কর্কশিট কারিগরদের ব্যস্ত মৌসুম
শীত এলেই রংপুর অঞ্চলের কর্কশিট কারিগরদের কাজে নতুন ব্যস্ততা দেখা দেয়। শীতকালেই বিয়ে, ধর্মীয় আচার–অনুষ্ঠান ও হিন্দু সম্প্রদায়ের নানা উৎসব বাড়ে। এসব উপলক্ষে কর্কের তৈরি নানা সামগ্রীর চাহিদা কয়েকগুণ বেড়ে যায়, যা এই প্রাচীন গ্রামীণ কারুশিল্পে জোগায় নতুন প্রাণ।
কর্কশিট কারিগররা বলেন, আয় কম, কাঁচামালের দাম বাড়লেও এই কারুশিল্পের প্রতি তাদের অনুরাগ কমেনি। উত্তরবঙ্গের ঐতিহ্য তুলে ধরে এই কাজ প্রজন্ম থেকে প্রজন্মে বয়ে চলছে।
রংপুর অঞ্চলের পাঁচ জেলা লালমনিরহাট, কুড়িগ্রাম, রয়পুর, নীলফামারী ও গাইবান্ধায় বর্তমানে ৮০ থেকে ৯০ জন কর্কশিট কারিগর ও ৪০০ থেকে ৫০০ সহকারী নানা ধরনের পণ্য তৈরি করে জীবিকা নির্বাহ করেন।
বিয়ের মুকুট, অন্নপ্রাশনের মুকুট, বিষহরীসহ দেবদেবীর ক্ষুদ্র প্রতিমা, খেলনা ও বিভিন্ন ধরনের সাজসজ্জার সামগ্রী তৈরি করে থাকেন তারা। এছাড়া বিয়ে ও অন্যান্য সামাজিক–ধর্মীয় অনুষ্ঠানে মঞ্চসজ্জার কাজেও কর্কশিট কারিগরদের চাহিদা বেশি।
লালমনিরহাট সদর উপজেলার সাধুটারী গ্রামের ৫০ বছর বয়সী কারিগর রামানুজ বর্মণ ছোটবেলা থেকেই কর্কশিট দিয়ে অলংকার তৈরির কাজ করছেন। তিনি বলেন, আমরা সারা বছরই কাজ করি, কিন্তু শীতকালেই ব্যস্ততা বেশি থাকে। পাইকাররা আগাম অর্ডার দিয়ে রাখে—বিশেষ করে বিয়ে ও অন্নপ্রাশনের মুকুটের জন্য। প্রতিটি মুকুট ৪০০ থেকে ৬০০ টাকায় বিক্রি করি এবং প্রতি পিসে ২৫০ থেকে ৩৫০ টাকা লাভ থাকে। প্রতি বছর ৭–৮ লাখ টাকার কর্কশিট সামগ্রী বিক্রি করি।
রামানুজ জানান, তার বাবা ভূপেন্দ্রনাথ সাধু ছিলেন বিখ্যাত কারিগর। তিনিই ছোটবেলায় তাকে এই কাজ শেখান। এখন পরিবারের সদস্য ও কয়েকজন সহকারী নিয়ে নিজ উঠোনের কর্মশালায় কাজ করেন। ব্যস্ত মৌসুমে উঠোনজুড়ে কাটাকাটি, রঙ করা, সাজানো–গোছানোর কাজ চলে সারাদিন।
লালমনিরহাটের সাধুটারী গ্রামের আরেক কারিগর বাসনা রানী বলেন, ঐতিহ্যের টানে টিকে আছে কর্কশিটের মুকুট। হিন্দু সম্প্রদায়ের বিয়ে ও অন্নপ্রাশনে কর্কশিটের মুকুট বাধ্যতামূলক। তাই এর চাহিদা কখনোই শেষ হবে না।
তিনি জানান, কর্কশিট পাওয়া গেলে একেকজন কারিগর দিনে পাঁচ-ছয়টি পণ্য তৈরি করতে পারে। আমাদের পুরো জীবনধারণই কর্কশিটের ওপর নির্ভরশীল।
লালমনিরহাট শহরের হিন্দু সম্প্রদায়ের নেতা হীরালাল রায় বলেন, কর্কশিট সামগ্রী খুব বেশি দামি নয়, কিন্তু দেখতে অনেক সুন্দর। আমাদের প্রজন্ম ধরে এ ধরনের মুকুট ও প্রতিমা ব্যবহার করে আসছে। এখনো বিয়ের মঞ্চ সাজাতে কর্কশিট কারিগরদের দিয়ে সাজসজ্জার কাজ করানো হয়। এই ঐতিহ্য রক্ষা করা উচিত।