শীতাতপ নিয়ন্ত্রিত প্রিজনভ্যানে ট্রাইব্যুনালে এলেন ১৫ সেনা কর্মকর্তা
ভোরের আলো তখনও ফুটেনি। চিরচেনা যানজটের শহরেও নেই তেমন মানুষের চলাচল। তবে আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল এলাকা তখন থেকেই কড়া নিরাপত্তার চাদরে মোড়ানো। ভোর থেকে বাড়তি সতর্কতায় মোতায়েন রয়েছে পুলিশ–র্যাব, বিজিবি ও সেনাবাহিনী। পথে পথে চেকপোস্ট আর তল্লাশি। এমন নিরাপত্তাব্যবস্থার মধ্যেই সকাল সোয়া ৭টার দিকে ‘Bangladesh Jail—Prison Van’ লেখা সবুজ রঙের শীতাতপ নিয়ন্ত্রিত গাড়িটি ট্রাইব্যুনাল চত্বরে প্রবেশ করে। এ ভ্যানে করেই হাজির করা হয় হেফাজতে থাকা ১৫ সেনা কর্মকর্তাকে।
টিএফআই–জেআইসি সেলে গুম-খুনসহ মানবতাবিরোধী অপরাধের তিনটি পৃথক মামলার আসামি মোট ৩২ জন। তাদের মধ্যে বর্তমানে হেফাজতে থাকা ১৫ সেনা কর্মকর্তাকে আজ বুধবার ট্রাইব্যুনালে হাজিরের দিন ধার্য ছিল। সে মোতাবেক আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী প্রিজনভ্যান থেকে নামিয়ে একে একে সবাইকে সকাল সাড়ে ৭টার দিকে ট্রাইব্যুনালের হাজতখানায় নিয়ে যায়। পরে সকাল ৮টা ১০ মিনিটে তাদের এজলাসকক্ষে তোলা হয়। কিছুক্ষণের মধ্যেই এসব মামলায় দাখিল হওয়া আনুষ্ঠানিক অভিযোগ গঠনের ওপর শুনানি শুরু হওয়ার কথা রয়েছে আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল-১ এর চেয়ারম্যান বিচারপতি মো. গোলাম মর্তূজা মজুমদারের নেতৃত্বাধীন বিচারিক প্যানেলে।
ট্রাইব্যুনালে হাজির হওয়া সেনা কর্মকর্তারা হলেন— র্যাবের সাবেক অতিরিক্ত মহাপরিচালক ব্রিগেডিয়ার জেনারেল মো. জাহাঙ্গীর আলম, ব্রিগেডিয়ার জেনারেল তোফায়েল মোস্তফা সারোয়ার, ব্রিগেডিয়ার জেনারেল মো. কামরুল হাসান, ব্রিগেডিয়ার জেনারেল মো. মাহাবুব আলম, ব্রিগেডিয়ার জেনারেল কেএম আজাদ, কর্নেল আবদুল্লাহ আল মোমেন, কর্নেল আনোয়ার লতিফ খান (অবসরকালীন ছুটিতে), র্যাব গোয়েন্দা শাখার সাবেক পরিচালক লে. কর্নেল মো. মশিউর রহমান, লে. কর্নেল সাইফুল ইসলাম সুমন, লে. কর্নেল মো. সারওয়ার বিন কাশেম, লে. কর্নেল মোহাম্মদ রেদোয়ানুল ইসলাম, বিজিবির সাবেক কর্মকর্তা মেজর মো. রাফাত বিন আলম, ডিজিএফআইয়ের সাবেক পরিচালক মেজর জেনারেল শেখ মো. সরওয়ার হোসেন, ব্রিগেডিয়ার জেনারেল মো. মাহবুবুর রহমান সিদ্দিকী ও ব্রিগেডিয়ার জেনারেল আহমেদ তানভির মাজাহার সিদ্দিকী।
এদের হাজিরকে কেন্দ্র করে ট্রাইব্যুনাল ও হাইকোর্টের আশপাশসহ রাজধানীর কাকরাইল, মৎস্য ভবন, পল্টন এলাকায় আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর বিপুল উপস্থিতি লক্ষ্য করা যায়। ভোর থেকেই নিরাপত্তা জোরদার করা হয় মাজারগেট এলাকা পর্যন্ত।
গতকাল মঙ্গলবার ট্রাইব্যুনাল প্রাঙ্গণে প্রেস ব্রিফিংয়ে প্রসিকিউটর গাজী এমএইচ তামিম জানিয়েছিলেন, নির্ধারিত তারিখে যদি তারা হাজির না হন তাহলে পলাতক দেখিয়ে জাতীয় দুটি দৈনিকে বিজ্ঞপ্তি প্রকাশ করা হবে। আর হাজির হলে ট্রাইব্যুনালের আদেশ অনুযায়ী তাদের কোন কারাগারে রাখা হবে তা নির্ধারণ করবে স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের অধীন কারা কর্তৃপক্ষ।
টিএফআই সেলে গুম-খুনের অভিযোগে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনাসহ ১৭ জনের বিরুদ্ধে গত ৮ অক্টোবর আনুষ্ঠানিক অভিযোগ দাখিল করে প্রসিকিউশন। ওই মামলায় টাস্কফোর্সের মাধ্যমে বিরোধী রাজনৈতিক মতের লোকজনকে তুলে নিয়ে নির্যাতন ও হত্যার অভিযোগ রয়েছে। একই দিনে জেআইসি বা আয়নাঘরে ‘গুমের’ ঘটনায় আরও একটি মামলায় হাসিনা-তারিকসহ ১৩ জনের বিরুদ্ধে অভিযোগ দাখিল করা হয়। পাশাপাশি জুলাই-আগস্টের আন্দোলনে রামপুরায় ২৮ জনকে হত্যার অভিযোগে মানবতাবিরোধী অপরাধ মামলায় চারজনের বিরুদ্ধে অভিযোগ গঠন করা হয়।
সব মিলিয়ে তিন মামলায় অভিযুক্ত সেনা কর্মকর্তার সংখ্যা ২৫ জন। গত ৯ অক্টোবর সেনাসদর জানায়, ১৫ সেনা কর্মকর্তাকে হেফাজতে নেওয়া হয়েছে।
অভিযোগ আমলে নেওয়ার শুনানিতে প্রসিকিউশনের পক্ষে উপস্থিত ছিলেন চিফ প্রসিকিউটর মোহাম্মদ তাজুল ইসলাম। শুনানি শেষে ট্রাইব্যুনাল গ্রেপ্তারি পরোয়ানা জারি করে আজকের মধ্যে আদালতে হাজিরের নির্দেশ দিয়েছিল, যার অংশ হিসেবে আজ সকালে তাদের ট্রাইব্যুনালে তোলা হলো।