“অন্ধকার ঘরের আলো” রহমাতুল্লাহ: ১১ বছরের শিশুর অসাধারণ সংগ্রাম!
বাগেরহাট সদর উপজেলার মুক্ষাইট গ্রামের ছোট্ট এক ভাঙাচোরা ঘরে বসবাস করে ১১ বছরের শিশু রহমতুল্লাহ। বয়স মাত্র ক্লাস ফাইভ। অন্য বাচ্চারা যখন খেলাধুলায় ব্যস্ত, তখন তার দিনের শুরুই হয় সংগ্রাম আর দায়িত্বের বোঝা কাঁধে নিয়ে।
রহমাতুল্লাহর বাবা মহিদুল ইসলাম ২৭ বছর ধরে পঙ্গু। ছেলের জন্মের আগেই নারকেল গাছ থেকে পড়ে তার দুই পা অচল হয়ে যায়। আর তার মা পারভিন বেগম ২০০৭ সালের ভয়াবহ সিডর সেই রাতেই চোখের আলো হারান ,২০ বছর ধরে তিনি সম্পূর্ণ অন্ধ।
তিন সদস্যের এই পরিবার এখন আশ্রয় নিয়েছে এক বড় ভাইয়ের দেওয়া ছোট্ট, টিনঝাপসা ভাঙা ঘরে। ঘরে নেই কোনো জমি, নেই কোনো নির্দিষ্ট আয়। আগে তাদের একটি ছোট দোকান ছিল, কিন্তু টাকার অভাবে, মালামাল তুলতে না পারায় সেই দোকানটিও অনেকদিন আগে বন্ধ হয়ে গেছে। ফলে পরিবারটির একমাত্র ভরসা আজ এই ১১ বছরের শিশু রহমাতুল্লাহর।
শিশু বয়স ভুলে বড়দের সব দায়িত্ব
ভোরবেলা বই হাতে নেওয়ার আগেই রহমতুল্লাহকে সামলাতে হয় বাবা-মাকে। বাবাকে ধরে ধরে রোদে বসানো, পানি গরম করে গোসল করানো, গা মুছিয়ে দেওয়া—সবই তার ছোট্ট হাতের কাজ।
মায়ের সেবা-যত্নও তাকেই করতে হয়।
ঘরের সব কাজ থালা-বাসন ধোয়া থেকে শুরু করে ডাল-ভাত রান্না সবই সামলায় সে। তারপর ছুটে যায় স্কুলে। স্কুল থেকে ফিরে আবার মানুষের বাড়ি বাড়ি গিয়ে চাউল চেয়ে আনে, যাতে বাবা-মায়ের একবেলা খাবার জোটে।
এক শিশুর কাছে এর চেয়ে কঠিন দায়িত্ব আর কী-ই বা হতে পারে? তবুও রহমাতুল্লাহ হাসে। দারিদ্র্য, অন্ধত্ব আর পঙ্গুত্বের অন্ধকার ভেদ করে সে-ই হয়ে উঠেছে পরিবারের একমাত্র আলো। মুক্ষাইট গ্রামের মানুষ তাই তাকে ডাকে অন্ধকার ঘরের আলো রহমতুল্লাহ।
স্বপ্ন এখনও বেঁচে আছে চরম অনিশ্চয়তার মাঝেও রহমাতুল্লাহর স্বপ্ন থেমে নেই। সে চায় বড় হয়ে চাকরি করতে, বাবা-মায়ের মুখে খাবার তুলে দিতে। মায়ের চোখে আলো ফিরিয়ে দিতে না পারলেও অন্তত তাদের জীবনে সুখের আলো জ্বালাতে চায় সে।
গোটাপাড়া সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের ভারপ্রাপ্ত প্রধান শিক্ষক বেবী রানী সেন বলেন,
এ বছর আমাদের স্কুলে রহমতুল্লাহ নামে একটি শিশু ভর্তি হয়েছে। তার বাবা-মা দুজনই দীর্ঘদিন ধরে প্রতিবন্ধী। ফলে তাকে কেউ ঠিকভাবে দেখাশোনা করতে পারে না। ছোট ছেলে হওয়ায় নিজের পড়াশোনা বা দৈনন্দিন বিষয়গুলো বুঝে সামলানো তার জন্য খুব কঠিন। এজন্য সে নিয়মিত স্কুলে আসতে পারে না, পড়ালেখায় মনোযোগও কম।
তিনি আরও বলেন, ছেলেটির অবস্থা বিবেচনা করে আমরা শিক্ষকরা সিদ্ধান্ত নিয়েছি স্কুল ড্রেসসহ প্রয়োজনীয় সব শিক্ষা উপকরণ আমরা দেবো। তবে শুধু স্কুল নয়, সমাজের অন্যান্য মানুষেরও উচিত এই অসহায় পরিবারের পাশে দাঁড়ানো। সঠিক সহায়তা পেলে রহমাতুল্লাহ আবার স্বাভাবিকভাবে পড়াশোনায় ফিরতে পারবে।
এই শিশুর গল্প শুধু দারিদ্র্যের নয় এটা এক ছোট্ট হৃদয়ের বিশাল সাহসের গল্প।