ময়মনসিংহ মেইল

দুই বছরেও বিচার হয়নি শেরপুরের তিন শিক্ষার্থী হত্যার, পরিবারের আহাজারি থামেনি

বৃহত্তর ময়মনসিংহ · 2026-08-05 10:39:04 · স্টাফ রিপোর্টার

২০২৪ সালের জুলাই আন্দোলনের সময় ৪ আগস্ট উত্তপ্ত হয়ে ওঠে শেরপুর জেলা শহর। ওইদিন সংঘর্ষ ও সহিংসতায় প্রাণ হারান তিন শিক্ষার্থী সবুজ মিয়া, মাহবুব আলম ও শারদুল আশীষ সৌরভ। আহত হন আরও অনেকে। তবে দুই বছর পেরিয়ে গেলেও এখনো কোনো হত্যাকাণ্ডের বিচার সম্পন্ন হয়নি। চার্জশিট দাখিল ও তদন্তেই সীমাবদ্ধ রয়েছে এসব মামলা।নিহত তিনজনের একজন সবুজ মিয়া (১৮)। তিনি শ্রীবরদী উপজেলার রূপাপাড়া এলাকার বাসিন্দা এবং এইচএসসি পরীক্ষার্থী ছিলেন। বাবার অসুস্থতার কারণে লেখাপড়ার পাশাপাশি একটি ওষুধের দোকানে কাজ করে সংসার চালাতেন।২০২৪ সালের ৪ আগস্ট বিকেলে শেরপুর শহরের বিভিন্ন স্থানে বৈষম্যবিরোধী আন্দোলনকারীরা জড়ো হলে সবুজও তাতে অংশ নেন। খরমপুর-কলেজমোড় সড়কে বিপরীত দিক থেকে আসা একটি আওয়ামী লীগ মিছিল থেকে ছোড়া গুলি সবুজের মাথার ডান পাশে লাগে। এতে ঘটনাস্থলেই লুটিয়ে পড়েন তিনি। পরে জেলা সদর হাসপাতালে নেওয়া হলে চিকিৎসক তাকে মৃত ঘোষণা করেন।সবুজের মা সমেজা বেগম বলেন দুই বছর ধইরা পোলা হারাইছি। কত জায়গায় গেলাম, বিচার পাইলাম না। আমার স্বামীও অসুস্থ, ছেলের মৃত্যুর পর অবস্থা আরও খারাপ হইছে। বিচার পামু কিনা জানি না—সরকারের কাছে কই, আমার পোলারে দেন, না হয় আমার সবুজরে ফিরাইয়া দেন। এ কথা বলেই কান্নায় ভেঙে পড়েন তিনি।অন্যদিকে নিহত মাহবুব আলম (২১) ও শারদুল আশীষ সৌরভ (২১) মারা যান গাড়িচাপায়। তারা দুজনই সম্মান প্রথম বর্ষের শিক্ষার্থী ছিলেন—মাহবুব শেরপুর সরকারি কলেজের এবং সৌরভ ঝিনাইগাতীর সেকান্দর আলী কলেজের।ঘটনার দিন বিকেল সোয়া ৫টার দিকে খরমপুর সড়কে ছাত্র-জনতা মিছিল বের করলে পেছন দিক থেকে আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর যৌথ টহলে থাকা নির্বাহী ম্যাজিস্ট্রেটের একটি গাড়ি আন্দোলনকারীদের ওপর উঠে যায়। অভিযোগ রয়েছে, তৎকালীন নির্বাহী ম্যাজিস্ট্রেট তরিকুল ইসলাম শাকিলের নির্দেশে চালক হারুনুর রশীদ দ্রুতগতিতে গাড়ি চালিয়ে দেন। এতে ঘটনাস্থলেই মাহবুব ও সৌরভ নিহত হন।ঘটনার ভিডিও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়লে পুরো জেলায় আন্দোলন আরও তীব্র হয়ে ওঠে।মাহবুব আলম পরিবারের ছোট ছেলে ছিলেন। অসুস্থ বাবার পাশে দাঁড়াতে ফ্রিল্যান্সিং করে সংসারের দায়িত্ব নিয়েছিলেন। একইভাবে সৌরভও ফ্রিল্যান্সিং করতেন।মাহবুবের মা মাফুজা খানম বলেন, ‘দুই বছর হইয়া গেল, আমার পুলার হত্যার বিচার পাইলাম না। যে ম্যাজিস্ট্রেটের গাড়ি চাপা দিল, তারও বিচার হইলো না। আমার ছেলে কইতো বড় আইটি উদ্যোক্তা হমু, আমারে বাড়ি-গাড়ি দিমু।’এ কথা বলেই কান্নায় ভেঙে পড়েন তিনি।তিনি আরও বলেন, চার্জশিট হইছে, কিন্তু বিচার ক্যান আটকা আছে জানি না। বিচারও পাই না, ছেলেকেও পাই না।সৌরভের বাবা ছোরহাব আলী বলেন,ছেলের কথা মনে হইলে ঠিক থাকতে পারি না। মামলা করছি বিচারের আশায়, কিন্তু কোনো অগ্রগতি দেখি না। পোলার বিচার দেখতে দেখতে হয়তো আমিই কবরে যামু।এ বিষয়ে বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলন শেরপুর জেলার সাবেক আহ্বায়ক মামুনুর রহমান বলেন,‘আমাদের তিন ভাই নিহত হয়েছে, কিন্তু এখনো বিচার পাইনি। চার্জশিট দেওয়ার পরও বিচারকাজে দেরি হচ্ছে কেন হচ্ছে, আমরা বুঝতে পারছি না। আমরা দ্রুত সবুজ, মাহবুব ও সৌরভ হত্যার বিচার চাই।মাওলানা ভাসানী বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ের ক্রিমিনোলজি অ্যান্ড পুলিশ সায়েন্স বিভাগের সহযোগী অধ্যাপক আওরঙ্গজেব আকন্দ বলেন,যেকোনো গণআন্দোলনের সময় সংঘটিত হত্যাকাণ্ড ও অন্যান্য অপরাধসমূহকে সামাজিক, রাজনৈতিক ও প্রাতিষ্ঠানিক সংকটের ফল হিসেবে বিশ্লেষণ করা হয় । অপরাধবিজ্ঞানের দৃষ্টিকোণ থেকে বলা যায়, জুলাই গণআন্দোলনের মতো উচ্চ-উত্তেজনাপূর্ণ পরিস্থিতিতে জনতার মনস্তত্ত্ব, রাজনৈতিক মেরুকরণ, রাষ্ট্রের প্রতিক্রিয়া, গুজব, সুযোগের সৃষ্টি এবং আইন-শৃঙ্খলা ব্যবস্থার সক্ষমতা সবগুলো উপাদান একসঙ্গে সহিংসতার ঝুঁকি বৃদ্ধি করেছিল।  এ ধরনের হত্যাকাণ্ডের বিচার বিলম্বিত হওয়ার পেছনে সাধারণত একাধিক কারণ একসঙ্গে কাজ করে। সাধারণত এসব মামলায় বহুসংখ্যক আসামি, বিপুল সংখ্যক সাক্ষী, ডিজিটাল ও ফরেনসিক প্রমাণ সংগ্রহে বিলম্ব, প্রাতিষ্ঠানিক দুর্বলতা এবং ঘটনার রাজনৈতিক ও সামাজিক জটিলতা তদন্ত ও বিচারকে দীর্ঘায়িত করতে পারে।  এ ধরনের হত্যাকাণ্ডের ক্ষেত্রে ব্যক্তিগত অপরাধীর পাশাপাশি অপরাধ সংগঠনের পরিস্থিতি ও তাৎক্ষণিক সৃষ্ট সুযোগও বিশ্লেষণ করতে হয়। আবার, বিলম্বিত বিচার ন্যায়বিচারের কার্যকারিতা কমিয়ে দেয়, কারণ এতে ভুক্তভোগীদের আস্থা ক্ষুণ্ন হয়, সাক্ষীদের স্মৃতি দুর্বল হয়ে পড়ে, প্রমাণের মান নষ্ট হওয়ার ঝুঁকি বাড়ে এবং শাস্তির প্রতিরোধমূলক প্রভাব কমে যায়। তবে একই সঙ্গে এটিও মনে রাখতে হবে যে, দ্রুত বিচার নিশ্চিত করার নামে ন্যায্য বিচার (due process) ও অভিযুক্তের আইনি অধিকার ক্ষুণ্ন হচ্ছে কিনা। কারণ, এই ধরনের সংবেদনশীল এবং রাজনৈতিক প্রকৃতির মামলায় আদালতের রায়ের প্রতি জাতীয় ও আন্তর্জাতিক মহলের বিশেষ পর্যবেক্ষণ থাকে। সেক্ষেত্রে পুঙ্খানুপুঙ্খভাবে আদালতকে প্রতিটি পদক্ষেপ ও তথ্য প্রমাণের ভিত্তিতে যথাযথ উপায় অবলম্বন করেই ন্যায়বিচার নিশ্চিত করতে হয়। যেন আদালতের রায় কোন ভাবেই পলিটিক্যালি বায়াসড বা মানবাধিকারের দৃষ্টিকোণ থেকে নেতিবাচক সমালোচনার সম্মুখীন না হয়।মামলার অগ্রগতি সম্পর্কে শেরপুরের অতিরিক্ত পুলিশ সুপার (প্রশাসন ও অর্থ) মো. মিজানুর রহমান ভূঁঞা বলেন ৫ আগস্ট সংশ্লিষ্ট ঘটনায় দায়ের হওয়া মামলাগুলোর মধ্যে তিনটি হত্যা মামলা রয়েছে। আমরা এসব মামলার চার্জশিট দাখিল করেছি। বাকি মামলাগুলোও চার্জশিট প্রক্রিয়াধীন। দ্রুত আদালতে দাখিল করা হবে।তিনি আরও বলেন, যাদের বিরুদ্ধে চার্জশিট দেওয়া হয়েছে, তাদের বিষয়ে শেরপুর জেলা পুলিশ আইনগত প্রক্রিয়া চালিয়ে যাচ্ছে।দুই বছর পেরিয়ে গেলেও বিচার না পাওয়ায় ক্ষোভ ও হতাশা বাড়ছে নিহতদের পরিবারে। ন্যায়বিচারের অপেক্ষায় দিন গুনছেন তারা—কবে শেষ হবে এই দীর্ঘ প্রতীক্ষা, সে প্রশ্ন এখন সবার।

আরও পড়ুন

সাম্প্রতিক সংবাদ

সর্বাধিক পঠিত