ময়মনসিংহ মেইল

দ্রব্যমূল্যের চাপে ম্লান প্রতিমাশিল্পীদের মুখের হাসি, তবু থামে না সৃষ্টির নেশা

বৃহত্তর ময়মনসিংহ · 2026-10-14 09:48:34 · স্টাফ রিপোর্টার

শঙ্খের সুরে আগমনী বার্তা। সফেদ মেঘের আড়ালে নীল আকাশ, নদীর বুকে ঢেউ, আর শরতের বাতাসে দুলতে থাকা কাশফুল। প্রকৃতির এমন স্নিগ্ধ সাজেই বাঙালির দুয়ারে আসে শারদীয় দুর্গোৎসব। দেবী দুর্গার আগমনে মর্ত্যে যেন জেগে ওঠে নতুন প্রাণ, ছড়িয়ে পড়ে উৎসবের আবহ। অশুভের বিনাশ আর শুভশক্তির জয়ের প্রত্যাশায় মণ্ডপে মণ্ডপে শুরু হয় শেষ মুহূর্তের প্রস্তুতি।

কিন্তু যে প্রতিমার সামনে দাঁড়িয়ে ভক্তরা প্রণাম করেন, যে শিল্পকর্মে খুঁজে পান দেবীর মমতাময়ী রূপ, সেই প্রতিমা তৈরির নেপথ্যে থাকা মানুষগুলোর গল্প কতজনই-বা জানেন? মাটির সঙ্গে মিশে থাকা তাদের ঘাম, চোখের ক্লান্তি আর সংসারের হিসাব খুব কমই জায়গা পায় উৎসবের আলোকসজ্জায়।

ময়মনসিংহ নগরীর নতুন বাজার ফলের আড়তের শেষ প্রান্তে স্যাঁতসেঁতে একটি ঘর। চারপাশে কাদা, বাঁশ, কাঠ আর প্রতিমা তৈরির নানা সরঞ্জাম। আবছা আলো-ছায়ার সেই কর্মশালায় নিপুণ হাতে মাটির অবয়বে প্রাণের ছোঁয়া দেয়ার চেষ্টা করছেন প্রবীণ প্রতিমাশিল্পী শম্ভু দাশ। বছরের পর বছর ধরে তার হাতেই মাটি হয়ে উঠেছে দুর্গা, কার্তিক, গণেশ কিংবা অসুরের প্রতিমা।

বয়সের ভারে শরীর ক্লান্ত, চোখেও আগের মতো দৃষ্টি নেই। তবু দুর্গাপূজা এলেই যেন নতুন করে জেগে ওঠে তার শিল্পীসত্তা। শরীর সায় না দিলেও মন পড়ে থাকে প্রতিমা তৈরির কাজে। এ যেন শুধু জীবিকার তাগিদ নয়, দীর্ঘ পাঁচ দশকের অভ্যাস আর ভালোবাসার এক অমোঘ টান।

মাত্র ১৪ বছর বয়সে প্রতিমা তৈরির কাজে হাতেখড়ি শম্ভু দাশের। ময়মনসিংহের আমলাপাড়ার এই শিল্পী প্রথিতযশা মৃৎশিল্পী অজয় ভৌমিকের কাছে শিখেছিলেন প্রতিমা গড়ার কৌশল। ছাত্রজীবনেই দুর্গাপূজা এলেই তাকে টানত প্রতিমা তৈরির কর্মশালা। পড়াশোনার পাশাপাশি শুরু হওয়া সেই পথচলা যে একদিন জীবনের অবিচ্ছেদ্য অংশ হয়ে উঠবে, তখন হয়তো ভাবেননি তিনি।

পড়াশোনা শেষ করে যোগ দেন সরকারি চাকরিতে। কিন্তু চাকরির ব্যস্ততাও থামাতে পারেনি প্রতিমা তৈরির কাজ। একদিকে চাকরি, অন্যদিকে মাটির প্রতিমা গড়ার নেশা; দুইয়ের সমন্বয়ে চলেছে তার জীবন। দেখতে দেখতে কেটে গেছে ৫০ বছর।

অবসরে যাওয়ার পর এখন একমাত্র ছেলে অজয়কে সঙ্গে নিয়ে সারা বছরই কমবেশি প্রতিমা তৈরির কাজ করেন শম্ভু। তাদের এই কর্মযজ্ঞে কাজের সুযোগ পান অন্য কারিগরেরাও।

তবে বয়সের সঙ্গে সঙ্গে বদলেছে শরীরের সামর্থ্য, বেড়েছে কাজের চাপ। তবু দুর্গাপূজার মৌসুমে প্রতিমা তৈরির আহ্বান উপেক্ষা করতে পারেন না তিনি।

শম্ভু দাশ এখন টিভিকে বলেন, ‘বয়স হয়েছে, একবার মনে হয় কাজ ছেড়ে দিই, অনেক তো হলো। চোখে আগের মতো দেখতে পাই না, শরীরে নানা অসুখ বাসা বেঁধেছে। কিন্তু পূজার সময় এলে মনকে আর বেঁধে রাখতে পারি না। এ যেন এক অদ্ভুত নেশা। নিজ হাতে দুর্গা, কার্তিক, গণেশ, অসুর তৈরি করব, এই ভেবেই কাজ শুরু করি। ছেলেটাও আমার মতো প্রতিমা তৈরি থেকে রং করায় পটু।’

তার কথায়, পাঁচ দশকের এই পথচলায় মাটির প্রতিমা শুধু পেশা নয়, হয়ে উঠেছে জীবনের অংশ। তাই অবসরের ভাবনা এলেও দুর্গাপূজার আগমনী সুর তাকে আবার ফিরিয়ে আনে কর্মশালায়।

প্রতিমার কাঠামো তৈরি থেকে শুরু করে মাটি লাগানো, শুকানো, রং করা এবং অলংকরণের কাজ; প্রতিটি ধাপেই প্রয়োজন সময়, দক্ষতা ও শ্রম। এর সঙ্গে জড়িত বাঁশ, কাঠ, খড়, মাটি, রংসহ বিভিন্ন উপকরণ। কিন্তু এসব কাঁচামালের দাম বাড়ায় প্রতিমা তৈরির ব্যয়ও বেড়েছে।

শম্ভু দাশ জানান, গত বছর যে আকারের একটি প্রতিমা তৈরিতে প্রায় ৩০ হাজার টাকা খরচ হয়েছিল, এবার একই আকারের প্রতিমা তৈরিতে ব্যয় হচ্ছে ৪০ থেকে ৪৫ হাজার টাকা। অর্থাৎ প্রতিমাপ্রতি খরচ বেড়েছে ১০ থেকে ১৫ হাজার টাকা। কিন্তু সেই অনুপাতে বাড়েনি প্রতিমার দাম। ফলে কাঁচামালের ব্যয় মেটানো ও শ্রমিকদের মজুরি দেয়ার পর কাঙ্ক্ষিত লাভ থাকে না।

আক্ষেপ নিয়ে তিনি বলেন, ‘বর্তমানে দ্রব্যমূল্যের যে দাম বৃদ্ধি হয়েছে, কোনো মৃৎশিল্পী ভালো নেই। গ্রামের অবস্থা আরও করুণ। সারা পৃথিবীতে মৃৎশিল্পীদের কদর আছে, কিন্তু আমাদের নেই।’

মাটির তৈরি জিনিসপত্রের ব্যবহার কমে যাওয়ার বিষয়টিও ভাবিয়ে তুলছে প্রবীণ এই শিল্পীকে। বলেন, ‘প্লাস্টিকের আগ্রাসনে মানুষ মাটির জিনিসপত্র ব্যবহার প্রায় ভুলেই গেছে। একসময় দই-মিষ্টির দোকানে মাটির পাত্রের ব্যবহার ছিল স্বাভাবিক দৃশ্য। এখন সেই জায়গাও ক্রমে সংকুচিত হচ্ছে।’

প্রতিমাশিল্পীদের কাছে তাই দুর্গাপূজা একদিকে সৃষ্টির আনন্দ, অন্যদিকে টিকে থাকার লড়াই। দেবীর মুখে হাসি ফুটিয়ে তুলতে যাদের দিনরাত পরিশ্রম করতে হয়, তাদের নিজেদের সংসারে স্বস্তি ফেরানোই হয়ে উঠছে কঠিন।

সনাতন ধর্মাবলম্বীদের সবচেয়ে বড় ধর্মীয় উৎসব দুর্গাপূজা। তবে এ উৎসবের আনন্দ শুধু একটি ধর্মীয় সম্প্রদায়ের মধ্যে সীমাবদ্ধ থাকে না। জাতি, ধর্ম ও বর্ণ নির্বিশেষে মানুষের মিলনমেলা হয়ে ওঠে দুর্গোৎসব। মণ্ডপে মণ্ডপে প্রতিমা, আলোকসজ্জা, পূজা-অর্চনা আর সাংস্কৃতিক আয়োজনের মধ্য দিয়ে গড়ে ওঠে সৌহার্দ্য ও সম্প্রীতির বন্ধন।

দেবী দুর্গার প্রতিমা নির্মাণের প্রতিটি ধাপে থাকে শিল্পীর সৃজনশীলতা। খড়ের কাঠামোর ওপর মাটির প্রলেপ, ধীরে ধীরে মুখাবয়ব তৈরি, চোখ আঁকা, রং ও অলংকরণের মধ্য দিয়ে ফুটে ওঠে দেবীর রূপ। প্রতিটি প্রতিমার পেছনে থাকে কারিগরের নিজস্ব দক্ষতা, অভিজ্ঞতা ও অনুভূতি।

কিন্তু উৎসবের আলোয় প্রতিমা যতটা দৃশ্যমান, তার নির্মাতারা ততটাই আড়ালে। পূজা শেষে মণ্ডপ থেকে প্রতিমা বিদায় নিলেও শিল্পীদের সামনে থেকে যায় পরবর্তী কাজের চিন্তা, দেনা-পাওনার হিসাব আর সংসার চালানোর দায়িত্ব।

শম্ভু দাশের মতো প্রবীণ কারিগরদের অভিজ্ঞতা ও দক্ষতা এ শিল্পের বড় সম্পদ। তাদের পরবর্তী প্রজন্ম যেন এই পেশায় আগ্রহ হারিয়ে না ফেলে, সে জন্য শিল্পের যথাযথ মূল্যায়ন ও ন্যায্য পারিশ্রমিক নিশ্চিত করা জরুরি।

দুর্গাপূজাকে ঘিরে প্রতিমা তৈরির পাশাপাশি জমে ওঠে নানা উপকরণের বাজার। শাঁখা, সিঁদুর, মালা, মুকুট, পলাসহ পূজাসামগ্রী এবং নতুন পোশাক কিনতে বাজারে ভিড় করেন ক্রেতারা। তবে এবার এসব পণ্যের বেচাকেনা নিয়েও পুরোপুরি সন্তুষ্ট নন ব্যবসায়ীরা।

ব্যবসায়ীদের ভাষ্য, শাঁখার দাম নতুন করে না বাড়লেও বিক্রি আশানুরূপ হচ্ছে না। বর্তমানে শাঁখা বিক্রি হচ্ছে ৫০০ টাকা থেকে আড়াই হাজার টাকা পর্যন্ত। পাশাপাশি বিবাহের শাঁখা, সিঁদুর, মুকুট, মালা ও অন্যান্য পূজাসামগ্রীর বিক্রিও কমেছে।

পূজার পোশাক কিনতে এসে পছন্দমতো ও মানানসই পোশাক না পাওয়ার কথা জানিয়েছেন কয়েকজন ক্রেতা। তবে উৎসব শুরুর কাছাকাছি সময়ে বেচাকেনা বাড়বে বলে আশা করছেন ব্যবসায়ীরা।

এবার ময়মনসিংহ জেলায় ৮১৪টি মণ্ডপে দুর্গাপূজা অনুষ্ঠিত হবে। উৎসবটি নির্বিঘ্নে ও শান্তিপূর্ণ পরিবেশে সম্পন্ন করতে প্রস্তুতি নেয়া হয়েছে বলে জানিয়েছেন সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিরা।

জেলার পূজা উদযাপন কমিটির ভারপ্রাপ্ত সভাপতি অ্যাডভোকেট মিলন কান্তি সরকার আশা প্রকাশ করেন, সব ধর্ম ও বর্ণের মানুষের অংশগ্রহণে সুন্দর পরিবেশে দুর্গোৎসব অনুষ্ঠিত হবে।

অন্যদিকে, পূজাকে কেন্দ্র করে নিরাপত্তাব্যবস্থা জোরদার করা হয়েছে বলে জানিয়েছে পুলিশ। প্রতিটি পূজামণ্ডপে সিসিটিভি ক্যামেরা স্থাপনের পাশাপাশি সাদাপোশাকে গোয়েন্দা নজরদারি বাড়ানো হয়েছে।

ময়মনসিংহের অতিরিক্ত পুলিশ সুপার মো. আবদুল্লাহ আল-মামুন জানান, দুর্গাপূজা ঘিরে জেলায় নিরাপত্তাব্যবস্থা জোরদার করা হয়েছে।

এরই মধ্যে নানা আনুষ্ঠানিকতায় বিভিন্ন মন্দিরে মহালয়া উদ্‌যাপন করা হয়েছে। চণ্ডীপাঠ, শঙ্খধ্বনি, মাতৃবন্দনা ও নৃত্যনাট্যের মধ্য দিয়ে দেবীপক্ষকে স্বাগত জানিয়েছেন ভক্তরা।

শরতের আকাশে সাদা মেঘ, কাশফুলের দোলা আর শঙ্খের সুরে দেবীর আগমনী বার্তা ছড়িয়ে পড়েছে চারদিকে। মণ্ডপে মণ্ডপে চলছে শেষ মুহূর্তের প্রস্তুতি। কোথাও প্রতিমার রং শেষ হচ্ছে, কোথাও সাজানো হচ্ছে দেবীর অলংকার। সেই কর্মব্যস্ততার আড়ালে শম্ভু দাশের মতো শিল্পীরা লড়ছেন বাড়তি খরচ আর অনিশ্চিত আয়ের সঙ্গে।

আরও পড়ুন

সাম্প্রতিক সংবাদ

সর্বাধিক পঠিত