নদীর পানি কমলে মাছ কমে, বাড়ে ঋণের বোঝা
বৃহত্তর ময়মনসিংহ · 2026-09-09 08:08:50 · স্টাফ রিপোর্টার
ভোরের আলো ফোটার আগেই যমুনার বুক চিরে নৌকা নিয়ে বেরিয়ে পড়েন জেলেরা। কারও নৌকায় বড়, কারও নৌকায় ছোট প্রজাতির মাছ। রাতভর নদীতে মাছ ধরার পর ভোরে সেই মাছ নিয়ে জামালপুরের ইসলামপুর উপজেলার গুঠাইল পাইলিং ঘাটে জড়ো হন শত শত জেলে।
শুরু হয় হাঁকডাক বেচাকেনার ব্যস্ততা। তবে যমুনার জলে মাছ থাকলেও জেলেদের জীবনে যেন স্বস্তি নেই। নদীর পানি কমলে মাছ কমে, আর মাছ কমলেই বাড়ে ঋণের বোঝা।
নৌকা ও জাল মেরামত কিংবা সংসারের খরচ মেটাতে অনেক জেলেই আড়তদার ও মহাজনের কাছ থেকে ঋণ নেন। পরে সেই ঋণ পরিশোধ করতে ধরা মাছের একটি অংশ তাদের দিয়ে দিতে হয়। ফলে দিন-রাত পরিশ্রম করেও অনেক জেলের হাতে থাকে না কাঙ্ক্ষিত আয়ের টাকা।
সরেজমিন দেখা গেছে, সবে ফুটেছে ভোরের আলো। এরই মধ্যে যমুনার বুকে শুরু হয়ে গেছে হাঁকডাক। একে একে ঘাটে ভিড়তে থাকে জেলেদের নৌকা। নৌকা থেকে নামানো হয় রাতভর কষ্ট করে ধরা মাছ। কারও ঝুড়ি থাকে মাছে ভরা, আবার কারও ঝুড়িতে এত কম মাছ থাকে যে, তা বিক্রি করে সংসারের বাজার খরচ মেটানোই কঠিন।
প্রতিদিন ভোর হলেই গুঠাইল পাইলিং ঘাটে যমুনার মাছ নিয়ে এখানে জড়ো হন শত শত জেলে, পাইকার ও খুচরা ক্রেতা। দূর-দূরান্ত থেকে আসা ক্রেতাদের হাঁকডাকে মুখর হয়ে ওঠে পুরো ঘাট। তবে এ কোলাহলের আড়ালেই চাপা পড়ে থাকে জেলেদের দীর্ঘশ্বাস।
জেলেরা জানান, যমুনায় পানি বাড়লে মাছের পরিমাণও বাড়ে। তখন তাদের মুখে ফুটে ওঠে আশার আলো। কিন্তু পানি কমতে শুরু করলেই মাছের সরবরাহ কমে যায়। একই সঙ্গে কমে যায় আয়। সংসার চালানো, নৌকা মেরামত কিংবা ছিঁড়ে যাওয়া জাল কিনতে তখন তাদের ছুটতে হয় আড়তদার বা মহাজনের কাছে। ঋণ নিয়ে কোনোভাবে দিন পার করলেও পরে মাছ বিক্রি করে সেই ঋণ পরিশোধ করতে হয়।
সাপধরী এলাকার জেলে রবিজল কালবেলাকে বলেন, ‘বর্ষা মৌসুমে নদীতে পানি থাকে। তখন কিছুটা মাছ পাওয়া যায়। কিন্তু শুষ্ক মৌসুমে নদীর পানি কমে গেলে মাছ ধরার সুযোগও কমে যায়। তখন জেলেদের অলস সময় কাটাতে হয়। সংসার চালাতে বাধ্য হয়ে মহাজনের কাছ থেকে দাদন নিতে হয়। পরে মাছ দিয়ে সেই ঋণের টাকা ও সুদ পরিশোধ করতে হয়। এভাবেই অভাব-অনটনের মধ্যে চলছে জেলেদের জীবন।’
গুঠাইল ঘাটের আড়তদার রিপন মিয়া বলেন, ‘বছরের শুরুতে জাল ও নৌকা মেরামতের জন্য অনেক জেলে অগ্রিম টাকা নেন। পরে মাছ দিয়ে সেই টাকা ও সুদের হিসাব সমন্বয় করা হয়। প্রতিদিন জেলেরা যে মাছ ধরেন, তা বাজারদর অনুযায়ী বিক্রি করা হয়। ঋণের টাকা থেকে কিছু অংশ রেখে বাকি টাকা জেলেদের বুঝিয়ে দেওয়া হয়।’
গুঠাইল ঘাটের জেলে নরেশ চন্দ্র বলেন, ‘নদীতে আর আগের মতো মাছ পাওয়া যায় না। যতটুকু মাছ পাওয়া যায়, তা দিয়ে সংসার চালানো কঠিন। তাই বাধ্য হয়ে অনেকেই এ পেশা ছেড়ে অন্য পেশায় চলে যাচ্ছে।’
আরেক মাছের আড়তদার রবিউল কালবেলাকে বলেন, ‘যমুনার বিভিন্ন প্রজাতির মাছের চাহিদা দেশজুড়ে রয়েছে। এ কারণে প্রতিদিন জেলার বাইরের বিভিন্ন এলাকা থেকেও পাইকাররা গুঠাইল ঘাটে মাছ কিনতে আসেন। তবে এই ঘাটের বেচাকেনায় এখনও পুরোনো পদ্ধতির প্রভাব রয়েছে। আড়তদারদের মাধ্যমে অনেক সময় মাছের দাম নির্ধারণ হয়। ফলে জেলেদের নিজেদের মাছের মূল্য নির্ধারণের ক্ষমতা সীমিত। দিন শেষে মাছ বিক্রি করে ঘাট ছাড়ার সময় তাদের চোখে থাকে পরের দিনের আশার আলো। কারণ যমুনাই তাদের জীবিকা, স্বপ্ন ও বেঁচে থাকার প্রধান অবলম্বন।’