ফেরত এলো হাওড়ের ফসল রক্ষা বাঁধের সব ব্লক
বৃহত্তর ময়মনসিংহ · 2026-09-10 13:19:15 · প্রতিবেদক, মোহনগঞ্জ
নেত্রকোনার মোহনগঞ্জ উপজেলার ডিঙ্গাপোতা হাওড়ের চরহাইজদা ফসল রক্ষা বাঁধ থেকে নিয়ে যাওয়া ২ হাজার ৬৪৪টি ব্লক উদ্ধার করা হয়েছে।এ নিয়ে ময়মনসিংহ মেইলে গত ২৮ আগস্ট ‘নেত্রকোনার মোহনগঞ্জ: ফসল রক্ষা বাঁধের ব্লক লুট’ শিরোনামে একটি প্রতিবেদন প্রকাশিত হয়। পরে পুলিশ, উপজেলা প্রশাসন ও পানি উন্নয়ন বোর্ডের (পাউবো) উদ্যোগে ব্লকগুলো উদ্ধারের পর এখন নির্ধারিত স্থানে বসানো হচ্ছে।ব্লক নিয়ে যাওয়া ব্যক্তিদের কয়েকজন জানিয়েছেন, শুরুতে তারা বিষয়টির গুরুত্ব বুঝতে পারেননি। পরে পুলিশ ও পাউবোর কর্মকর্তারা বাড়িতে গিয়ে বোঝানোর পর নিজেরাই নৌকায় করে ব্লকগুলো ফিরিয়ে দিয়েছেন।বুধবার দুপুরে পাউবো নেত্রকোনা কার্যালয়ের নির্বাহী প্রকৌশলী সাখাওয়াত হোসেন বলেন, সব মিলিয়ে মোট ২ হাজার ৬৪৪টি ব্লক লুট হয়েছিল। পুলিশের সহায়তায় সব ব্লকই উদ্ধার করা হয়েছে। এখন এগুলো নির্ধারিত স্থানে বসানো হচ্ছে। পানি নেমে গেলে সিমেন্ট দিয়ে ব্লকগুলো শক্তভাবে স্থাপন করা হবে।ব্লক নিয়ে যাওয়া ব্যক্তিদের মধ্যে অন্তত পাঁচজন যুগান্তরকে বলেন, তারা প্রথমে বিষয়টি বুঝতে পারেননি যে বাঁধের এসব ব্লক হাওড়ের ফসল রক্ষায় গুরুত্বপূর্ণ। না বুঝেই তারা ব্লক নিয়ে গিয়েছিলেন। পরে তাদের বাড়িতে গিয়ে বিষয়টি বুঝিয়ে বললে তারা বিষয়টির গুরুত্ব বুঝতে পারেন। এরপর নিজেরাই নৌকায় করে ব্লকগুলো বাঁধের কাছে এনে ফেরত দেন।স্থানীয় কৃষক বাবুল মিয়া বলেন, ব্লক নিয়ে যাওয়ার ঘটনায় শুরুতে উদ্বেগ তৈরি হলেও পরে পুলিশ ও পাউবোর উদ্যোগে সব ব্লক ফেরত আসায় তারা স্বস্তি পেয়েছেন। স্থানীয় মানুষকে বাঁধের গুরুত্ব সম্পর্কে সচেতন করা গেলে ভবিষ্যতে এ ধরনের ঘটনা এড়ানো সম্ভব।স্থানীয় বাসিন্দা ও পাউবো সূত্রে জানা যায়, চরহাইজদা উপ-প্রকল্প ফসল রক্ষা বাঁধটির দৈর্ঘ্য ৬১ কিলোমিটার। ২০১৬-১৭ অর্থবছরে ডিঙ্গাপোতা হাওড়ের বোরো ফসল রক্ষায় বাঁধের অতি ঝুঁকিপূর্ণ স্থানগুলো শক্তিশালীকরণ প্রকল্পের আওতায় ৪ দশমিক ৭০০ কিলোমিটার বাঁধ ব্লক দিয়ে স্থায়ীভাবে নির্মাণ করা হয়। এতে ব্যয় হয় ৩৯ কোটি ৬৪ লাখ টাকা।বাঁধটি ডিঙ্গাপোতা হাওড়ের প্রায় সাড়ে ৬ হাজার হেক্টর জমির বোরো ধানসহ পাশের খালিয়াজুরি উপজেলার কয়েকটি হাওড়ের ফসল বন্যার পানি থেকে রক্ষায় গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে।এর আগে গত ১৮ আগস্ট সন্ধ্যা থেকে উত্তর বরান্তর বাজারের পাশে চিকাডুবি হাওড় এলাকায় বাঁধের প্রায় ২৫০ মিটার অংশ থেকে ব্লক খুলে নিয়ে যাওয়ার ঘটনা শুরু হয়। পরদিন স্থানীয় লোকজন বিষয়টি পাউবো ও উপজেলা প্রশাসনকে জানান। এরপর ২৩ আগস্ট পাউবোর উপসহকারী প্রকৌশলী মো. এনায়েত হোসেন মোহনগঞ্জ থানায় সাধারণ ডায়েরি (জিডি) করেন।পরে পুলিশ ও পাউবো সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের সঙ্গে কথা বলে ব্লকগুলো ফেরত দেওয়ার জন্য বোঝায়। নিয়ে যাওয়া কিছু ব্লক গোয়ালঘরে, কিছু মাচার নিচে এবং কিছু হাওড়ে নামার সিঁড়ি তৈরিতে ব্যবহার করা হয়েছিল। কেউ কেউ বাড়ির পাশে ঢেউ থেকে রক্ষার জন্যও সেগুলো রেখেছিলেন।বাঁধের পাশের বরান্তর গ্রামের ব্যবসায়ী বজলু মিয়া অভিযোগ করেন, বানিয়াহারী গ্রামের কয়েকজন ব্যক্তি নৌকায় করে ব্লক নিয়ে যাচ্ছিলেন। তিনি বাধা দিলে তাকে গালাগাল ও ভয়ভীতি দেখানো হয়।গাগলাজুর ইউনিয়নের ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান আশরাফ চৌধুরী বলেন, বানিয়াহারী গ্রামের লোকজন রাতের বেলা বাঁধ থেকে ব্লক নিয়ে গেছেন বলে তারা জানতে পারেন। পরে তাদের বাড়িঘরে কিছু ব্লক পাওয়া যায়। পুলিশ ও স্থানীয় ব্যক্তিদের উদ্যোগে শেষপর্যন্ত সব ব্লক ফেরত আনা সম্ভব হয়েছে।জানতে চাইলে পুলিশ সুপার মো. তরিকুল ইসলাম বলেন, ব্লক নিয়ে যাওয়ার অভিযোগ পাওয়ার পর পুলিশ সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের সঙ্গে কথা বলে সেগুলো ফেরত আনার উদ্যোগ নেয়। স্থানীয় মানুষের বোঝা উচিত, এই ব্লকগুলোর ওপর হাওড়ের হাজার হাজার হেক্টর জমির ফসলের নিরাপত্তা নির্ভর করে। সাময়িক সুবিধার জন্য বাঁধ থেকে ব্লক তুলে নেওয়া হলে বর্ষায় বাঁধ দুর্বল হয়ে ফসলের ক্ষতি হতে পারে। যারা ব্লক নিয়ে গিয়েছিলেন, তারা বিষয়টি বুঝতে পেরে সেগুলো ফিরিয়ে দিয়েছেন এটি ইতিবাচক দৃষ্টান্ত। ভবিষ্যতে যাতে কেউ না বুঝে বাঁধের কোনো সম্পদ সরিয়ে না নেন, সেজন্য স্থানীয় মানুষকে সচেতন হতে হবে। বাঁধ ও হাওড়ের সম্পদ রক্ষায় সবাইকে দায়িত্বশীল ভূমিকা রাখতে হবে।