ঝালকাঠির ২ আসনে বিএনপিতে বিদ্রোহের শঙ্কা
আসন্ন ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে ঝালকাঠির দুটি সংসদীয় আসনে বিএনপির ভেতর বিদ্রোহের শঙ্কা দেখা দিয়েছে। দলীয় মনোনয়ন নিয়ে অনিশ্চয়তা ও গুঞ্জনের কারণে ঝালকাঠি-১ (রাজাপুর-কাঁঠালিয়া) ও ঝালকাঠি-২ (নলছিটি-ঝালকাঠি) আসনে অস্বস্তিকর পরিস্থিতি তৈরি হয়েছে। ঝালকাঠি-১ আসন থেকে বিএনপির প্রার্থী হয়ে একাধিকবার সংসদ সদস্য ও মন্ত্রী ছিলেন ব্যারিস্টার শাহজাহান ওমর। তবে রাজনৈতিক পট পরিবর্তনে ২০২৩ সালে শাহজাহান ওমর আওয়ামী লীগে যোগ দিয়ে এই আসন থেকেই নির্বাচিত হন। সে সময় রাজাপুর ও কাঁঠালিয়ার একাধিক বিএনপি নেতা আওয়ামী লীগে যোগ দিলে তাদের দল থেকে বহিষ্কার করা হয়।
৫ আগস্ট আওয়ামী
লীগ সরকার পতনের পর নতুন করে ঝালকাঠি-১ আসনে বিএনপির মনোনয়ন প্রত্যাশী হিসেবে মাঠে
নামেন একাধিক কেন্দ্রীয় নেতা। এর মধ্যে ছিলেন রফিকুল ইসলাম জামাল, গোলাম আজম সৈকত,
সেলিম রেজা, মোস্তাফিজুর রহমান ও মঈন ফিরোজী। তারা এলাকায় এসে বিএনপির ৩১ দফা বাস্তবায়নের
লিফলেট বিতরণ, গণসংযোগসহ নানা কর্মসূচি পালন করেন। তবে এই সময়ের মধ্যে সবচেয়ে বেশি
বিতর্কে জড়ান বিএনপির কেন্দ্রীয় নির্বাহী কমিটির ধর্ম বিষয়ক সম্পাদক রফিকুল ইসলাম জামাল।
দলীয় সূত্রে জানা যায়,
অতীতে চাঁদাবাজির অভিযোগে পদস্থগিত ও বহিষ্কৃত ব্যক্তি এবং আওয়ামী লীগে যোগ দেওয়া নেতাদের
সঙ্গে নিয়ে কর্মসূচি করায় রফিকুল ইসলাম জামাল বিতর্কিত ছিলেন। ঝালকাঠি-১ (রাজাপুর-কাঁঠালিয়া)
আসনে বিএনপির মনোনয়নপ্রত্যাশী ছিলেন ছাত্রদলের সাবেক কেন্দ্রীয় নেতা গোলাম আজম সৈকত। এই আসনে একাধিক নেতা মনোনয়ন প্রত্যাশা করলেও রাজপথের আন্দোলন ও সাংগঠনিক কর্মকাণ্ডে
সক্রিয় থাকায় সৈকতকে সম্ভাব্য প্রার্থী হিসেবে বিবেচনা করা হচ্ছিল। তবে সব জল্পনা-কল্পনার
অবসান ঘটিয়ে বিএনপির কেন্দ্রীয় ধর্মবিষয়ক সম্পাদক রফিকুল ইসলাম জামালকে এই আসনে দলীয়
মনোনয়ন দেওয়া হয়। এতে স্থানীয় ত্যাগী বিএনপির নেতাকর্মীদের একাংশের মধ্যে ক্ষোভ তৈরি
হয়। গত ১১ ডিসেম্বর কাঁঠালিয়া উপজেলার ৫ নং শৌলজালিয়া ইউনিয়নে নিষিদ্ধ সংগঠন আওয়ামী
যুবলীগের সাধারণ সম্পাদক মো. আনোয়ার হোসেন তোফাজ্জেল, আওয়ামী লীগের সাবেক প্রাথমিক
ও গণশিক্ষা প্রতিমন্ত্রীর একান্ত সচিব আতিকুর রহমান রুবেলসহ আওয়ামীলীগের নেতাকর্মীদের
নিয়ে কম্বল বিতরণ করায় এতে আরো বিতর্কের জন্ম দেয়। অনুষ্ঠানে রফিকুল ইসলাম জামাল প্রকাশ্যে
আওয়ামী লীগ ও বিএনপির বিরোধ ভুলে একসঙ্গে কাজ করার আহ্বান জানান। তার এই বক্তব্য সামাজিক
যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়লে ক্ষোভে ফেটে পড়েন স্থানীয় বিএনপির নেতাকর্মীদের বড় একটি
অংশ। কিন্তু তিনি শুরু থেকেই আওয়ামী লীগ ও বিএনপির পদসস্থগিত নেতা কর্মীদের নিয়ে
পূর্বেও আলোচনায় এসেছিলেন এবং যার কারণে দলের মধ্যে বিভাজন সৃষ্টি হয়েছিল।
রবিবার (২১ ডিসেম্বর) ঝালকাঠি
জেলা রিটার্নিং কর্মকর্তা ও জেলা প্রশাসক মো. মমিন উদ্দিনের কাছ থেকে জামাল মনোনয়নপত্র
সংগ্রহ করেন। এর পরদিন (২২ ডিসেম্বর) সহকারী রিটার্নিং কর্মকর্তা ও কাঁঠালিয়া উপজেলা
নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) মো. মকবুল হোসেনের কাছ থেকে গোলাম আজম সৈকতের পক্ষে মনোনয়নপত্র
সংগ্রহ করেন তার ভাই, মালয়েশিয়া স্বেচ্ছাসেবক দলের যুগ্ম আহ্বায়ক মো. গোলাম কবির।
দলীয় সূত্রে জানা গেছে,
দেশের বিভিন্ন আসনে বিএনপির মনোনয়ন পরিবর্তনের নজির থাকায় ঝালকাঠি-১ আসনেও পরিবর্তনের
সম্ভাবনা রয়েছে—এমন আশাতেই সৈকত মনোনয়নপত্র সংগ্রহ করেছেন। দলীয়
মনোনয়ন না পেলে তিনি বিদ্রোহী প্রার্থী হতে পারেন—এমন আলোচনা চলছে তার সমর্থকদের মধ্যে। যদিও এ বিষয়ে
এখনো কোনো শীর্ষ নেতা প্রকাশ্যে মন্তব্য করতে চাননি।
শেষ মুহূর্ত পর্যন্ত দলীয়
সিদ্ধান্তের অপেক্ষায় থাকার কথা জানিয়ে সৈকত বলেন, ‘ঝালকাঠি-১
আসনে বিএনপি থেকে কেন্দ্রীয় কমিটির ধর্ম বিষয়ক সম্পাদক রফিকুল ইসলাম জামালকে মনোনয়ন
প্রদান করা হয়েছে। তবে নির্বাচনে বিজয় নিশ্চিত করা ও আর্থিক সহযোগিতা অর্জনের লক্ষ্যে
তিনি আওয়ামীলীগের নেতৃবৃন্দকে সঙ্গে নিয়ে রাজনৈতিক কর্মকাণ্ড পরিচালনা করছেন, যা দলীয়
নীতি ও আদর্শের সঙ্গে সাংঘর্ষিক।’
তিনি আরো বলেন, ‘দলীয় প্রতীকের চিঠি না দেওয়া পর্যন্ত অপেক্ষার সুযোগ আছে। তাই মাঠ ছাড়ার
প্রশ্নই আসে না। তাছাড়া এই মনোনয়ন যে চূড়ান্ত নয়, তা দলীয়ভাবেই বলা হয়েছে।’
মনোনয়ন পরিবর্তনের আশায়
সৈকত রাজাপুর ও কাঁঠালিয়ায় প্রচার-প্রচারণা অব্যাহত রেখেছেন। গত শুক্রবার নিজ উদ্যোগে
রাজাপুর উপজেলা বিএনপির কার্যালয় উদ্বোধন করেন তিনি। কাঁঠালিয়াতেও তার পক্ষে শোডাউন
ও গণসংযোগ চলমান রয়েছে। আগামী ৩০ ডিসেম্বর মনোনয়নপত্র জমা দেওয়ার কথা জানিয়েছেন তিনি।
তবে রফিকুল ইসলাম জামাল এসব অভিযোগ অস্বীকার করে বলেন, ‘একটি সামাজিক অনুষ্ঠানে কারা উপস্থিত থাকবেন তা আমাকে আগে জানানো হয়
না। এ নিয়ে বিভ্রান্তি সৃষ্টি হওয়ায় আমি দুঃখিত। ন্যায়ভিত্তিক সমাজ ও মানুষের অধিকার
প্রতিষ্ঠাই আমাদের লক্ষ্য।’
ইসলামী দলগুলোর মধ্যে জামায়াতে
ইসলামী থেকে ড. ফয়জুল হক, ইসলামী আন্দোলন বাংলাদেশ থেকে মাওলানা ইব্রাহীম আল হাদি,
বাংলাদেশ খেলাফত মজলিস থেকে মুফতি নুরুল্লাহ আশরাফী মাঠে রয়েছেন। এছাড়া জাতীয় নাগরিক
পার্টি (এনসিপি) থেকে ডা. মাহমুদা আলম মিতু, জেএসডি থেকে জেলা জেএসডির সভাপতি সোহরাব
হোসেন এবং ন্যাশনাল পিপলস পার্টি থেকে ডা. পি কে মিত্রকে সম্ভাব্য প্রার্থী হিসেবে
ঘোষণা দেওয়া হয়েছে।
এদিকে বিএনপির মনোনয়ন নিয়ে
শরিক দল বাংলাদেশ লেবার পার্টির অসন্তোষ প্রকাশ পেয়েছে। দলটির চেয়ারম্যান ড. মোস্তাফিজুর
রহমান ইরান বলেন, ‘ঝালকাঠি–১ আসনে জোটগত সমন্বয়ের আলোচনা থাকলেও পরে তা বাতিল
হওয়ায় জোট রাজনীতিতে চাপ তৈরি হয়েছে।’ তিনি জানান, লেবার পার্টি ইতোমধ্যে ৭৫টি আসনে প্রার্থী
ঘোষণা করেছে এবং তিনি নিজেই এ আসন থেকে লেবাল পার্টির প্রার্থী হিসেবে নির্বাচনে অংশ
গ্রহণ করবেন। বিএনপির দলীয় মনোনয়ন পরিবর্তন না হলে এবং বিদ্রোহী প্রার্থী হলে এই আসনে
বিএনপির জয়ের সম্ভাবনা দুর্বল হয়ে পড়তে পারে বলে মনে করছেন স্থানীয় নেতাকর্মীরা। এতে
ভোট বিভাজনের সুযোগে সুবিধা পেতে পারেন প্রতিদ্বন্দ্বী প্রার্থীরা।
ঝালকাঠি-২ আসনেও অনিশ্চয়তা
ঝালকাঠি-২ (নলছিটি-ঝালকাঠি)
আসনেও বিদ্রোহের গুঞ্জন শোনা যাচ্ছে। এই আসনে সাবেক সংসদ সদস্য ও বিএনপির জাতীয় নির্বাহী
কমিটির সদস্য ইসরাত সুলতানা ইলেন ভূট্টোকে প্রাথমিকভাবে মনোনয়ন দেওয়া হলেও জটিলতা তৈরি
হয়েছে। গত বৃহস্পতিবার ঢাকায় অনুষ্ঠিত মনোনয়নপ্রাপ্ত প্রার্থীদের বৈঠকে তাকে আমন্ত্রণ
জানানো হয়নি। এ কারণে মনোনয়ন পরিবর্তনের গুঞ্জন আরও জোরালো হয়েছে। পরিস্থিতি এমন হলে
এই আসনেও দলীয় প্রার্থীর বিপক্ষে বিদ্রোহী প্রার্থী দাঁড়ানোর আশঙ্কা করছেন সংশ্লিষ্টরা।
এ বিষয়ে বরিশাল বিভাগের
দায়িত্বপ্রাপ্ত বিএনপির কেন্দ্রীয় সহ-সাংগঠনিক সম্পাদক আকন কুদ্দুসুর রহমান বলেন, ‘প্রতীক বরাদ্দের পর দলে আর কোনো বিভেদ-বিভাজন থাকবে না বলে আমি মনে করি।
বঞ্চিত হওয়ার ক্ষোভে কেউ কেউ এখনও মাঠে থাকতে পারেন। কিন্তু যখন প্রশ্ন হবে ধানের শীষ,
তখন কেউ দল থেকে দূরে থাকতে পারবে না। এরপরও কেউ দলীয় সিদ্ধান্ত অমান্য করলে তার বিরুদ্ধে
সাংগঠনিক ব্যবস্থা নেওয়া হবে।’
সব মিলিয়ে ঝালকাঠির দুই
আসনে মনোনয়ন নিয়ে চলমান অনিশ্চয়তা ও বিদ্রোহের শঙ্কা বিএনপির জন্য বাড়তি চ্যালেঞ্জ
তৈরি করেছে বলে মনে করছেন রাজনৈতিক নেতারা। ২০০১ সালে এ আসনে বিএনপি জয়ী হলেও ২০০৮
থেকে ২০২৪ সাল পর্যন্ত আওয়ামী লীগ ধারাবাহিকভাবে বিজয়ী হয়।