নিহালের হাতবিহীন বাহু দুটিই পরিবারের ভরসা
মাথার ওপর থেকে বাবার
হাত উঠে গেছে শৈশবেই। নিজের হাতবিহীন বাহু দুটিই এখন পরিবারের ভরসা। কৈশোরের দুরন্তপনা
আহত হয় আর্থিক টানাপোড়েনের যাঁতাকলে। ঘাড়ে চেপে বসে সংসারের জোয়াল। পাশাপাশি চলছিল
পড়ালেখাও। কলেজের গণ্ডি পেরোনোর আগেই সামনে আসে আরও বড় সংকট। স্বপ্ন হয়ে যায় দুঃস্বপ্ন।
দুর্ঘটনায় হাত দুটি কাটা পড়ে মেহেরাবের। তবু মনোবল হারাননি, নিজের শ্রমেই আত্মমর্যাদার
সঙ্গে বাঁচার স্বপ্ন দেখেন তিনি।
জামালপুরের মাদারগঞ্জ উপজেলার মোসলেমাবাদ গ্রামের যুবক মোহাম্মদ মেহেরাব হোসাইন নিহাল। শারীরিক প্রতিবন্ধকতাকে হার মানিয়ে আজ তিনিই পরিবারের ভরসা।
অদম্য ইচ্ছাশক্তি, দৃঢ়
মনোবল আর কঠোর পরিশ্রমকে সঙ্গী করে সংগ্রামের এক অনন্য গল্প লিখে চলেছেন নিহাল।
২০০২ সালে প্রয়াত সুলতান আহম্মেদ ও খাদিজাতুন কুবরা দম্পতির ঘরে জন্ম নিহালের। তিনি বাবা-মায়ের একমাত্র সন্তান। শৈশবেই বাবাকে হারিয়ে সংগ্রামের মধ্যেই বেড়ে ওঠা। দারিদ্র্য ছিল নিত্যসঙ্গী, তবুও পড়াশোনা চালিয়ে যাচ্ছিলেন স্বপ্ন নিয়ে।
২০২২ সালে তার জীবনে নেমে আসে অন্ধকার। এইচএসসি প্রথম বর্ষ শেষে দ্বিতীয় বর্ষের প্রস্তুতি চলছিল। এ সময় এক বাড়িতে বৈদ্যুতিক ওয়্যারিংয়ের কাজ করতে গিয়ে দুর্ঘটনা। চিকিৎসকদের সিদ্ধান্তে কেটে ফেলতে হয় তার দুটি হাত।
হাত হারানোর পর প্রথম দিকে চরম হতাশায় ভেঙে পড়েছিলেন তিনি। তবে সেই অন্ধকারেই আলো খুঁজে নেন নিহাল। এক বছর পর নতুন করে সাহস সঞ্চয় করে শুরু করেন নতুন যুদ্ধ।
নিহাল বলেন, ‘অনেক ভেবে সিদ্ধান্ত নিই, বসে থাকলে জীবন চলবে না। কিছু একটা করতেই হবে। প্রথমে ছোট একটি দোকান দিয়েছিলাম, লোকসান হওয়ায় বন্ধ করতে হয়। কিন্তু হাল ছাড়িনি। আবার নতুন করে দোকান খুলেছি, সঙ্গে চা বিক্রি শুরু করেছি।’
দুটি হাত ছাড়াই নিজের
পায়ে দাঁড়ানোর এই লড়াই সহজ ছিল না। দোকানে পানি আনা, চা বানানো, ক্রেতাদের সামলানো—সবকিছুই
করতে হয় অসীম কষ্ট নিয়ে। তবুও আত্মমর্যাদা হারাতে চান না তিনি।
নিহাল আরও বলেন, ‘অনেক মানুষ সামান্য সমস্যায় ভেঙে পড়ে ভিক্ষাবৃত্তিতে জড়িয়ে যায়। আমি দেখেছি, সাহায্য চাইলে কতভাবে ছোট হতে হয়। তাই ছোটবেলা থেকেই প্রতিজ্ঞা করেছি। কারো কাছে হাত পেতে বাঁচব না। সরকার সহযোগিতা করলে নেব, কিন্তু জীবন চালাতে চাই নিজের পরিশ্রমে। আল্লাহ আমাকে যেভাবে রেখেছেন আমি তাতেই সন্তুষ্ট।’
ছেলের এই সংগ্রামের
নীরব সাক্ষী তার মা খাদিজাতুন কুবরা। একমাত্র ছেলেকে নিয়ে বাবার বাড়িতে ফিরে এসে জীবন
চালাচ্ছেন কোনো রকমে। দুর্ঘটনার পর জীবন আরও কঠিন হলেও ছেলের অদম্য মনোবলই তাকে শক্ত
করে বাঁচিয়ে রেখেছে।
খাদিজাতুন কুবরা বলেন, ‘আমার ছেলে খুব মেধাবী ছিল। ইন্টারমিডিয়েট পরীক্ষা দেওয়ার কথা ছিল, ঠিক তখনই দুর্ঘটনাটা ঘটে। যার দুটি হাত নেই, তার পক্ষে স্বাভাবিক কাজ করা কতটা কষ্টের—তা ভাষায় বোঝানো যায় না। দোকানে গিয়ে দেখি, নিজেই পানি আনে, চা বানায়, দোকান চালায়। ওর এই পরিশ্রমেই কোনোভাবে আমাদের সংসার চলছে।’
নিহালের এই সংগ্রাম সামনে থেকে দেখেন তার দোকানের ক্রেতা ও স্থানীয়রা। তারা বলেন, এটি আরও অনেককে উৎসাহিত করবে। এ গল্প সাহসের, আত্মমর্যাদার আর অদম্য ইচ্ছাশক্তির প্রতিচ্ছবি।