ত্বকের ঘরোয়া যত্ন
হেমন্ত মানেই প্রকৃতির রূপ বদল। সেই সঙ্গে বদলে যায় আমাদের ত্বকের চাহিদাও। গরমের ঘামঝরা দিনশেষে যখন বাতাস হয় হালকা ঠান্ডা, সূর্যের আলো হয় নরম, তখনই শুরু হয় ঋতু পরিবর্তনের জাদু।
এই ঋতুতে গাছের পাতা ঝরে। হালকা কুয়াশা নামে। এ সময় ত্বকে দেখা দেয় টানটান ভাব, শুষ্কতা, খসখসে অবস্থা ও ঔজ্জ্বল্য হারানোর প্রবণতা। প্রকৃতির এই রূপান্তর যেন শরীর ও ত্বকের মধ্যেও ছুঁয়ে যায়। সে জন্যে এখন থেকেই দরকার একটু বাড়তি যত্ন, সামান্য সচেতনতা আর নিয়মিত ত্বকচর্চা। এ পরিচর্যা আপনার ত্বককে পুরো শীতজুড়ে রাখতে পারে কোমল, উজ্জ্বল ও প্রাণবন্ত।
ক্লিনজিং: হেমন্তে ত্বক পরিষ্কারের রুটিনে সামান্য পরিবর্তন আনা জরুরি। গরমের দিনে জেল বা ফোমভিত্তিক ক্লিনজার ব্যবহার করা ঠিক থাকলেও, এ সময় এসব পণ্য ত্বকের প্রাকৃতিক তেল ছেঁকে নেয়। ফলে ত্বক হয়ে ওঠে রুক্ষ ও টানটান। এখন দরকার মাইল্ড, ক্রিমবেসড বা ময়শ্চারাইজিং ক্লিনজার, যা ত্বক পরিষ্কার করার পাশাপাশি আর্দ্রতাও ধরে রাখবে। রাতে ঘুমানোর আগে ক্লিনজিংয়ের পর হালকা টোনার ব্যবহার করা ভালো। এটি ত্বকের পিএইচ ব্যালান্স ঠিক রাখে এবং পরবর্তী যত্নের জন্য ত্বককে প্রস্তুত করে। যাদের ত্বক অতিরিক্ত শুষ্ক, তারা ক্লিনজারের বদলে ক্লিনজিং মিল্ক বা মাইসেলার ওয়াটার ব্যবহার করতে পারেন। এতে ত্বক পরিষ্কার হবে, আবার টানটান ভাবও কমবে ।
ময়েশ্চারাইজিং: হেমন্তে ত্বকের যত্নের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ ধাপ হলো ময়েশ্চারাইজিং। এ সময় এমন ময়েশ্চারাইজার ব্যবহার করা উচিত, যাতে থাকে হায়ালুরোনিক এসিড, গ্লিসারিন, শিয়া বাটার বা সেরামাইড, যা ত্বকের গভীরে আর্দ্রতা ধরে রাখে এবং ত্বকের প্রতিরক্ষাব্যবস্থা শক্ত করে। সকালে হালকা ক্রিম এবং রাতে ঘন নাইট ক্রিম ব্যবহার করা সবচেয়ে কার্যকর। রাতে যখন আমরা ঘুমাই, তখনই ত্বক নিজের পুনর্গঠন প্রক্রিয়ায় ব্যস্ত থাকে। সেই কারণে ঘুমানোর আগে একটি ভালো নাইট ক্রিম বা ফেস অয়েল লাগালে পরদিন ত্বক দেখাবে আরও নরম ও দীপ্তিময়। ঠোঁট, হাত ও পায়ের যত্নও এড়িয়ে যাওয়া উচিত নয়। একটি ভালো লিপবাম, হ্যান্ডক্রিম ও ফুটক্রিম রাখলে সহজেই ত্বকের শুষ্কতা দূর হবে।
সানস্ক্রিন: অনেকে মনে করেন, শীতে বা হেমন্তে সূর্যের তাপ কম থাকায় সানস্ক্রিনের প্রয়োজন নেই। এটি ভুল ধারণা। সূর্যের অতিবেগুনি রশ্মি সব ঋতুতেই সমানভাবে ত্বকের ক্ষতি করে। প্রতিদিন বাইরে বেরোনোর আগে অন্তত এসপিএফ ৩০ যুক্ত সানস্ক্রিন ব্যবহার করুন। শুধু মুখে নয়, গলা, ঘাড়, হাত ও পায়ের উন্মুক্ত অংশেও লাগাতে ভুলবেন না। এ ছাড়া সপ্তাহে এক থেকে দুই দিন হালকা এক্সফোলিয়েশন করলে ত্বকের মৃত কোষ দূর হয়ে ত্বক হবে মসৃণ ও উজ্জ্বল। অতিরিক্ত স্ক্রাব করলে ত্বকের প্রাকৃতিক ব্যারিয়ার ক্ষতিগ্রস্ত হয়। এ বিষয়ে সতর্ক থাকুন।
খাদ্যাভ্যাস: ত্বকের যত্ন শুধু বাইরে থেকে নয়, ভেতর থেকেও দিতে হবে পুষ্টি। ঠান্ডা আবহাওয়ায় তৃষ্ণা কম লাগলেও শরীরের পানির প্রয়োজন তখনও থাকে। দিনে অন্তত আট গ্লাস পানি পান করুন। পাশাপাশি খাদ্যতালিকায় রাখুন ভিটামিন-ই, সি ও ওমেগা-৩ ফ্যাটি এসিডসমৃদ্ধ খাবার। যেমন সামুদ্রিক মাছ, বাদাম, বীজ, জলপাই তেল ও রঙিন ফলমূল। এগুলো ত্বককে ভেতর থেকে মজবুত করে, আর্দ্রতা ধরে রাখে এবং অ্যান্টি-অক্সিডেন্ট হিসেবে কাজ করে। চা বা কফির পরিমাণ কমিয়ে হার্বাল টি বা গরম পানিতে মধু-লেবু মিশিয়ে খেতে পারেন। এটি শরীরের টক্সিন দূর করে ত্বকে আনবে স্বাভাবিক উজ্জ্বলতা।
ঘরোয়া যত্ন: বাজারের রাসায়নিক পণ্য ছাড়াও কিছু ঘরোয়া উপাদান ত্বককে প্রাকৃতিকভাবে নরম রাখতে সাহায্য করে। এক চামচ মধু ও অ্যালোভেরা জেল মিশিয়ে মুখে লাগান। ১৫ মিনিট পর ধুয়ে ফেলুন। নারকেল তেল বা অলিভ অয়েল রাতে ঘুমানোর আগে লাগালে ত্বক থাকবে কোমল ও হাইড্রেটেড। তবে নতুন কোনো উপাদান ব্যবহার করার আগে অবশ্যই প্যাচ টেস্ট করে নিন, বিশেষ করে যাদের ত্বক সংবেদনশীল ।
হাত ও পায়ের যত্ন: হেমন্তের শীতল হাওয়ায় ত্বক অনেক সময় শুষ্ক, রুক্ষ হয়ে ফেটে যায়। বিশেষ করে হাত-পা সারাদিন খোলা থাকে, ধুলো-ময়লার সংস্পর্শে আসে আর নিয়মিত ধোয়ার ফলে সুরক্ষা হারায়। হেমন্তে আর্দ্রতা কমে যাওয়ায় ত্বক থেকে প্রাকৃতিক তেলও কমে যায়। ফলে হাত ও পায়ের ত্বক হয়ে ওঠে কোঁচকানো, চামড়ায় ফাটল দেখা দিতে পারে এবং কখনও কখনও চুলকানি বা জ্বালা অনুভূত হয়। এ সময় প্রতিদিন সকালে এবং রাতে হাত-পা ভালোভাবে ধোয়া এবং ধোয়ার পর ময়েশ্চারাইজার, নারকেল তেল, অলিভ অয়েল বা গ্লিসারিনযুক্ত লোশন ব্যবহার করা উচিত। সেই সঙ্গে হালকা ম্যাসাজ করলে রক্তসঞ্চালন বাড়বে এবং ত্বক পুষ্ট হবে। সপ্তাহে অন্তত একবার স্ক্রাব করে মৃত ত্বকের কোষ দূর করতে হবে। ফলে ত্বক থাকবে নরম, কোমল ও উজ্জ্বল। এ ক্ষেত্রে ঘরোয়া উপায়ও কার্যকর। যেমন–মধু, দুধ, অল্প লেবুর রস দিয়ে প্যাক তৈরি করে ব্যবহার করলে হাত-পায়ের ত্বক থাকবে হাইড্রেটেড এবং উজ্জ্বল। পায়ের জন্য বিশেষ যত্ন প্রয়োজন। পায়ের গোড়ালি ও তলার শুষ্কতা রোধ করতে নিয়মিত ফুটক্রিম ব্যবহার করা জরুরি। দীর্ঘ সময় জুতা-স্যান্ডাল পরে থাকলে পায়ের স্বাচ্ছন্দ্যও কমে যায়। পাতলা মোজা ব্যবহার করা ভালো। এ ছাড়া বাইরে গেলে সূর্যের ক্ষতিকর রশ্মি থেকে হাত-পা রক্ষা করতে সানস্ক্রিন ব্যবহার করতে হবে।
হেমন্তে অতিরিক্ত গরম পানি দিয়ে গোসল করা উচিত নয়। কারণ এতে ত্বকের প্রাকৃতিক তেল ধুয়ে যায়। বরং কুসুম গরম পানি ব্যবহার করুন এবং গোসল শেষে তৎক্ষণাৎ ময়েশ্চারাইজার লাগান। ঘরে আর্দ্রতা বজায় রাখতে চাইলে হিউমিডিফায়ার ব্যবহার করতে পারেন, যা বাতাসে আর্দ্রতা ধরে রাখে এবং ত্বকের শুষ্কতা কমায়।
ঋতু বদলের এই সময়ে অবহেলা না করে নিজের ত্বকের সঙ্গে বন্ধুত্ব গড়ে তুলুন। প্রতিদিনের যত্নে সামান্য পরিবর্তনই এনে দিতে পারে বড় রকমের পার্থক্য। তাই হেমন্তের শুরুতে নিজেকে সময় দিন আর ত্বককে দিন যথাযথ যত্ন। অনেকেই মনে করেন, দামি স্কিনকেয়ার ব্যবহারই সব সমস্যার সমাধান। এ ধারণা সঠিক নয়। এ প্রসঙ্গে রূপবিশেষজ্ঞ শোভন সাহা বলেন, ‘অনেকেই দামি ক্রিমে ভরসা রাখেন। নিয়মিত যত্ন ছাড়া কোনো পণ্যই ভালো ফলাফল দিতে পারে না। স্কিনকেয়ারে ধারাবাহিকতাই আসল বিষয়, তাই শীত আসার আগে নিয়মিত স্কিনকেয়ার খুবই গুরুত্বপূর্ণ।’