বাকৃবিতে শিক্ষার্থীদের মারামারি, ইন্ধনের অভিযোগ অস্বীকার ছাত্রদল নেতার
ক্যাম্পাস মেইল · 2026-11-07 12:12:47 · মেইল ডেস্ক
বাংলাদেশ কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়ে (বাকৃবি) এক শিক্ষার্থীকে মারধর করে আহত করা এবং প্রাণনাশের হুমকি দেওয়ার অভিযোগ উঠেছে। এ ঘটনায় অভিযোগ এনে প্রক্টরের কাছে লিখিত অভিযোগ দিয়েছেন এস.এম. মেরাজুল আনোয়ার সিয়াম নামের এক শিক্ষার্থী।
সিয়াম ঈশা খাঁ হলের ১ম বর্ষের আবাসিক শিক্ষার্থী। অভিযোগপত্রে সোহরাওয়ার্দী হলের ১ম বর্ষের শিক্ষার্থী নাজমুল হাসান ইমনের বিরুদ্ধে তাকে মারধরের অভিযোগ করেন তিনি। এ ঘটনার ইন্ধনদাতা হিসেবে ছাত্রদলের যুগ্ম আহ্বায়ক মেজবাউল হক মিজু, সোহরাওয়ার্দী হলের তৃতীয় বর্ষের শিক্ষার্থী ইমনসহ কয়েকজনের বিরুদ্ধে অভিযোগ তুলেছেন। তবে অভিযোগকে মিথ্যা বলে দাবি করেছেন মেজবাউল হক মিজু।
পরবর্তীতে ওই ঘটনার রেশ ধরে পরের দিন সোহরাওয়ার্দী হলের তৃতীয় বর্ষের শিক্ষার্থী ইমনকে মারধরের অভিযোগ ওঠে ঈশা খাঁ হলের প্রথম বর্ষের কয়েকজন শিক্ষার্থীর বিরুদ্ধে। এ বিষয়ে ভুক্তভোগী ইয়ামিনও প্রক্টর অফিসে অভিযোগ জানান।
সিয়াম তার অভিযোগপত্রে উল্লেখ করেন, গত ৩ নভেম্বর বিকাল আনুমানিক ৪টার দিকে বন্ধুর সঙ্গে দেখা করতে সোহরাওয়ার্দী হলের এ ব্লকের ১০২ নম্বর কক্ষে যান সিয়াম। সেখানে তার বন্ধু তাসনিমকে না পেয়ে কক্ষে অবস্থানরত পূর্বপরিচিত এক শিক্ষার্থীর আমন্ত্রণে তিনি বসেন। কিছুক্ষণ পর একই কক্ষে উপস্থিত ৬৫ ব্যাচের কৃষি অনুষদের শিক্ষার্থী নাজমুল হাসান ইমন তাকে বিভিন্ন অপ্রাসঙ্গিক প্রশ্ন করতে থাকেন। একপর্যায়ে তাদের মধ্যে কথা-কাটাকাটি শুরু হয়।
সিয়ামের অভিযোগ, একপর্যায়ে ইমন তার ওপর শারীরিকভাবে হামলা চালান এবং এলোপাতাড়ি চড়, কিল ও ঘুষি মারেন। এতে তার ডান চোখে গুরুতর আঘাত লাগে এবং চোখের আশপাশে কালশিটে পড়ে যায়। পরে তিনি কোনোভাবে ওই কক্ষ থেকে বের হয়ে আসেন।
অভিযোগপত্রে আরও উল্লেখ করা হয়, ঘটনার সময় সোহরাওয়ার্দী হলের কয়েকজন শিক্ষার্থী সেখানে উপস্থিত ছিলেন। তাদের মধ্যে হলটির ছাত্রদলের যুগ্ম আহ্বায়ক, তৃতীয় বর্ষের শিক্ষার্থী ইয়ামিনসহ কয়েকজনের উপস্থিতির কথা উল্লেখ করেছেন সিয়াম। এ ছাড়া পরবর্তী সময়ে বিষয়টি মীমাংসার প্রস্তাব দেওয়া হলে তাকে বিভিন্ন ধরনের মারধর ও প্রাণনাশের হুমকি দেওয়া হয় বলে অভিযোগ করেন তিনি। এ ঘটনায় ছাত্রদলের যুগ্ম আহ্বায়ক মেজবাউল হক মিজুর বিরুদ্ধে হামলার ইন্ধন দেওয়ার অভিযোগও তুলেছেন সিয়াম।
ঘটনার পর নিজ আবাসিক হল ঈশা খাঁ হলে ফিরে সহপাঠী ও জ্যেষ্ঠ শিক্ষার্থীদের বিষয়টি জানান সিয়াম। পরে বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রক্টরের কাছে লিখিত অভিযোগ দিয়ে ঘটনার সুষ্ঠু ও নিরপেক্ষ তদন্তের দাবি জানান তিনি।
এ বিষয়ে অভিযোগকারী শিক্ষার্থী মেরাজুল ইসলাম সিয়াম বলেন, আমি অভিযোগপত্র জমা দিয়েছি। প্রক্টর স্যার আমাকে এ ব্যাপারে পরবর্তীতে দেখা করতে বলেছেন। সমস্যা সমাধান না হওয়া পর্যন্ত আমি এ বিষয়ে আর কিছু বলতে চাচ্ছি না।
প্রত্যক্ষদর্শী সোহরাওয়ার্দী হলের ১০২ নম্বর কক্ষের আবাসিক শিক্ষার্থী মুগ্ধ বলেন, আমি ওই সময় রুমেই উপস্থিত ছিলাম। প্রথমে যখন সিয়াম জানালার সামনে এসেছিল, আমি তখন খেয়াল করিনি। ওই সময় রুমে থাকা নাজমুল তাকে তার পরিচয় জিজ্ঞেস করে। কিন্তু উত্তরে সিয়াম কিছু বলে না। পরে যখন তাকে চিনতে পারলাম, তখন আমি তাকে রুমের ভেতরে বসতে বলি। তখনও নাজমুল সিয়ামকে তার নাম-পরিচয় জিজ্ঞেস করছিল, কিন্তু সিয়াম কোনো উত্তর দিচ্ছিল না। একপর্যায়ে তাদের মধ্যে তর্কাতর্কি হয় এবং তারা একে অপরকে আঘাত করে। নাজমুলের আঘাত সিয়ামের চোখের নিচে লাগে এবং সে পরে পানি দিতে বাথরুমে চলে যায়। পরবর্তীতে আমি তাকে ডেকে এনে বিষয়টি সমাধান করার চেষ্টা করলে সে হলে যাওয়ার কথা বলে চলে যায়।
ওই ঘটনার রেশ ধরে পরের দিন, গত ৪ নভেম্বর, সোহরাওয়ার্দী হলের তৃতীয় বর্ষের শিক্ষার্থী ইয়ামিনকে মারধরের অভিযোগ ওঠে ঈশা খাঁ হলের কয়েকজন শিক্ষার্থীর বিরুদ্ধে।
জানা যায়, গত ৪ নভেম্বর করিম ভবনে সোহরাওয়ার্দী হলের একজন শিক্ষার্থীকে আটক করে রাখা হয়। পরবর্তীতে তাকে ছাড়াতে এবং বিষয়টি সমাধান করতে সোহরাওয়ার্দী হল থেকে কয়েকজন শিক্ষার্থী সেখানে উপস্থিত হন। তাদের মধ্যে একজন ছিলেন ইয়ামিন। একপর্যায়ে করিম ভবনের সামনের হোটেলে দুপুরে খাবার খাওয়ার সময় ঈশা খাঁ হলের কয়েকজন শিক্ষার্থী এসে তাকে মারধর শুরু করেন। এ বিষয়ে ভুক্তভোগী ইয়ামিন প্রক্টর অফিসে অভিযোগ জানান।
ভুক্তভোগী শিক্ষার্থী ইয়ামিন বলেন, আমি বিগত দিনের কোনো ঘটনা সম্পর্কেই অবগত ছিলাম না। ৪ তারিখ আমি হলে ফেরার পথে যখন জানতে পারি হলের জুনিয়রকে আটক করা হয়েছে, তাকে ছাড়ানোর জন্যই আমি ঘটনাস্থলে উপস্থিত হই। পরবর্তীতে আমি করিম ভবনের সামনের হোটেলে খেতে যাই। সেই সময়ই সেখানে ঈশা খাঁ হলের প্রায় ২০ থেকে ২৫ জন উপস্থিত হন এবং আমার হলের নাম জানতে চান। যখন তারা জানতে পারেন আমি সোহরাওয়ার্দী হলের, তখন তারা সবাই মিলে আমাকে এলোপাতাড়িভাবে মারতে শুরু করেন।
অভিযোগপত্রে তার নাম উল্লেখের বিষয়ে তিনি জানান, ঘটনার পরের দিন (৫ নভেম্বর) আমি জানতে পারি, আমার বিরুদ্ধে মারপিটের ইন্ধন দেওয়ার অভিযোগ করা হয়েছে। কিন্তু আমি এ ঘটনা সম্পর্কে কিছুই জানতাম না। এমনকি আমি ওই দিন (৩ নভেম্বর) ঘটনার সময় হলে উপস্থিত ছিলাম না। বিষয়টা এমন যে, আমাকেই মারধর করে আমার নামেই মারপিটের অভিযোগ দেওয়া হলো।
অভিযুক্ত নাজমুল হাসান ইমন বলেন, সিয়াম যখন আমাদের রুমে তাসনিমকে খুঁজতে আসে, তখন আমি তার পরিচয় জানতে বারবার নাম জিজ্ঞেস করি। কিন্তু সে সেটার উত্তর না দিয়ে আমাকে বিভিন্ন উসকানিমূলক মন্তব্য করতে থাকে। একপর্যায়ে কথা-কাটাকাটির জেরে আমাদের মধ্যে হাতাহাতি হয়।
অভিযোগের বিষয়ে অভিযুক্ত মেজবাউল হক মিজু বলেন, ঈশা খাঁ হলের ছেলেটি যে সময় তাকে মারার এবং আমাকে সোহরাওয়ার্দী হলে দেখার কথা বলেছে, আমি সে সময় হলে উপস্থিতই ছিলাম না। হলের হাই রেজল্যুশন সিসি ক্যামেরা আছে। কে কখন হলে ঢুকছে, কখন বের হচ্ছে—সবই দেখা যায়। ক্যামেরার ফুটেজ দেখলেই বিষয়টি প্রমাণিত হয়ে যাবে। আরও পড়ুনআরও পড়ুনএইচএসসির সাপ্লিমেন্টারি পরীক্ষার ফি নিয়ে জরুরি নির্দেশনা
সিয়ামকে মারধরের ঘটনায় তার ইন্ধনের অভিযোগ প্রত্যাখ্যান করে তিনি বলেন, ঘটনা ঘটার পরে আমি জানতে পেরেছি। যাদের মধ্যে মারামারি হয়েছে, তারা কেউই আমার পরিচিত না। আমি যতটুকু জানি, সিয়ামকে যে মারধর করেছে, সে তারই বন্ধু এবং সে ছাত্রদলের অন্যান্য নেতাকর্মী ও তাদের অনুসারীদের সঙ্গে ঘোরাফেরা করে। আমি তাকে চিনিও না। এখানে আমি ইন্ধনদাতা কীভাবে হতে পারি? এই মিথ্যা অভিযোগের সুষ্ঠু তদন্ত হওয়া উচিত।
মেজবাউল হক মিজু পাল্টা অভিযোগ করে বলেন, আমরা ৪ তারিখ করিম ভবনে যাই এক জুনিয়রকে সাহায্য করতে এবং ফেরার পথে আমাদের সঙ্গে থাকা সোহরাওয়ার্দী হলের চতুর্থ বর্ষের শিক্ষার্থী ইয়ামিন পাশের খাবারের দোকানে গেলে তার ওপর অতর্কিত হামলা করা হয়। এই হামলার বিষয়ে আমরাও লিখিত অভিযোগ জমা দেব।
এ বিষয়ে বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রক্টর অধ্যাপক ড. মো. আবদুল আলীম বলেন, আমরা সিয়ামের অভিযোগপত্রটি পেয়েছি এবং ভিডিও ফুটেজসহ বিভিন্ন প্রমাণ খতিয়ে দেখছি। ঈশা খাঁ হলের জুনিয়র ছেলেরা সোহরাওয়ার্দী হলের একজন সিনিয়রকে মেরেছে, এটারও অভিযোগ পেয়েছি। সব বিষয় নিয়েই প্রক্টরিয়াল বডি তৎপর আছে। হলে যেন ছাত্রশৃঙ্খলা বজায় থাকে, এর জন্য আমরা আপ্রাণ চেষ্টা করছি।