নতুন বছরেও বিশুদ্ধ বায়ুর চ্যালেঞ্জের মুখে রাজধানীবাসী
বৃহস্পতিবার (১ জানুয়ারি) সকালে ঢাকাবাসী খ্রিষ্টীয় বছর ২০২৬–এর প্রথম দিন পেলেন অস্বাস্থ্যকর বায়ু। বায়ুর মান
২০০-এর বেশি হলে তাকে খুব অস্বাস্থ্যকর বলা হয়। আর ৩০০-এর বেশি হলে তা দুর্যোগপূর্ণ। ডিসেম্বর মাসের শুরু থেকে প্রায় প্রতিদিন ঢাকার বায়ুর মান খুব অস্বাস্থ্যকর। ধারাবাহিকভাবে ঢাকা বিশ্বের দূষিত বায়ুর শহরের তালিকায় শীর্ষে থাকছে। ঢাকার
বায়ুমান খুব অস্বাস্থ্যকর দেখা যাচ্ছে প্রায় প্রতিদিনই। বিশ্বের ১১৩টি নগরের মধ্যে
ঢাকার অবস্থান দশম।
বায়ুদূষণের এ পরিস্থিতি তুলে ধরেছে সুইজারল্যান্ডভিত্তিক প্রতিষ্ঠান আইকিউএয়ার। প্রতিষ্ঠানটি বায়ুদূষণের অবস্থা নিয়মিত তুলে ধরে। বাতাসের মান নিয়ে তৈরি করা এই লাইভ বা তাৎক্ষণিক সূচক একটি নির্দিষ্ট শহরের বাতাস কতটা নির্মল বা দূষিত, সে সম্পর্কে মানুষকে তথ্য দেয় ও সতর্ক করে।
দেশে বায়ুদূষণ মোকাবিলায় বিভিন্ন সময় প্রকল্প নেওয়া হয়েছে। এখনও নানা উদ্যোগ-কথাবার্তা শোনা যায়। কিন্তু বায়ুদূষণ পরিস্থিতি দিন দিন খারাপ হচ্ছে। এটি শুধু যে ঢাকায়, তা নয়; সারা দেশে। কোনো কোনো দিন ঢাকাকে ছাপিয়ে যাচ্ছে দেশের অন্যান্য শহরের বায়ুদূষণ।
এ বিষয়ে পরিবেশ অধিদফতর বলছে, তারা বায়ুদূষণ রোধে নানা পদক্ষেপ নিচ্ছে। ইতোমধ্যে ঢাকার আশপাশের অবৈধ অনেক ইটভাটা বন্ধ করা হয়েছে। রাজধানীতে ফিটনেসবিহীন গাড়ির বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়া হচ্ছে। পরিবেশ অধিদফতরের পরিচালককে (বায়ুমান ব্যবস্থাপনা) প্রধান করে ঢাকার বায়ুদূষণ রোধে সংশ্লিষ্ট সব মন্ত্রণালয় মিলে একটি টাস্কফোর্স গঠন করা হয়েছে। তাদের নির্দেশনা অনুযায়ী আগামী দিনের কর্মপরিকল্পনা গ্রহণ করা হয়েছে। বায়ু দূষণের জন্য যেসব উৎস দায়ী সেগুলোর বিরুদ্ধে এবার সমন্বিতভাবে ব্যবস্থা নেওয়া হবে।
ঢাকার এ বায়ুদূষণের
প্রভাব পড়ছে সরাসরি স্বাস্থ্যের ওপর। বিশেষজ্ঞরা বলছেন, টানা দুই মাসেরও বেশি সময়
‘খুবই অস্বাস্থ্যকর’ বাতাসে নিঃশ্বাস নেওয়ার ফলে নানা রোগে আক্রান্ত হচ্ছে ঢাকাবাসী। বাড়ছে শ্বাসতন্ত্রের রোগে আক্রান্তের সংখ্যা। বিশেষ করে শিশু ও প্রবীণরা ভুগছেন বেশি। বিশেষজ্ঞরা বলছেন, অস্বাস্থ্যকর বায়ুর কারণে এলার্জি, চর্মরোগ, সর্দি-কাশি থেকে শুরু
করে হাঁপানি, শ্বাসকষ্ট ও ফুসফুসের ক্যান্সারের মতো জটিল রোগে আক্রান্ত হচ্ছে মানুষ। তাদের মতে, দূষণের ফলে দীর্ঘমেয়াদি রোগের আশঙ্কা থাকে। প্রথম দিকে সর্দি-কাশি, নিউমোনিয়া
হলেও একটা সময় রোগীদের ফুসফুস আক্রান্ত হয়ে ক্ষতিগ্রস্ত হয় লিভার ও কিডনি। এ ছাড়া নারীদের
প্রজনন স্বাস্থ্য মারাত্মক হুমকির মধ্যে পড়েছে।
উল্লেখ্য, বায়ুমানের ক্ষেত্রে এয়ার কোয়ালিটি ইনডেস্ক তথা একিউআইয়ের মান ৫০ পর্যন্ত হলে তাকে স্বাস্থ্যকর বায়ু বলা হয়৷ ৫১ থেকে ১০০ পর্যন্ত থাকলে তা গ্রহণযোগ্য পর্যায়ের ধরা হয় যদিও ব্যক্তি বিশেষে তা ক্ষতির কারণ হতে পারে৷ ১০১ থেকে ১৫০ পর্যন্ত মাত্রাকে বলা হয় অরেঞ্জ লেভেল যা সাধারণ মানুষের জন্য খুব একটা ক্ষতিকর না হলেও কারো কারো স্বাস্থ্যের ক্ষতি হতে পারে৷ ১৫০ থেকে ২০০ পর্যন্ত থাকলে তা অস্বাস্থ্যকর হিসেবে চিহ্নিত করা হয়৷ আর এই মান ২০০ থেকে ৩০০ পর্যন্ত চরম অস্বাস্থ্যকর৷ আর একিউআই ৩০০-এর বেশি হলে সেটিকে বিপর্যয়কর হিসেবে চিহ্নিত করা হয়৷
বৃহস্পতিবার সকালে ঢাকার পাঁচ স্থানে বায়ুর মান খুব অস্বাস্থ্যকর। স্থানগুলো হলো- বেচারাম দেউড়ি (২৭০), দক্ষিণ পল্লবী (২৪৪), গোড়ান (২৩৩), গ্রেস ইন্টারন্যাশনাল স্কুল (২২২) ও শান্তা ফোরাম (২১৭)।
বায়ুদূষণে বিশ্বের
নগরীগুলোর মধ্যে শীর্ষে আছে মিসরের রাজধানী কায়রো। বায়ুর মান ৩৭০।আর ৩১৩ স্কোর নিয়ে
দ্বিতীয় স্থানে আছে পাকিস্তানের লাহোর। এদিন দশম স্থানে থাকা ঢাকার বায়ুর মান ১৭৭। বায়ুর
এই মানকে ‘অস্বাস্থ্যকর’ হিসেবে বিবেচনা করা হয়।
বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা (ডব্লিউএইচও) অনুসারে, বায়ু দূষণের কারণে স্ট্রোক, হৃদরোগ, ক্রনিক অবস্ট্রাকটিভ পালমোনারি ডিজিজ, ফুসফুসের ক্যান্সার এবং তীব্র শ্বাসযন্ত্রের সংক্রমণে মৃত্যুহার বৃদ্ধি পেয়েছে। বিশ্বব্যাপী প্রতি বছর অন্তত ৭০ লাখ মানুষ মারা যায়।বিশেষজ্ঞরা বলছেন, ঢাকার বায়ুদূষণ নাগরিকদের জন্যে স্বাস্থ্যঝুঁকি বাড়াচ্ছে। বাইরে বের হলে মাস্ক পরার পরামর্শ দেওয়া হয়েছে। এছাড়া শিশু, প্রবীণ ও অসুস্থ ব্যক্তিদের বাড়ির বাইরে কম বের হতে বলা হয়েছে। শহরে সবুজায়ন ও গাছপালা বৃদ্ধির মাধ্যমে বায়ুদূষণ নিয়ন্ত্রণে কার্যকর পদক্ষেপ নেওয়া প্রয়োজন বলে মনে করছেন বিশেষজ্ঞরা।