রংপুরে জমে উঠেছে খেজুরের গুডের ব্যবসা
উত্তরাঞ্চলের শৈত্যপ্রবাহ ও ঘন কুয়াশার মধ্যেও চলতি শীত মৌসুমে খেজুর গাছ থেকে রসের উৎপাদন প্রত্যাশার চেয়ে বেশি। এ কারণে রংপুর অঞ্চলে জমে উঠেছে শীতকালীন খেজুরের গুড়ের ব্যবসা।
রংপুর, লালমনিরহাট, নীলফামারী, গাইবান্ধা ও কুড়িগ্রাম জেলার বিভিন্ন এলাকায় গত এক সপ্তাহ ধরে রস সংগ্রহ করা শুরু করেছেন গাছিরা। রস বড় কড়াইয়ে জ্বাল দিয়ে গুড় তৈরি করা হচ্ছে। মানুষের ভিড়ে গাছিদের উঠোন ও গুড় তৈরির স্থানগুলো এখন সরগরম। গাছিদের দাবি, কোনো ধরনের রাসায়নিক উপাদান তারা গুড় তৈরিতে ব্যবহার করছেন না।
বর্তমানে বাজারে সাধারণ খেজুর গুড় প্রতি কেজি ২৫০–৩০০ টাকায় পাওয়া গেলেও গাছিদের কাছ থেকে রাসায়নিকমুক্ত গুড় কিনতে হচ্ছে কেজিপ্রতি ৬০০ টাকা। গত বছর এর দাম ছিল ৪০০–৪৫০ টাকা। ক্রেতারা জানান, বাজারে বিক্রি হওয়া গুড়ে সুগন্ধ কম এবং দীর্ঘদিন সংরক্ষণ করা সম্ভব নয়। গাছিদের রাসায়নিকমুক্ত গুড়ের ঘ্রাণ স্বাভাবিক ও তীব্র এবং এক বছরের বেশি সময় রেখে দিলেও নষ্ট হয় না।
লালমনিরহাট সদর উপজেলার ভাটিবাড়ী গ্রামের গাছি বদিয়ার রহমান জানিয়েছেন, তিনি চুক্তিতে ৪০০টি খেজুর গাছ নিয়েছেন। পাঁচজন মিলে প্রতিদিন রস সংগ্রহ করে গুড় তৈরি ও বিক্রি করছেন। শীত ও কুয়াশার কারণে প্রতিটি গাছ থেকে দিনে ৩–৪ কেজি রস পাওয়া যায়। এক কেজি গুড় তৈরি করতে ১১–১২ কেজি রস প্রয়োজন, যা বড় কড়াইয়ে ৬–৭ ঘণ্টা জ্বাল দিয়ে বানানো হয়।
ফুলবাড়ী উপজেলার নাওডাঙ্গা গ্রামের গাছি সুলতান হোসেন বলেন, ‘আমরা শুধু রস কড়াইয়ে ঢেলে আগুনে জ্বালিয়ে গুড় বানাই। কোনো রাসায়নিক ব্যবহার করি না। স্থানীয় লোকজনের সামনে গুড় তৈরি করি।’
তিনি উল্লেখ করেন, মৌসুমে প্রতিদিন গড়ে ২ হাজার ৫০০ কেজি রস সংগ্রহ করা হচ্ছে ও প্রায় ২০০ কেজি গুড় তৈরি হচ্ছে, যা খুব অল্প সময়েই বিক্রি হয়ে যাচ্ছে।
স্থানীয় ব্যবসায়ী ও ক্রেতারা জানান, গাছির গুড়ের সুগন্ধ অসাধারণ, দাম বেশি হলেও স্বাস্থ্যসম্মত ও শীতকালে পিঠা-পায়েস বানাতে এর জুড়ি নেই।
কৃষি সম্প্রসারণ অধিদফতরের তথ্য অনুযায়ী, রংপুর বিভাগের পাঁচ জেলা—রংপুর, লালমনিরহাট, কুড়িগ্রাম, গাইবান্ধা ও নীলফামারীতে প্রায় ৫৫ হাজার খেজুর গাছ রয়েছে। নভেম্বরের মাঝামাঝি থেকে মার্চ পর্যন্ত গাছিরা এসব গাছ থেকে রস সংগ্রহ করেন। উৎপাদিত রসের ২০ শতাংশ কাঁচা অবস্থায় বিক্রি হলেও বাকি ৮০ শতাংশ গুড় তৈরিতে ব্যবহার হয়।
রংপুর আঞ্চলিক কৃষি সম্প্রসারণ অধিদফতরের অতিরিক্ত পরিচালক সিরাজুল ইসলাম বলেন, ‘রাসায়নিকমুক্ত খেজুর গুড়ের বড় বাজার তৈরি হয়েছে। গাছিরা চুক্তিতে গাছ নিয়ে গুড় তৈরি করছেন, এতে স্থানীয় কৃষকরা লাভবান হচ্ছেন এবং ভোক্তারা পাচ্ছেন ভেজালমুক্ত, স্বাস্থ্যসম্মত গুড়। আমি নিজেও গাছির কাছ থেকে গুড় কিনি।’