বাকৃবিতে কম্বাইন্ড ডিগ্রির আন্দোলনে নেতৃত্ব দেওয়া শিক্ষার্থীকে ফেল করানোর অভিযোগ
ক্যাম্পাস মেইল · 2026-08-20 08:00:46 · ক্যাম্পাস রিপোর্টার
বাংলাদেশ কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়ে (বাকৃবি) বিএসসি ইন ভেটেরিনারি সায়েন্স অ্যান্ড অ্যানিমাল হাজব্যান্ড্রি বা ‘কম্বাইন্ড ডিগ্রি’ চালুর দাবিতে আন্দোলনে নেতৃত্ব দেওয়া শিক্ষার্থীদের একাংশের একাডেমিক ফলাফলে বিরূপ প্রভাব পড়ার অভিযোগ উঠেছে। বিশেষ করে আন্দোলনে নেতৃত্ব দেওয়া এক শিক্ষার্থীর একই কোর্সের থিওরি ও প্র্যাকটিক্যাল উভয় অংশে অকৃতকার্য হওয়ার পর মূল্যায়ন প্রক্রিয়া নিয়ে নতুন করে প্রশ্ন তুলেছেন শিক্ষার্থীরা।অভিযোগের সূত্রপাত পশুপালন অনুষদের চতুর্থ বর্ষের শিক্ষার্থী এএনএম এহসানুল হক হিমেলের সাম্প্রতিক ফলাফলকে ঘিরে। গত ১৮ আগস্ট প্রকাশিত লেভেল-৩, সেমিস্টার-২-এর ফলাফলে অ্যানিমেল সায়েন্স বিভাগের ‘মিট সায়েন্স অ্যান্ড টেকনোলজি’ কোর্সের থিওরি ও প্র্যাকটিক্যাল—দুই অংশেই তিনি অকৃতকার্য হয়েছেন।হিমেল ২০২৫ সালে কম্বাইন্ড ডিগ্রি চালুর দাবিতে শিক্ষার্থীদের আন্দোলনে নেতৃত্বস্থানীয় ভূমিকা পালন করেছিলেন। তাঁর দাবি, আন্দোলনের আগে তাঁর একাডেমিক ফলাফল সন্তোষজনক ছিল। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে নিজের আগের সেমিস্টারের ফলাফল ও নম্বরপত্র প্রকাশ করে তিনি জানান, লেভেল-২, সেমিস্টার-২ শেষে তাঁর গড় সিজিপিএ ছিল ৩.৬৭১ এবং তখন পর্যন্ত কোনো কোর্সে তাঁর ক্যারি ছিল না।হিমেলের ভাষ্য, আন্দোলনের পর লেভেল-৩, সেমিস্টার-১-এ তাঁর সিজিপিএ কমে ২.৯৪৬ হয়। পরবর্তী সেমিস্টারে সিজিপিএ ৩.২৭৮ হলেও ‘মিট সায়েন্স অ্যান্ড টেকনোলজি’ কোর্সের থিওরি ও প্র্যাকটিক্যাল উভয় অংশে এফ গ্রেড এসেছে। তাঁর দাবি, ওই কোর্সের ক্লাস টেস্ট, উপস্থিতি ও নোটবুকে তাঁর পারফরম্যান্স সন্তোষজনক ছিল। এ কারণে ফলাফল নিয়ে তাঁর মধ্যে প্রশ্ন তৈরি হয়েছে।এদিকে হিমেলের ফলাফল ও নম্বরপত্র সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়ার পর বিষয়টি নিয়ে শিক্ষার্থীদের মধ্যে আলোচনা শুরু হয়েছে। কয়েকজন শিক্ষার্থী ফলাফল নিরপেক্ষভাবে খতিয়ে দেখার দাবি জানিয়েছেন।তবে অভিযোগ শুধু হিমেলের ফলাফলে সীমাবদ্ধ নয়। ভেটেরিনারি সায়েন্স অনুষদের বিভিন্ন ব্যাচের আরও কয়েকটি কোর্সের ফলাফল নিয়েও শিক্ষার্থীদের মধ্যে অসন্তোষ রয়েছে বলে জানা গেছে। এর মধ্যে দ্বিতীয় বর্ষের প্রথম সেমিস্টারের ‘এলিমেন্টারি ডেইরি সায়েন্স’ এবং তৃতীয় বর্ষের প্রথম সেমিস্টারের ‘অ্যানিমেল ওয়েস্ট ম্যানেজমেন্ট’ কোর্সের ফলাফল নিয়ে প্রশ্ন তুলেছেন সংশ্লিষ্ট শিক্ষার্থীরা।ভেটেরিনারি অনুষদের ডিন কার্যালয়ের তথ্য অনুযায়ী, ওই দুই কোর্সে সর্বোচ্চ গ্রেড এ প্লাস পেয়েছেন মাত্র তিনজন করে শিক্ষার্থী। একই সেমিস্টারের অন্যান্য কোর্সে তুলনামূলক ভালো ফল করলেও এসব কোর্সে প্রত্যাশার চেয়ে কম ফল হওয়ায় শিক্ষার্থীদের মধ্যে অসন্তোষ তৈরি হয়েছে বলে অভিযোগ।লেভেল-১-এর শিক্ষার্থীদেরও পশুপালন অনুষদের সংশ্লিষ্ট কয়েকটি কোর্সের ফলাফল নিয়ে অসন্তোষ রয়েছে বলে জানা গেছে। তাঁদের অভিযোগ, একই সেমিস্টারের অন্যান্য কোর্সে ভালো ফল করলেও এসব কোর্সে তুলনামূলক কম ফল হয়েছে।ফলাফল পুনরালোচনার দাবিতে লেভেল-৩, সেমিস্টার-২ এবং লেভেল-২, সেমিস্টার-২-এর শিক্ষার্থীরা পৃথকভাবে বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য বরাবর আবেদন করেন। ভেটেরিনারি সায়েন্স অনুষদের ডিন অধ্যাপক ড. মো. বাহানুর রহমানের মাধ্যমে গত ২৬ জানুয়ারি আবেদনগুলো জমা দেওয়া হয়। তবে ছয় মাসের বেশি সময় পেরিয়ে গেলেও এখনো কোনো সিদ্ধান্ত জানানো হয়নি বলে অভিযোগ শিক্ষার্থীদের।নাম প্রকাশ না করার শর্তে ভেটেরিনারি সায়েন্স অনুষদের এক শিক্ষার্থী বলেন, কম্বাইন্ড ডিগ্রি চালুর আন্দোলনকে কেন্দ্র করে ভেটেরিনারি ও পশুপালন অনুষদের শিক্ষক-শিক্ষার্থীদের মধ্যে যে বিরোধ তৈরি হয়েছিল, তার প্রভাব এখনো বিভিন্ন ক্ষেত্রে রয়েছে। ওই বিরোধের নেতিবাচক প্রভাব একাডেমিক মূল্যায়নে পড়ছে কি না, তা খতিয়ে দেখা প্রয়োজন বলে মনে করেন তিনি।পশুপালন অনুষদের চতুর্থ বর্ষের শিক্ষার্থী শিবলী সাদী বলেন, কম্বাইন্ড ডিগ্রির দাবিতে আন্দোলনে নেতৃত্ব দেওয়া শিক্ষার্থীদের সাম্প্রতিক ফলাফলে বিপর্যয় দেখা গেছে। বিশেষ করে ‘মিট সায়েন্স অ্যান্ড টেকনোলজি’ কোর্সে আন্দোলনে নেতৃত্ব দেওয়া শিক্ষার্থীদের কারও থিওরি, কারও প্র্যাকটিক্যাল এবং কারও উভয় অংশেই ফেল এসেছে বলে দাবি করেন তিনি।তাঁর দাবি, গত বছরের ২৩ সেপ্টেম্বর আন্দোলন-পরবর্তী সময়ে বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসন ও শিক্ষার্থীদের মধ্যে অনুষ্ঠিত সমঝোতা সভায় আন্দোলনকারী শিক্ষার্থীদের কোনো ধরনের প্রশাসনিক বা একাডেমিক শাস্তির মুখোমুখি হতে হবে না বলে আশ্বস্ত করা হয়েছিল। কিন্তু পরবর্তী ফলাফলে তার ব্যত্যয় ঘটছে কি না, তা তদন্ত করে দেখার দাবি জানান তিনি।তবে অভিযোগের বিষয়ে পশুপালন অনুষদের ডিন ড. মো. রকিবুল ইসলাম খান বলেন, পেশাগত দায়িত্বকে সবকিছুর ঊর্ধ্বে রাখতে হবে। শিক্ষার্থীদের সঙ্গে ব্যক্তিগত বিরোধ বা কোনো আন্দোলনের প্রভাব একাডেমিক ফলাফলে পড়া উচিত নয়। শিক্ষার্থীরা যে আশঙ্কা করছে, তা ঘটেছে বলে তিনি বিশ্বাস করেন না। তবে এমন কিছু ঘটে থাকলে সেটি অত্যন্ত দুঃখজনক বলেও মন্তব্য করেন তিনি।তিনি আরও বলেন, কোনো গোপনীয় বা নেতিবাচক বিষয় নিশ্চিত না হয়ে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম বা জনসম্মুখে প্রকাশ করা উচিত নয়। শিক্ষার্থীরা চাইলে ফলাফল পুনর্বিবেচনার জন্য আবেদন করতে পারে এবং অনুষদের ডিন হিসেবে তিনি তাঁদের সহযোগিতা করবেন।ভেটেরিনারি সায়েন্স অনুষদের ডিন অধ্যাপক ড. মো. বাহানুর রহমান বলেন, শিক্ষার্থীরা ফলাফল নিয়ে অসন্তোষের বিষয়টি তাঁকে জানিয়েছিল। এরপর তাঁরা উপাচার্য বরাবর লিখিত আবেদন করেন। তিনি আবেদনগুলো একসঙ্গে সংগ্রহ করে বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসনের কাছে জমা দিয়েছেন। তবে এখন পর্যন্ত এসব আবেদনের বিষয়ে কোনো সিদ্ধান্ত বা ফলাফল তিনি জানতে পারেননি।বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্রবিষয়ক উপদেষ্টা অধ্যাপক ড. মো. শহীদুল হক বলেন, পরীক্ষার ফলাফল পুনর্বিবেচনার বিষয়ে এক্সাম কন্ট্রোলারের সঙ্গে যোগাযোগ করতে হবে। ভেটেরিনারি অনুষদের শিক্ষার্থীদের আবেদন পৌঁছেছে কি না বা কেন তা এখনো নিষ্পত্তি হয়নি, সে বিষয়ে এক্সাম কন্ট্রোলার বিস্তারিত বলতে পারবেন।অভিযোগকারী শিক্ষার্থীকে বিষয়টি বিস্তারিত উল্লেখ করে বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসনের কাছে আবেদন করার পরামর্শ দিয়েছেন উপাচার্য অধ্যাপক ড. এ কে ফজলুল হক ভূঁইয়া। তিনি বলেন, তদন্ত কমিটির মাধ্যমে বিষয়টি খতিয়ে দেখতে বিস্তারিত বিবরণসহ আবেদন করতে হবে। বিশ্ববিদ্যালয়ের বিদ্যমান স্ট্যাটিউটস ও অর্ডিন্যান্স অনুযায়ী একাডেমিক নিয়ম মেনে ফলাফল পুনরায় পর্যালোচনার বিষয়টি দেখা হবে।