ময়মনসিংহ মেইল

ঝিনাইগাতী গারো পাহাড়ে পাথর-বালু লুট, বিপন্ন প্রকৃতি

বৃহত্তর ময়মনসিংহ · 2026-11-03 14:53:10 · স্টাফ রিপোর্টার

সবুজে ঘেরা পাহাড়, আঁকাবাঁকা নদী, স্বচ্ছ জলধারা আর ছোট-বড় ঝরনার অপূর্ব প্রাকৃতিক সৌন্দর্যে সমৃদ্ধ শেরপুরের ঝিনাইগাতী উপজেলার সীমান্তবর্তী গারো পাহাড়। প্রকৃতির অপরূপ সৌন্দর্য উপভোগ করতে প্রতিবছর দেশের বিভিন্ন স্থান থেকে ছুটে আসেন অসংখ্য পর্যটক। কিন্তু সেই সৌন্দর্যের বুক চিরেই চলছে পাহাড়, নদী ও ঝরনা কেটে অবৈধভাবে পাথর-বালু উত্তোলনের অভিযোগ। এতে একদিকে ধ্বংস হচ্ছে প্রাকৃতিক পরিবেশ, অন্যদিকে হুমকির মুখে পড়েছে পাহাড়ের জীববৈচিত্র্য ও পর্যটনের অপার সম্ভাবনা।

স্থানীয়দের অভিযোগ, দীর্ঘদিন ধরে একটি সংঘবদ্ধ চক্র প্রকাশ্যে পাহাড় কেটে এবং নদী-ঝরনা থেকে অবৈধভাবে পাথর-বালু উত্তোলন করে আসছে। প্রতিদিন লাখ লাখ টাকার প্রাকৃতিক সম্পদ লুট করা হচ্ছে। উত্তোলিত পাথর-বালু দিনের বেলায় বিভিন্ন স্থানে স্তূপ করে রাখা হয়। পরে রাতের আঁধারে ঘোড়ার গাড়ি, ভ্যান, ট্রলি, মাহিন্দ্র ও ট্রাকযোগে বিভিন্ন এলাকায় নিয়ে বিক্রি করা হচ্ছে।

প্রাকৃতিক সৌন্দর্যের জন্য পরিচিত গারো পাহাড়ের অন্যতম আকর্ষণ গজনী অবকাশ বিনোদন কেন্দ্র। পাহাড়ের সবুজ বনভূমি, টিলা, ঝরনা ও নদীর সৌন্দর্যকে ঘিরে ১৯৯৩ সালে এখানে গড়ে তোলা হয় এ পর্যটনকেন্দ্র। একসময় গজনীকে কেন্দ্র করে শেরপুরের পর্যটনশিল্পের ব্যাপক সম্ভাবনা তৈরি হয়। দেশের বিভিন্ন প্রান্ত থেকে পর্যটকেরা এখানে এসে প্রকৃতির সান্নিধ্যে সময় কাটান। এ পর্যটনকেন্দ্র থেকে সরকার প্রতিবছর বিপুল পরিমাণ রাজস্বও পেয়ে থাকে। অথচ অপরিকল্পিতভাবে পাহাড় কাটা এবং অবৈধভাবে পাথর-বালু উত্তোলনের কারণে হারিয়ে যেতে বসেছে এ অঞ্চলের প্রাকৃতিক সৌন্দর্য।

স্থানীয় সূত্রে জানা গেছে, উপজেলার কাংশা ইউনিয়নের সীমান্তবর্তী কালঘোষা নদীর গান্ধিগাঁও, দরবেশতলা, হালচাটি, মালিটিলা, বাকাকুড়া, গজনী ও ছোট গজনীসহ বিভিন্ন এলাকায় এবং সংরক্ষিত বনাঞ্চলে পাথর ও বালু উত্তোলন করা হচ্ছে। শতাধিক শ্রমিক বেলচা, কোদালসহ বিভিন্ন সরঞ্জাম ব্যবহার করে পাহাড় কেটে এবং নদী-ঝরনা থেকে পাথর-বালু সংগ্রহ করছেন বলে অভিযোগ রয়েছে।

উত্তোলিত পাথর-বালু প্রথমে টুকরি ও মাথায় করে বনাঞ্চলের বিভিন্ন স্থানে নিয়ে স্তূপ করে রাখা হয়। পরে রাত ১২টার পর ঘোড়ার গাড়ি, ভ্যান, ট্রলি, মাহিন্দ্র ও ট্রাকযোগে উপজেলা ও জেলা সদরসহ বিভিন্ন এলাকায় পরিবহন করে বিক্রি করা হচ্ছে। স্থানীয়দের দাবি, প্রতিদিন রাত ১২টা থেকে সকাল ৮টা পর্যন্ত চলে অবৈধভাবে উত্তোলিত পাথর-বালু পরিবহনের এ কার্যক্রম।

পরিবেশসচেতন ব্যক্তিদের মতে, এভাবে পাহাড় কাটা এবং নদী-ঝরনা থেকে পাথর-বালু উত্তোলন অব্যাহত থাকলে পাহাড়ের স্বাভাবিক ভূমিরূপ বদলে যাবে। নষ্ট হবে ঝরনা ও নদীর স্বাভাবিক প্রবাহ। ধ্বংস হবে বন্য প্রাণীর আবাসস্থল। একই সঙ্গে পর্যটকদের আকর্ষণ হারাবে গারো পাহাড়। দীর্ঘমেয়াদে এর নেতিবাচক প্রভাব পড়তে পারে স্থানীয় মানুষের জীবন-জীবিকা ও পরিবেশের ভারসাম্যের ওপর।

অভিযোগ রয়েছে, প্রশাসনের পক্ষ থেকে বিভিন্ন সময়ে ভ্রাম্যমাণ আদালত পরিচালনা করে বালুবাহী যানবাহন আটক, জরিমানা ও কারাদণ্ড দেওয়া হলেও পাথর-বালু উত্তোলন বন্ধ হয়নি। গত ৩ জুন রাতে বালুভর্তি চারটি মাহিন্দ্র গাড়ি আটকের ঘটনাকে কেন্দ্র করে উত্তোলনকারীদের হামলায় ঝিনাইগাতী উপজেলার গজনী ফরেস্ট বিট কর্মকর্তা মো. সালেহীন নেওয়াজ ও জিয়াউর রহমান নামে এক বনপ্রহরী আহত হন বলে অভিযোগ রয়েছে। ওই ঘটনার পর থেকে বন বিভাগের তৎপরতা কমে গেছে বলে স্থানীয়দের অভিযোগ। এ ছাড়া উপজেলা প্রশাসনও অজ্ঞাত কারণে নীরব ভূমিকা পালন করছে বলে অভিযোগ উঠেছে সচেতন মহলের পক্ষ থেকে।

রাংটিয়া ফরেস্ট রেঞ্জ কর্মকর্তা মো. হাবিবউল্লাহর সঙ্গে যোগাযোগ করা হলে তিনি এ বিষয়ে কথা বলতে রাজি হননি। ঝিনাইগাতী উপজেলার গজনী ফরেস্ট বিট কর্মকর্তা মো. সালেহীন নেওয়াজ বলেন, নদীর বালু জেলা প্রশাসনের আওতাধীন। তাই বালু উত্তোলন বন্ধে জেলা প্রশাসনের ভূমিকা প্রয়োজন।

এ বিষয়ে শেরপুরের জেলা প্রশাসক ফরিদা ইয়াসমিনের সঙ্গে কথা হলে তিনি বিষয়টি দেখার জন্য উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তাকে (ইউএনও) প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়ার নির্দেশ দিয়েছেন বলে জানান। স্থানীয় সচেতন মহলের দাবি, গারো পাহাড় শুধু পাথর-বালুর উৎস নয়; এটি শেরপুরের প্রাকৃতিক সৌন্দর্য, জীববৈচিত্র্য ও পর্যটনশিল্পের গুরুত্বপূর্ণ সম্পদ।

এ সম্পদ ধ্বংস হলে তা আর সহজে ফিরিয়ে আনা সম্ভব হবে না। তাই পাহাড়, নদী ও ঝরনার স্বাভাবিক পরিবেশ রক্ষায় নিয়মিত অভিযান পরিচালনা, অবৈধভাবে পাথর-বালু উত্তোলনকারীদের চিহ্নিত করে আইনের আওতায় আনা এবং সংরক্ষিত বনাঞ্চলে নজরদারি জোরদারের দাবি জানিয়েছেন তাঁরা। তাঁদের প্রত্যাশা, যথাযথ উদ্যোগের মাধ্যমে গারো পাহাড়ের হারিয়ে যেতে বসা প্রাকৃতিক সৌন্দর্য ও পরিবেশ রক্ষা করা হবে।


আরও পড়ুন

সাম্প্রতিক সংবাদ

সর্বাধিক পঠিত