গৃহবধূ থেকে আপসহীন নেত্রী: খালোদা জিয়ার ৪২ বছরের রাজনৈতিক যাত্রা
রাজনীতিতে অনাগ্রহী এক
গৃহবধূ থেকে প্রায় ৪২ বছরের রাজনৈতিক ক্যারিয়ার তৈরি করেছেন বিএনপি চেয়ারপারসন খালেদা
জিয়া। ১৯৮১ সালের ৩০ মে এক সামরিক অভ্যুত্থানের মাধ্যমে সাবেক প্রেসিডেন্ট জিয়াউর রহমানকে হত্যার পর বিএনপিতে
নেতৃত্বের সংকট দেখা দেয়। এর মধ্য দিয়েই মূলত শুরু হয় খালেদা জিয়ার রাজনৈতিক ক্যারিয়ার।
জিয়াউর রহমানের মৃত্যুর
পর রাজনৈতিক দল হিসেবে বিএনপি তখন বিপর্যস্ত। দলের হাল কে ধরবেন সেটি নিয়ে নানা আলোচনা
চলতে থাকে। এদিকে দলের নেতারা তখন দ্বিধাগ্রস্ত এবং তাদের মধ্যে কোন্দলও ছিল প্রবল।
দলের একাংশ কাউন্সিলের মাধ্যমে নেতৃত্ব নির্বাচন করতে চাইলেও তৎকালীন সামরিক বাহিনীর ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তাদের মনবাসনা ছিল অন্য রকম। দলীয় কিছুসংখ্যক লোকজন খালেদা জিয়ার কথা ভাবলেও সামরিক কর্মকর্তাদের পছন্দের তালিকায় ছিলেন ভাইস প্রেসিডেন্ট বিচারপতি আব্দুস সাত্তার। নানা টানাপোড়েন ও উত্থান-পতনের পর রাজনীতিতে পদার্পণ করে চার দশক ধরে বিএপির নেতৃত্ব দিয়েছেন খালেদা জিয়া।
তার বর্ণাঢ্য রাজনৈতিক ক্যারিয়ার বিস্তৃত হয়েছে রাজপথ থেকে জাতীয় সংসদে। দলের
দায়িত্ব থেকে দেশের সর্বোচ্চ নেতার দায়িত্ব পালন করেছেন তিনি। রাজপথের আন্দোলন থেকে
শুরু করে গৃহবন্দি, কারাবাস, দুইবার প্রধানমন্ত্রী এবং বেশ কয়েকবার বিরোধী দলীয় নেতার
দায়িত্ব পালন করেছেন বর্ষীয়ান এ রাজনীতিক।
রাজনৈতিক যাত্রা শুরু
১৯৮২ সালের ৩ জানুয়ারি
রাজনীতিতে যোগ দেন খালেদা জিয়া। আনুষ্ঠানিকভাবে বিএনপির প্রাথমিক সদস্য পদ লাভ করেন
তিনি।
একই বছর ৭ নভেম্বর জিয়াউর
রহমানের সমাধিতে যান তাকে শ্রদ্ধা নিবেদন করতে। সেখানে খালেদা জিয়া প্রথম বক্তব্য
রাখেন।
১৯৮২ সালের ২১ জানুয়ারি
বিএনপির চেয়ারম্যান নির্বাচনের তারিখ ঘোষণা করা হয়। সেসময় বিএনপির চেয়ারম্যান প্রার্থী
হয়েছিলেন একইসাথে খালেদা জিয়া এবং তৎকালীন রাষ্ট্রপতি আব্দুস সাত্তার।
বিএনপির ওয়েবসাইটে সেই ঘটনা সম্পর্কে বলা হয়, ‘এর ফলে এক বিব্রতকর অবস্থার সৃষ্টি হয়। বিচারপতি সাত্তার দুবার বেগম খালেদা জিয়ার বাসায় যান। বেগম খালেদা জিয়া তাকে তরুণ নেতৃত্বের মনোভাবে কথা জানান।
এসময় খালেদা জিয়াকে দলের সহসভাপতির পদ এবং দেশের ভাইস প্রেসিডেন্ট হিসেবে দায়িত্ব গ্রহণের অনুরোধ জানান বিচারপতি সাত্তার। কিন্তু বেগম জিয়া ব্যক্তিগত কারণে তা গ্রহণ করেননি। অবশেষে বিচারপতি সাত্তারের সাথে দীর্ঘ আলোচনার পর খালেদা জিয়া চেয়ারম্যান পদ থেকে তার প্রার্থীপদ প্রত্যাহার করার সিদ্ধান্ত নেন।’
এরপর ১৯৮২ সালের ২৪ মার্চ
তৎকালীন সেনাপ্রধান এইচএম এরশাদ এক সামরিক অভ্যুত্থানের মাধ্যমে রাষ্ট্রপতি আব্দুস
সাত্তারকে ক্ষমতাচ্যুত করেন।
সেসময় থেকে আব্দুস সাত্তার
আনুষ্ঠানিকভাবে বিএনপির চেয়ারম্যান থাকলেও দল পরিচালনায় খালেদা জিয়ার প্রভাব বাড়তে
থাকে।
১৯৮৩ সালের মার্চ মাসে
খালেদা জিয়া দলের সিনিয়র ভাইস চেয়ারম্যান হন এবং এপ্রিল মাসের প্রথমে বিএনপির এক
বর্ধিত সভায় তিনি ভাষণ দেন। এরপর ১৯৮৪ সালের ১০ মে খালেদা জিয়া বিএনপির চেয়ারম্যান
নির্বাচিত হন।
এরশাদবিরোধী আন্দোলনে
বলিষ্ঠ খালেদা জিয়া
খালেদা জিয়া রাজনীতিতে
আসার পরপরই জেনারেল এরশাদের সামরিক শাসনের বিরুদ্ধে আন্দোলন শুরু হয়। সেই সময় বাংলাদেশের
রাজনীতি প্রচণ্ড উত্তপ্ত হয়ে উঠে, পরিণত হতে থাকে গণআন্দোলনে। এ আন্দোলনে বলিষ্ঠ ভূমিকা
রাখেন খালেদা জিয়া। এর মাধ্যমে দেশজুড়ে খালেদা জিয়ার ব্যাপক জনপ্রিয়তা তৈরি হয়।
এদিকে গণআন্দোলনের চাপ সামলাতে সরকারের পক্ষ থেকে নানা দমন-পীড়ন শুরু হয়। খালেদা জিয়ার বন্দি জীবনের শুরু হয় ১৯৮৩ সালেই। তখন 'গৃহবন্দি' ছিলেন। সরাসরি জেল না হলেও রাজনৈতিক স্বাধীনতা সীমিত করা হয়েছিল। ১৯৮৪ সালে দ্বিতীয়বার গৃহবন্দি করা হয়।
বিএনপির নেতৃত্বকে দমিয়ে রাখতে
সরকার তৎপর হয়ে উঠে। ১৯৮৭ সালে তৃতীয়বার খালেদা জিয়া গৃহবন্দি হন। গৃহবন্দি থাকলেও
তিনি দলের সঙ্গে নিয়মিত যোগাযোগ রাখতেন এবং গণমাধ্যমেও রাজনৈতিক বার্তা পাঠাতে থাকেন। গণআন্দোলন ত্বরান্বিত হয় এবং ১৯৯০ সালের ৬ ডিসেম্বর পতন হয় সামিরক স্বৈরসাশক হুসেইন
মুহাম্মদ এরশাদের।
দেশের প্রথম নারী প্রধানমন্ত্রী
রাজনীতিতে যাত্রার ১০ বছরের
মধ্যেই প্রধানমন্ত্রী হন খালেদা জিয়া। শুধু তাই নয়, প্রথম নারী প্রধানমন্ত্রী হিসেবে
দেশের ইতিহাসের অংশ হয়ে যান তিনি।
জেনারেল এরশাদের পতনের
পর ১৯৯১ সালে অনুষ্ঠিত নির্বাচনে জয়ী হয়ে সরকার গঠন করে বিএনপি। প্রধানমন্ত্রী হন খালেদা
জিয়া। প্রথম মেয়াদে ১৯৯১-১৯৯৬ সাল এবং দ্বিতীয় মেয়াদে ২০০১-২০০৬ সাল পর্যন্ত দেশ শাসন
করেন। এছাড়া খালেদা জিয়া তার রাজনৈতিক জীবনে যতগুলো নির্বাচনে অংশ নিয়েছেন, তার সবগুলোতেই
জয়লাভ করেছেন।
২০০৬ সালে বিএনপি নেতৃত্বাধীন
জোট সরকারের মেয়াদ উত্তীর্ণ হলে দেশের শাসন ক্ষমতা চলে যায় সেনাবাহিনী সমর্থিত তত্তাবধায়ক
সরকারের হাতে।
২০০৮ সালে জাতীয় সংসদ নির্বাচনের
পর ভরাডুবি হয় বিএনপির। সরকার গঠন করে শেখ হাসিনার নেতৃত্বাধীন আওয়ামী লীগ।
অপরাজেয়
বর্ষীয়ান এ রাজনীতিকের
রয়েছে অনন্য রেকর্ড। চারবার জাতীয় সংসদ নির্বাচনে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করেন বেশ কয়েকটি
জেলার কয়েকটি আসনে। সেসব নির্বাচনে তিনি যে আসনেই প্রতিদ্বন্দ্বিতা করেছেন, সেখানেই
বিজয়ী হয়েছেন।
১৯৯১ থেকে ২০০১ সালের সাধারণ
নির্বাচনে তিনি পাঁচটি করে আসনে প্রার্থী হয়ে জয় পান। ২০০৮ সালের নির্বাচনে বিএনপির
পরাজয় হলেও প্রতিদ্বন্দ্বিতা করা তিনটি আসনেই বিজয়ী হন খালেদা জিয়া।
১৯৯১ সালের নির্বাচনে তিনি
বগুড়া ৭, ঢাকা ৭, ঢাকা ৯, ফেনী ১ ও চট্টগ্রাম ৮ আসনে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করেন।
১৯৯৬ সালের নির্বাচনে তিনি
বগুড়া ৬, বগুড়া ৭, ফেনী ১, লক্ষ্মীপুর ২ এবং চট্টগ্রাম ১ আসনে লড়েন।
২০০১ সালের নির্বাচনে তিনি
বগুড়া ৬, বগুড়া ৭, খুলনা-২, ফেনী ১ এবং লক্ষ্মীপুর ২ প্রতিদ্বন্দ্বিতা করেন।
২০০৮ সালের নির্বাচনে তিনি
বগুড়া ৬, বগুড়া ৭ এবং ফেনী ১ আসনে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করেন। তিনটিতেই জয়ী হন তিনি।
নির্বাচনের ফলাফলে দেখা
যায়, প্রতিদ্বন্দ্বী প্রার্থীদের সঙ্গে তার ভোটের ব্যবধানও ছিল চোখে পড়ার মতো।
গৃহবন্দি ও কারাবাস
২০০৬ সালে বিএনপির শাসনকালের
মেয়াদ শেষ হলে সেনা সমর্থিত তত্ত্বাবধায়ক সরকারের শাসন শুরু হয়। গোপনে গোপনে শুরু হয়
রাজনীতির মাইনাস-টু ফর্মুলা। সে সময় দুর্নীতির মামলায় সাবেক দুই প্রধানমন্ত্রী খালেদা
জিয়া এবং শেখ হাসিনা দুজনকেই গ্রেফতার করা হয়।
২০০৭ সালের ৩ সেপ্টেম্বর তাকে কারাগারে নেওয়া হয়। প্রায় এক বছর আট দিন জেলে
থাকার পর ২০০৮ সালের ১১ সেপ্টেম্বর উচ্চ আদালতের নির্দেশে তিনি কারাগার থেকে মুক্তি
পান। ওই সময় কারাগারে থাকা অবস্থায় ২০০৮ সালের ৩ জুলাই তার বিরুদ্ধে জিয়া অরফানেজ ট্রাস্ট্রের
২ কোটি ১০ লাখ ৭১ হাজার ৬৭১ টাকা আত্মসাতের অভিযোগে রমনা থানায় মামলা দায়ের করেছিল
দুর্নীতি দমন কমিশন (দুদক)।
এরপর ২০০৮ সালের জাতীয়
সংসদ নির্বাচনে জয়লাভ করে আওয়ামী লীগ নেতৃত্বাধীন মহাজোট। আওয়ামী লীগের ১৬ বছরের শাসনামলে
নানা দমন-পীড়নের শিকার হন দুইবারের এই প্রধানমন্ত্রী। কারাবাস থেকে শুরু করে চিকিৎসা
সংকটসহ নানা নিগ্রহের শিকান হন। এমনকি তার ২৮ বছরের আবাসস্থল ক্যান্টনমেন্টে থেকে তাকে
বের করে দেন শেখ হাসিনার সরকার।
আওয়ামী লীগ সরকারের আমলে
২০১৩ সালের ২৯ ডিসেম্বর গুলশানের বাসায় এবং ২০১৫ সালের ৫ জানুয়ারি গুলশানে নিজ কার্যালয়ে
দুই দফায় অবরুদ্ধ করে রাখা হয়েছিল খালেদা জিয়াকে। সেসময় তিন মাস তিন দিন অবরুদ্ধ ছিলেন
তিনি। ওই বছরেই এপ্রিল মাসের প্রথম সপ্তাহে আদালতে হাজিরা দিয়ে বাসায় ফেরেন এ সাবেক
প্রধানমন্ত্রী।
সর্বশেষ জিয়া অরফানেজ ট্রাস্ট
দুর্নীতি মামলায় বিএনপি চেয়ারপারসনের পাঁচ বছরের কারাদণ্ড দেন অদালত। দণ্ড পেয়ে দ্বিতীয়বারের
মতো ২০১৮ সালের ৮ ফেব্রুয়ারি কারাগারে যান বিএনপি চেয়ারপারসন ও সাবেক প্রধানমন্ত্রী
খালেদা জিয়া। এরপর ২০২০ সালে করোনা মহামারির কারণে খালেদা জিয়ার জন্য শর্তসাপেক্ষ মুক্তির
ব্যবস্থা করে সরকার। শর্তের মধ্যে ছিল বিদেশে যেতে পারবেন না এবং ঘর থেকে চিকিৎসা নিতে
হবে। চলতি বছরের ৫ আগস্টে শেখ হাসিনার পতনের পর রাষ্ট্রপতির নির্বাহী আদেশে খালেদা
জিয়াকে মুক্তি দেওয়া হয়।
ক্যান্টনমেন্টের বাড়ি
থেকে উচ্ছেদ
বিএনপি চেয়ারপারসন খালেদা জিয়া তার রাজনৈতিক ক্যারিয়ারে যেমন গৃহবন্দি হয়েছেন এবং কারাবাস করেছেন, তেমনি গৃহ থেকে উচ্ছেদের শিকারও হয়েছেন। ২০১০ সালের ১৩ নভেম্বর তার ২৮ বছরের আবাসস্থল ক্যান্টমেন্টের বাড়ি ছাড়তে বাধ্য হন। তাকে বলপ্রয়োগ করে বাড়ি থেকে বের করে দেওয়া হয়েছে বলে অভিযোগ করেন।
স্বাধীনতার পর ১৯৭২ সাল থেকে অ্যাডজুট্যান্ট জেনারেল হিসেবে জিয়াউর রহমানের
সাথে শহীদ মইনুল সড়কের ৬ নম্বর বাড়িতে ওঠেন খালেদা জিয়া। ১৯৮১ সালের ৩০ মে রাষ্ট্রপতি
জিয়া চট্টগ্রামে এক ব্যর্থ সেনা অভ্যুত্থানে নিহত হলে একই বছরের ১২ জুন তৎকালীন অস্থায়ী
রাষ্ট্রপতি আবদুস সাত্তার সেনানিবাসের ওই বাড়িটি খালেদার নামে বরাদ্দ দেন।
২০০৯ সালের ৮ এপ্রিল প্রধানমন্ত্রী
শেখ হাসিনার সভাপতিত্বে মন্ত্রিসভার বৈঠকে খালেদার নামে মইনুল সড়কের ওই বাড়ির ইজারা
বাতিলের সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়। এরপর সামরিক ভূমি ও সেনানিবাস অধিদপ্তরের মাধ্যমে ওই বাড়ি
খালি করার নোটিশ যায় খালেদার কাছে। ওই বছরের ২০ এপ্রিল এবং ৭ ও ২৪ মে পরপর নোটিশ দেওয়া
হয়। নোটিশের বৈধতা চ্যালেঞ্জ করে খালেদা জিয়া রিট করলেও তা খারিজ করে দেন আদালত। একই
সঙ্গে ২০১০ সালের ১২ নভেম্বর পর্যন্ত সময় দেন বাড়ি খালি করার।
এরপর একই বছরের ১৩ নভেম্বর
খালেদা জিয়া ক্যান্টনমেন্টের বাসা ছেড়ে গুলেশানের বাসভবন ফিরোজায় উঠে আসেন।