ময়মনসিংহ মেইল

মিটিমিটি আলো, দীর্ঘশ্বাসের রাত

বৃহত্তর ময়মনসিংহ · 2026-08-01 14:13:16 · মেইল ডেস্ক

রাত ১০টা ২৫ মিনিট। দিনের শেষ ট্রেনটি চলে যাওয়ার পর কিশোরগঞ্জ রেলস্টেশন যেন অন্য এক পৃথিবীতে রূপ নেয়। দিনের কোলাহল, হকারদের হাঁকডাক, যাত্রীদের ব্যস্ততা। সব ধীরে ধীরে মিলিয়ে যায়। টিকিট কাউন্টারের সামনে একটি মাত্র বাতি মিটিমিটি করে জ্বলে। আলো এতটাই ক্ষীণ যে, দূর থেকে মনে হয় সেও বুঝি ক্লান্ত হয়ে ঘুমিয়ে পড়তে চায়। সেই আলোয় দেখা যায় কয়েকটি ছেঁড়া চাদর, পুরোনো শাড়ি, মাথার নিচে চালের বস্তা আর কিছু মানুষের নিঃশব্দ জীবন।

এরা কেউ ট্রেন ধরতে আসেননি। কারও হাতে টিকিট নেই, কারও অপেক্ষায় কোনো স্বজনও নেই। স্টেশনের ঠান্ডা মেঝেই তাদের বিছানা। রাত শেষ হলেই আবার শুরু হবে ভিক্ষার ঝুলি হাতে কিংবা মানুষের বাসাবাড়িতে কাজের খোঁজে নতুন এক সংগ্রাম।

শহরের অধিকাংশ মানুষ যখন নিজের ঘরের দরজা বন্ধ করে নিশ্চিন্তে ঘুমিয়ে পড়েন, তখন এই মানুষগুলো নিজের শরীরটুকু গুটিয়ে চেষ্টা করেন শুধু রাতটা পার করে দিতে।

তাদের অনেকেরই ছেলেমেয়ে বড় হয়েছেন, উপার্জন করছেন, কিন্তু মায়ের জন্য একটু জায়গা হয়নি।

মোছা. জুবেদা আক্তারের (৬৫) বাড়ি ময়মনসিংহ জেলার নান্দাইল উপজেলার চণ্ডীপাশা ইউনিয়নের কাতলীপাড়া গ্রামে। দুই ছেলে, চার মেয়েকে মানুষ করতে জীবনের সবটুকু শক্তি খরচ করেছেন। নিজের মুখের খাবার সন্তানদের মুখে তুলে দিয়েছেন। একসময় ভেবেছিলেন, বয়স হলে সন্তানরা তার হাত ধরবে। কিন্তু বয়স বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে সংসার ছোট হয়ে গেছে, শুধু ছোট হয়নি তার একাকিত্ব। আজ তার ঠিকানা কিশোরগঞ্জ রেলস্টেশন। দিনভর ভিক্ষা করে যা পান, তা দিয়ে রাতের খাবার কেনেন। স্টেশনের ছোট দোকান থেকে দুটি রুটি আর সামান্য ডালভাজি খেয়ে টিকিট কাউন্টারের সামনে বসেন। পাশে বসেন তার মতোই কয়েকজন বৃদ্ধা। কারও হাতে পান, কারও হাতে লাঠি, কারও চোখে ঘুম। জুবেদা পান চিবাতে চিবাতে কখনো নিজের যৌবনের গল্প বলেন, কখনো সন্তানদের ছোটবেলার দুষ্টুমির কথা। কথা বলতে বলতে হঠাৎ থেমে যান। চোখের কোণে চিকচিক করে জল।

তারপর ধীরে বলেন, আগে সংসার ছিল, মানুষ ছিল। এখন শুধু রাত আছে, আর এই স্টেশন। একটি বাক্যেই যেন শেষ হয়ে যায় একটি মায়ের পুরো জীবন।

আঠারোবাড়ি এলাকার নুরজাহান বেগমের (৬০) স্বামী হোসেন মিয়া মারা গেছেন বহু আগেই। এক ছেলে, দুই মেয়েকে কষ্ট করে বড় করেছেন, মেয়েদের বিয়ে দিয়েছেন। ছেলে এখন রিকশা চালায়। তারও সংসার, সন্তান হয়েছে। ৫ বছর ধরে কিশোরগঞ্জ শহরে ভিক্ষা করেই বেঁচে আছেন নুরজাহান। মাঝে মাঝে মেয়েদের বাড়িতে যান। নাতি-নাতনিরা দৌড়ে এসে জড়িয়ে ধরে। কয়েকদিন ভালোই কাটে।

কিন্তু সেই সুখ বেশিদিন থাকে না। হাতে থাকা সামান্য টাকা শেষ হয়ে গেলে বুকের ভেতর অস্বস্তি জমতে থাকে। মনে হয়, আর থাকা ঠিক হবে না। নুরজাহান নিচের দিকে তাকিয়ে বলেন, হাতে টাকা থাকলে সবাই খোঁজ নেয়। টাকা শেষ হয়ে গেলে মনে হয়, আমি যেন বাড়তি মানুষ। তখন আবার স্টেশনে চলে আসি। কথাগুলো বলার সময় তিনি হাসার চেষ্টা করেন। কিন্তু সেই হাসির আড়ালে লুকিয়ে থাকা কষ্ট চোখ এড়িয়ে যায় না। পাশে বসা আছিয়া বেগমের প্রশ্নের উত্তর নেই। ঈশ্বরগঞ্জ উপজেলার তেরুয়ালী গ্রামের আছিয়া বেগমের বয়স ৬৫ বছর। দুই মেয়ের মা তিনি। ১২ থেকে ১৩ বছর ধরে মানুষের দ্বারে দ্বারে হাত পাতছেন। গত দুই-তিন বছর ধরে কিশোরগঞ্জ রেলস্টেশনই তার রাতের আশ্রয়।

তিনি বলেন, ‘আজ মানুষ কিছু দেয়, তাই খেতে পারি। কিন্তু যেদিন শরীর আর চলবে না, সেদিন এক গ্লাস পানি কে দেবে? এই প্রশ্নের উত্তর স্টেশনের দেয়ালও জানে না। সঙ্গে বসে সবার কথা শুনছিলেন অষ্ট্রগ্রাম কদমচালের লিনা আক্তার। মাত্র ৩৫ বছর বয়সেই অনেকটা পথ একা হেঁটে ফেলেছেন।’

পাঁচ বছর আগে স্বামী জাহাঙ্গীর মিয়া মারা যান। নেই কোনো সন্তান। বাবা আলাউদ্দিনকেও হারিয়েছেন ছোট বেলায়। বড় বোন মিনারার সংসারে নিজের জন্য জায়গা হয়নি। কয়েকদিন আগে কাজের খোঁজে কিশোরগঞ্জে এসেছেন। দিনের বেলা মানুষের বাসায় কাজ করেন। রাত হলেই ফিরে আসেন স্টেশনে। চারপাশে অচেনা মানুষ। গভীর রাত। ঘুম এলেও চোখ বন্ধ করতে ভয় লাগে।

তিনি বলেন, ‘রাতে সবচেয়ে বেশি ভয় লাগে। মনে হয়, কেউ যদি কিছু করে? কিন্তু যাওয়ার তো আর কোনো জায়গা নেই। তার এই ভয় শুধু তার একার নয়। স্টেশনের প্রায় প্রতিটি নারী একই আতঙ্ক নিয়ে রাত কাটান।’

একটি স্টেশন, অসংখ্য অসমাপ্ত জীবন

রাত যত গভীর হয়, স্টেশন তত নীরব হয়। রাতে হঠাৎ ট্রেনের হুইসেল বাজে। কিছুক্ষণ পর আবার সব শান্ত। মেঝেতে শুয়ে থাকা মানুষগুলোর কেউ হয়তো ঘুমিয়ে পড়েন, কেউ ঘুমানোর ভান করেন, কেউ সারারাত জেগে থাকেন।

ভোর হলে যাত্রীরা ট্রেনে উঠে গন্তব্যে চলে যান। কিন্তু জুবেদা, নুরজাহান, আছিয়া কিংবা লিনাদের গন্তব্য বদলায় না। তাদের সকাল মানে আবার মানুষের দরজায় কড়া নাড়া। দুপুর মানে রোদের মধ্যে হাঁটা। সন্ধ্যা মানে হিসাব কষা, আজ রাতে দুটো রুটি হবে কি না। আর রাত মানেই আবার সেই মিটিমিটি বাতির নিচে ফিরে আসা।

রাষ্ট্রের উন্নয়ন, শহরের ব্যস্ততা আর মানুষের ছুটে চলার ভিড়ে তারা যেন অদৃশ্য হয়ে যাওয়া কিছু মানুষ। তবু টিকিট কাউন্টারের সামনে জ্বলে থাকা সেই একটিমাত্র বাতি প্রতিরাতে নীরবে সাক্ষী হয়ে থাকে। সে দেখে, এই শহরে এখনও কিছু মানুষ আছেন, যাদের কাছে রেলস্টেশনের ঠান্ডা মেঝেই পৃথিবীর শেষ আশ্রয়।

হয়তো একদিন এই মানুষগুলোর নাম কেউ মনে রাখবে না। কিন্তু তাদের ফেলে যাওয়া দীর্ঘশ্বাসগুলো রেললাইনের ওপর ভোরের কুয়াশার মতোই নিঃশব্দে ভেসে থাকবে। কেউ দেখবে, কেউ দেখবে না। তবে তারা প্রতিটি রাতেই আমাদের সমাজকে একটি প্রশ্ন করে যায়, মানুষের শেষ আশ্রয় কি সত্যিই একটি রেলস্টেশনের মেঝে হওয়া উচিত?

আরও পড়ুন

সাম্প্রতিক সংবাদ

সর্বাধিক পঠিত