়, সে জন্য অন্যান্য ব্যাংকও রয়েছে। তবে সরকারের নির্দেশনা অনুযায়ী, সহজভাবে বলার পরও যদি কেউ বকেয়া ঋণ পরিশোধ না করেন, তবে আইন অনুযায়ী মামলা করতেই হবে।