নববর্ষের জন্মকথা: ক্যালেন্ডারের পাতায় লুকানো সভ্যতার ইতিহাস
নতুন বছর মানেই চারপাশে উৎসবের সুর। সেজে উঠে বিশ্বের নানান প্রান্ত। কৃত্রিম আলোর ঝলকানিতে ঝলসে উঠে আকাশ। বাস্তবতা থেকে ভার্চুয়াল জগত- সবখানেই বর্ষবরণের আমেজ।
রাত বারোটার কাউন্টডাউন, বাজি ফাটানোর প্রতিযোগিতা! শুভেচ্ছা বার্তায় ভরে উঠে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের পাতা। পুরোনো দিনপঞ্জির জায়গা নেয় নতুন দিনপঞ্জি।
তবে আধুনিক কালের বর্ষবরণের পেছনে লুকিয়ে আছে হাজার বছরের ইতিহাস, ধর্মীয় আচার, রহস্য আর মানুষের গভীর মানসিক ও আধ্যাত্মিক দর্শন।
ইতিহাস বলছে, নতুন বছরের প্রথম দিন কখনো শুধুই একটি দিন ছিল না। এটি ছিল মানুষের জীবন, প্রকৃতি ও বিশ্বাসের সঙ্গে ওতপ্রোতভাবে জড়িয়ে থাকা এক গভীর ‘রিসেট প্রক্রিয়া’।
প্রায় চার হাজার বছর আগে প্রাচীন মেসোপটেমিয়ায়—বর্তমান ইরাক অঞ্চলে—নববর্ষ পালনের সূচনা হয়। সুমেরীয় ও ব্যাবিলনীয় সভ্যতায় প্রথম সংগঠিতভাবে নববর্ষ উদযাপনের প্রমাণ পাওয়া যায়। তখন নববর্ষ শুরু হতো বসন্তকালে, মার্চ মাসে। কারণ এই সময় প্রকৃতি নতুন প্রাণ ফিরে পায়, মাঠে ফসলের প্রস্তুতি শুরু হয়, দিন ও রাত সমান হয়। মানুষের চোখে এটি ছিল ভারসাম্য, নতুন জীবন ও পুনর্জন্মের প্রতীক।
প্রাচীন ব্যাবিলনে নববর্ষ পরিচিত ছিল ‘আকিতু’ উৎসব নামে। এই উৎসব চলত টানা ১১ দিন। তবে আকিতু শুধু আনন্দ বা উৎসবের আয়োজন ছিল না। এটি ছিল গভীর ধর্মীয় ও সামাজিক আচার। এই সময় দেবতা মারদুকের কাছে প্রার্থনা করা হতো, পুরোনো বছরের ভুল ও পাপের জন্য প্রায়শ্চিত্ত করা হতো। এমনকি রাজাকেও সাময়িকভাবে ক্ষমতাহীন করা হতো, যাতে তিনি অহংকার ত্যাগ করে নতুন বছরে ন্যায়পরায়ণ শাসনের অঙ্গীকার করেন। ইতিহাসবিদদের মতে, নববর্ষ তখন ছিল ক্ষমতা ও নৈতিকতার এক কঠিন পরীক্ষার সময়।
আজকের চোখে এসব ঘটনা বিস্ময়কর মনে হলেও, তখন নববর্ষ মানেই ছিল আত্মশুদ্ধি আর সমাজকে নতুন করে গড়ে তোলার চেষ্টা।
দীর্ঘ সময় ধরে নববর্ষ বসন্তেই শুরু হতো। এই ধারায় বড় পরিবর্তন আসে রোমান সাম্রাজ্যে। খ্রিষ্টপূর্ব ৪৬ সালে রোমান সম্রাট জুলিয়াস সিজার ক্যালেন্ডার সংস্কার করেন এবং প্রবর্তন করেন জুলিয়ান ক্যালেন্ডার। প্রশাসনিক ও রাজনৈতিক সুবিধার কথা বিবেচনা করেই জানুয়ারি মাসকে বছরের প্রথম মাস হিসেবে নির্ধারণ করা হয়।
জানুয়ারি মাসের নামের মধ্যেও লুকিয়ে আছে গভীর অর্থ। জানুয়ারির নাম এসেছে রোমান দেবতা জানুসের নাম থেকে। জানুস ছিলেন দুই মুখবিশিষ্ট দেবতা—একটি মুখ অতীতের দিকে, অন্যটি ভবিষ্যতের দিকে তাকানো। তিনি ছিলেন পরিবর্তন, দ্বার ও নতুন সূচনার প্রতীক। তাই জানুয়ারি হয়ে ওঠে পুরোনো বছর থেকে নতুন বছরে প্রবেশের প্রতীকী দরজা।
প্রবর্তিত হলো নতুন জুলিয়ান ক্যালেন্ডার, যেটিতে বছরের শুরু হলো ১ জানুয়ারি। ওই ক্যালেন্ডারে চার বছর পরপর একটি অতিরিক্ত দিনও (লিপইয়ার বা অধিবর্ষ) চালু হয়। তবে এই বাড়তি দিনের কারণে বছরের দৈর্ঘ্য বেড়ে গেল প্রায় ১১ মিনিট করে।
জুলিয়ান ক্যালেন্ডারের ১১ মিনিটের ত্রুটির কারণে অনেক জটিলতা তৈরি হলো। ১৫ শতকের মাঝামাঝিতে একটা বছর সৌর চক্র থেকে পিছিয়ে পড়ল প্রায় ১০ দিন। এই গরমিল সংশোধনের উদ্যোগ নিল ক্যাথলিক গির্জাগুলো। ১৫৮২ সালে পোপ গ্রেগরি ত্রয়োদশ প্রবর্তন করলেন নতুন একটি ক্যালেন্ডার। এটিই গ্রেগরিয়ান ক্যালেন্ডার। ওই ক্যালেন্ডারেও বছর শুরুর দিন বহাল থাকল জানুয়ারির ১ তারিখে। এই ক্যালেন্ডার অনুসারেই আজ বছরের প্রথম দিন, খ্রিষ্টীয় নববর্ষ।
এই ক্যালেন্ডারটি মেনে নেয় ইতালি, ফ্রান্স ও স্পেন। তবে অনেক দেশ মেনে নেয়নি। গ্রেট ব্রিটেন ও তার আমেরিকান উপনিবেশগুলোতে ক্যালেন্ডারটি চালু হলো ১৭৫২ সালের পরে। তার আগে এসব অঞ্চলে নববর্ষ উদ্যাপিত হতো ২৫ মার্চে। ১ জানুয়ারি খ্রিষ্টীয় নববর্ষ হিসেবে ঘটা করে উদ্যাপিত হতে শুরু করল ১৯ শতকের শুরু থেকে।
প্রাচীনকালে নববর্ষ প্রার্থনা, আত্মশুদ্ধি ও প্রকৃতির সঙ্গে সংযোগের উপলক্ষ হলেও বর্তমানে তা পরিণত হয়েছে আনন্দ উৎসবে। আতশবাজি, পার্টি, ভ্রমণ আর বিপুল বাণিজ্যের উৎসব এখন গ্রেগরিয়ান ক্যালেন্ডারের প্রথম দিন। শিল্প বিপ্লব ও পুঁজিবাদী অর্থনীতির প্রভাবে নববর্ষ ধীরে ধীরে একটি বৈশ্বিক বাণিজ্যিক রূপ নিয়েছে। বিশ্বের নানা দেশে উদযাপন করা হচ্ছে এই নববর্ষ।
তবুও নববর্ষের গভীর অর্থ একেবারে হারিয়ে যায়নি। আজও মানুষ নতুন বছরে দাঁড়িয়ে একটু থামে। নিজেকে প্রশ্ন করে—আমি কোথায় ছিলাম, কোথায় যেতে চাই। পুরোনো ভুল শুধরে নেওয়ার কথা ভাবে, নতুন করে শুরু করার সাহস খোঁজে।
নববর্ষ তাই কেবল একটি দিনের নাম নয়। এটি মানুষের সভ্যতার স্মৃতিতে জমে থাকা হাজার বছরের বিশ্বাস, আচার ও আশা-আকাঙ্ক্ষার প্রতিফলন। এটি এক ধরনের মানসিক ও আধ্যাত্মিক বিরতি—যেখানে মানুষ পেছনে তাকিয়ে সামনে এগোনোর সিদ্ধান্ত নেয়।
তথ্যসূত্র: উইকিপিডিয়া