ময়মনসিংহ মেইল

ময়মনসিংহে অধিকাংশ সরকারি দপ্তরেই নেই সিটিজেন চার্টার

বৃহত্তর ময়মনসিংহ · 2026-09-07 08:15:52 · স্টাফ রিপোর্টার

জনগণের সরকারি সেবা পাওয়ার অধিকার নিশ্চিত করতে প্রতিটি সরকারি দপ্তরে সিটিজেন চার্টার থাকার কথা। কোন দপ্তর থেকে কী সেবা পাওয়া যাবে, কীভাবে আবেদন করতে হবে, প্রয়োজনীয় কাগজপত্র কী, সেবার জন্য নির্ধারিত ফি কত, কত সময়ের মধ্যে সেবা পাওয়ার কথা এবং দায়িত্বপ্রাপ্ত কর্মকর্তা কে- এসব তথ্য স্পষ্টভাবে উল্লেখ থাকার কথা এ চার্টারে। কিন্তু ময়মনসিংহের সরকারি দপ্তরগুলোর বাস্তব চিত্র বলছে, নাগরিকের এই মৌলিক তথ্যপ্রাপ্তির অধিকার এখনো অনেক ক্ষেত্রেই উপেক্ষিত।

ময়মনসিংহে জেলা প্রশাসন, পুলিশ সুপারের কার্যালয়, গণপূর্ত বিভাগ, সড়ক বিভাগ, শিক্ষা প্রকৌশল অধিদপ্তর, কাস্টমস-এক্সাইজ-ভ্যাট বিভাগ, কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তর, সমাজসেবা অধিদপ্তর, পাসপোর্ট অফিস, বিআরটিএ, ভূমি অফিস, হাসপাতালসহ বিভিন্ন সরকারি দপ্তরের অন্তত ৪০টি কার্যালয় রয়েছে।

গত কয়েকদিনে সরেজমিন এসব কার্যালয়ের মধ্যে মাত্র ৮টিতে সিটিজেন চার্টারের উপস্থিতি পাওয়া গেছে।

সাধারণ মানুষের জন্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ এই চার্টার অধিকাংশ অফিসে না থাকায় সরকারি সেবা নিতে গিয়ে নাগরিকদের পড়তে হচ্ছে নানা ভোগান্তিতে। কোথায় আবেদন করতে হবে, কী কী কাগজপত্র লাগবে, সরকারি ফি কত কিংবা কতদিনের মধ্যে সেবা পাওয়ার কথা- এসব মৌলিক তথ্য জানতে অনেককেই নির্ভর করতে হচ্ছে অফিসের কর্মচারী, পরিচিত ব্যক্তি কিংবা দালালের ওপর।

শুধু চার্টার না থাকার বিষয়ই নয়, যেসব দপ্তরে সিটিজেন চার্টার পাওয়া গেছে, সেখানেও সবকিছু সন্তোষজনক নয়। কোথাও তা সাধারণ মানুষের দৃষ্টিগোচর নয়, আবার কোথাও চার্টারের ওপরই জমে আছে ময়লা-আবর্জনা। কোনো কোনো ক্ষেত্রে চার্টারে থাকা তথ্য অসম্পূর্ণ, হালনাগাদ নয় কিংবা অভিযোগ প্রতিকার ব্যবস্থার প্রয়োজনীয় তথ্যও নেই।

সংশ্লিষ্টদের মতে, সিটিজেন চার্টার কেবল একটি তথ্যবোর্ড নয়; এটি সরকারি প্রতিষ্ঠান ও নাগরিকের মধ্যে সেবা প্রদানের প্রতিশ্রুতির লিখিত প্রকাশ। এর মাধ্যমে একজন নাগরিক জানতে পারেন তার অধিকার, সেবা পাওয়ার শর্ত, নির্ধারিত সময় ও প্রতিকার চাওয়ার পদ্ধতি। অথচ অনেক সিটিজেন চার্টারেই দায়িত্বপ্রাপ্ত কর্মকর্তা বা তথ্য প্রদানকারী কর্মকর্তার নাম, পদবি, ফোন নম্বর ও ই-মেইল উল্লেখ নেই।

ফলে একজন নাগরিক কোনো সরকারি সেবা নিতে গিয়ে কার কাছে যাবেন, কতদিনের মধ্যে সেবা পাওয়ার কথা কিংবা সেবা না পেলে কোথায় অভিযোগ করবেন- এসব বিষয়ে স্পষ্ট ধারণা পান না।

‘চার্টার নেই, তবে কাজ করে দেওয়া হয়’

মন্ত্রিপরিষদ বিভাগের ‘মন্ত্রণালয়/বিভাগ/দপ্তর/সংস্থার সেবা প্রদান প্রতিশ্রুতি (সিটিজেনস চার্টার) প্রণয়ন সংক্রান্ত নির্দেশিকা, ২০১৭’ অনুযায়ী নাগরিক, প্রাতিষ্ঠানিক ও অভ্যন্তরীণ- এ তিন ধরনের সেবার কাঠামো নির্ধারণ করা হয়েছে। প্রতিটি সেবার ক্ষেত্রে সেবার নাম, সেবা প্রদানের পদ্ধতি, প্রয়োজনীয় কাগজপত্র ও প্রাপ্তিস্থান, সেবার মূল্য ও পরিশোধ পদ্ধতি, সেবা প্রদানের সময়সীমা এবং দায়িত্বপ্রাপ্ত কর্মকর্তার নাম, পদবি, ফোন নম্বর ও ই-মেইল উল্লেখ থাকার কথা।

ময়মনসিংহের বিভিন্ন সরকারি অফিস ঘুরে এই মৌলিক তথ্যের ব্যাপক ঘাটতি দেখা গেছে। জেলা প্রশাসকের কার্যালয়ের ভূমি অধিগ্রহণ শাখায় সেবা নিতে আসা বাবুল হোসেন বলেন, একটি সরকারি সেবা নিতে গিয়ে আমাকে একাধিক কর্মকর্তা-কর্মচারীর কাছে ঘুরতে হয়েছে। কোথায় আবেদন করতে হবে, কী কী কাগজপত্র প্রয়োজন কিংবা নির্ধারিত ফি কত- এসব বিষয়ে আগে থেকে পরিষ্কার কোনো তথ্য পাইনি। অফিসে সিটিজেন চার্টার স্পষ্ট ও দৃশ্যমানভাবে প্রদর্শিত থাকলে সেবার প্রক্রিয়া সম্পর্কে আগেই জানতে পারতাম। এতে সময় ও ভোগান্তি দুটোই অনেক কমে যেত।

নগরীর সিনিয়র সিটিজেন আবুল হাসনাত বলেন, সরকারি সেবার নিয়ম ও প্রক্রিয়া সম্পর্কে জনগণকে অন্ধকারে রাখলে দালাল নির্ভরতা ও হয়রানি বাড়ে। একই সঙ্গে অনিয়ম-দুর্নীতির সুযোগও তৈরি হয়। নাগরিক যদি না জানেন তার কাজের সরকারি খরচ কত, কতদিনে কাজ হওয়ার কথা কিংবা সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তা কে- তাহলে সহজ একটি কাজ করতেও তাকে বিভিন্নজনের দ্বারে দ্বারে ঘুরতে হয়।

ময়মনসিংহ কাস্টমস, এক্সাইজ ও ভ্যাট বিভাগীয় কার্যালয়ে সিটিজেন চার্টার সম্পর্কে জানতে চাইলে এক কর্মকর্তা বলেন, এ কার্যালয়ে কোনো সিটিজেন চার্টার নেই। আমাদের দপ্তরে সিটিজেন চার্টারের প্রয়োজনও নেই।

গুরুত্বপূর্ণ অফিসগুলোতে মধ্যে ময়মনসিংহ পুলিশ সুপারের কার্যাল, সড়ক ভবন ও গণপূর্ত বিভাগের কার্যালয়েও সিটিজেন চার্টার পাওয়া যায়নি। এসব প্রতিষ্ঠানের কর্মকর্তাদের সঙ্গে কথা বলেও সিটিজেন চার্টার সম্পর্কে পর্যাপ্ত ধারণার ঘাটতি দেখা গেছে।

অথচ সিটিজেন চার্টারের মূল উদ্দেশ্যই হলো ব্যক্তিনির্ভরতা কমিয়ে সরকারি সেবার তথ্য প্রাতিষ্ঠানিকভাবে সবার জন্য উন্মুক্ত করা। অর্থাৎ ‘বড় স্যারের’ কাছে যাওয়ার পরিবর্তে একজন নাগরিক যেন নির্ধারিত নিয়মেই প্রয়োজনীয় তথ্য ও সেবা পেতে পারেন, সেটিই হওয়া উচিত সিটিজেন চার্টারের লক্ষ্য।

ময়মনসিংহ জেলা পুলিশ সুপার কার্যালয়ের ফ্রন্ট ডেস্কে কর্মরত কনস্টেবল হোসনে আরা বলেন, সিটিজেন চার্টার বা নাগরিক সেবা সম্পর্কে তিনি অবগত নন। তার ভাষ্য, জেলা পুলিশ সুপার কার্যালয়ে সিটিজেন চার্টারসংক্রান্ত কোনো বোর্ড বা ব্যানারও তার নজরে পড়েনি।

চার্টার থাকলেও কোথাও ময়লার স্তূপ

যেসব অল্প কয়েকটি দপ্তরে সিটিজেন চার্টারের দেখা মিলেছে, সেখানেও চিত্র পুরোপুরি সন্তোষজনক নয়। কোথাও চার্টার সাধারণ মানুষের দৃষ্টির আড়ালে রাখা হয়েছে, আবার কোথাও চার্টারের ওপর জমে আছে ময়লার স্তূপ।

এতে নাগরিকদের জন্য গুরুত্বপূর্ণ তথ্য সহজে পাওয়ার সুযোগ যেমন বাধাগ্রস্ত হচ্ছে, তেমনি সিটিজেন চার্টারকে কার্যকর নাগরিকসেবা উপকরণ হিসেবে প্রতিষ্ঠার পরিবর্তে অনেক ক্ষেত্রেই তা দায়সারা আনুষ্ঠানিকতায় পরিণত হওয়ার চিত্র ফুটে উঠছে।

সরকারি বিভিন্ন দপ্তর ঘুরে দেখা গেছে, সিটিজেন চার্টারের অনুপস্থিতির সবচেয়ে বড় ভোগান্তির শিকার হচ্ছেন সাধারণ মানুষ। সরকারি সেবার নিয়ম-কানুন, নির্ধারিত ফি, সেবা প্রদানের সময়সীমা ও দায়িত্বপ্রাপ্ত কর্মকর্তার তথ্য প্রকাশ্যে না থাকায় একজন নাগরিককে অনেক সময় অফিসের কর্মচারী, পরিচিত ব্যক্তি কিংবা দালালের ওপর নির্ভর করতে হয়।

একজন নাগরিক যদি না জানেন তার কাঙ্ক্ষিত সেবা পেতে সরকারি ফি কত, কাজটি সম্পন্ন হতে কত সময় লাগার কথা এবং সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তা কে- তাহলে নির্ধারিত ফির চেয়ে অতিরিক্ত অর্থ দাবি করা হলেও তাৎক্ষণিকভাবে প্রশ্ন তোলা বা প্রতিকার চাওয়া কঠিন হয়ে পড়ে। ফলে সিটিজেন চার্টারের অনুপস্থিতি শুধু তথ্যের ঘাটতিই নয়, নাগরিকের অধিকার ও সরকারি দপ্তরের জবাবদিহি নিশ্চিত করার ক্ষেত্রেও বড় বাধা হয়ে দাঁড়াতে পারে।

নির্দেশিকা অনুযায়ী, কোনো নাগরিক সরকারি সেবা নিয়ে অসন্তুষ্ট হলে প্রথমে দায়িত্বপ্রাপ্ত কর্মকর্তার কাছে অভিযোগ জানাতে পারেন। এরপর অভিযোগ নিষ্পত্তি কর্মকর্তা, আপিল কর্মকর্তা এবং প্রয়োজন হলে মন্ত্রিপরিষদ বিভাগের অভিযোগ ব্যবস্থাপনা সেলে যাওয়ার সুযোগ রয়েছে। অভিযোগ নিষ্পত্তির জন্য ৩০ কার্যদিবস, আপিল কর্মকর্তার ক্ষেত্রে ২০ কার্যদিবস এবং পরবর্তী পর্যায়ে ৬০ কার্যদিবসের সময়সীমা নির্ধারিত রয়েছে।

ময়মনসিংহের অধিকাংশ সরকারি দপ্তরেই যেখানে সিটিজেন চার্টার দৃশ্যমান নয় বা একেবারেই নেই, সেখানে একজন সাধারণ নাগরিক এসব অধিকার সম্পর্কে জানবেন কীভাবে? কার কাছে অভিযোগ করতে হবে, কতদিনের মধ্যে অভিযোগের নিষ্পত্তি হওয়ার কথা এবং প্রতিকার না পেলে পরবর্তী কোথায় যেতে হবে- এসব তথ্যই যদি নাগরিকের কাছে অজানা থাকে, তাহলে জবাবদিহি নিশ্চিত করার পুরো ব্যবস্থাটিই কার্যত প্রশ্নের মুখে পড়ে।

ময়মনসিংহ মহানগর সুজনের সম্পাদক আলী ইউসুফ বলেন, সিটিজেন চার্টার কোনো দপ্তরের দেয়ালে ঝুলিয়ে রাখার আনুষ্ঠানিক কাগজ নয়; এটি নাগরিকের অধিকার ও সরকারি সেবার জবাবদিহি নিশ্চিত করার একটি গুরুত্বপূর্ণ হাতিয়ার। সিটিজেন চার্টার দৃশ্যমান, স্পষ্ট ও হালনাগাদ না থাকলে সাধারণ মানুষ কাঙ্ক্ষিত সেবা সম্পর্কে সঠিক তথ্য থেকে বঞ্চিত হন। এর ফলে একদিকে নাগরিকের অধিকার ক্ষুণ্ন হয়, অন্যদিকে দুর্নীতি, অনিয়ম ও হয়রানির সুযোগ তৈরি হয়। তাই প্রতিটি সরকারি দপ্তরে সিটিজেন চার্টার যথাযথভাবে প্রদর্শন ও নিয়মিত হালনাগাদ করা জরুরি।

সচেতন নাগরিক কমিটি (সনাক), ময়মনসিংহের সভাপতি শরীফুজ্জামান পরাগ বলেন, সরকারি দপ্তরে সিটিজেন চার্টার শুধু প্রদর্শন করলেই হবে না; এটি হতে হবে নাগরিক সেবা নিশ্চিত করার কার্যকর দলিল। ময়মনসিংহের সরকারি দপ্তরগুলোতে সিটিজেন চার্টার দৃশ্যমানভাবে প্রদর্শনের পাশাপাশি নিয়মিত হালনাগাদ করতে হবে। একই সঙ্গে কর্মকর্তা-কর্মচারীদের পাশাপাশি সাধারণ নাগরিকদেরও এ বিষয়ে অবহিত করার উদ্যোগ নেওয়া জরুরি।

তিনি আরও বলেন, চার্টারে কোন সেবা কত সময়ে পাওয়া যাবে, সংশ্লিষ্ট দায়িত্বপ্রাপ্ত কর্মকর্তা কে এবং সেবা নিয়ে কোনো অভিযোগ হলে কোথায় প্রতিকার পাওয়া যাবে- এসব তথ্য বাস্তবে কার্যকর করতে হবে। শুধু চার্টার প্রণয়ন করে দেয়ালে টাঙিয়ে রাখলে নাগরিকরা এর সুফল পাবেন না। সিটিজেন চার্টারে দেওয়া প্রতিশ্রুত সেবার বাস্তব প্রয়োগ ও জবাবদিহি নিশ্চিত করা গেলেই নাগরিক হয়রানি কমবে এবং সরকারি সেবার মান আরও উন্নত হবে।

তবে সিটিজেন চার্টার নিয়ে আশার কথা শুনিয়েছেন ময়মনসিংহের জেলা প্রশাসক মো. সাইফুর রহমান। তিনি বলেন, সিটিজেন চার্টার হলো নাগরিকদের সঙ্গে রাষ্ট্রের অলিখিত চুক্তি। প্রতিটি অফিসেই থাকার কথা। যেসব কার্যালয়ে সিটিজেন চার্টার নেই, তা মনিটরিং করে ব্যবস্থা নেওয়া হবে।

আরও পড়ুন

সাম্প্রতিক সংবাদ

সর্বাধিক পঠিত