অনলাইনে আয়ের প্রলোভনে নেত্রকোনায় শত তরুণ বিপাকে
বৃহত্তর ময়মনসিংহ · 2026-08-27 12:23:40 · স্টাফ রিপোর্টার
ঘরে বসে সহজে আয়-প্রতিদিন কয়েকটি ভিডিও দেখলেই মিলবে টাকা। মাত্র এক হাজার, দুই হাজার কিংবা তিন হাজার টাকা বিনিয়োগ করলেই নিয়মিত আয়, এমনকি বিনিয়োগের টাকা ও মুনাফাও সহজে তোলার সুযোগ। এমন প্রলোভনে অনলাইনভিত্তিক ‘স্টারলিংক’ নামের একটি অ্যাপ বা ওয়েবসাইটে যুক্ত হয়ে আর্থিকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছেন নেত্রকোনার সদর উপজেলার রৌহা ইউনিয়নসহ বিভিন্ন এলাকার কয়েকশ তরুণ।
ভুক্তভোগীদের অভিযোগ, শুধু রৌহা ইউনিয়নেই এ প্ল্যাটফর্মে বিনিয়োগ করে ক্ষতির পরিমাণ প্রায় ১০ লাখ টাকা। জেলার অন্যান্য উপজেলা মিলিয়ে ক্ষতির পরিমাণ কয়েক গুণ বেশি হতে পারে বলে ধারণা করা হচ্ছে। তবে এর সুনির্দিষ্ট হিসাব পাওয়া যায়নি।
অন্তত ১৫ থেকে ২০ জন ভুক্তভোগীর সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম, মেসেঞ্জার, হোয়াটসঅ্যাপ গ্রুপ ও পরিচিতজনদের মাধ্যমে স্টারলিংকের প্রচারণা চালানো হতো। এক হাজার, দুই হাজার ও তিন হাজার টাকার প্যাকেজে বিনিয়োগ করে প্রতিদিন নির্দিষ্টসংখ্যক ভিডিও দেখলেই আয় করা যাবে বলে প্রচার করা হয়।
শুরুতে অনেকে বিনিয়োগের টাকা ও মুনাফার অংশ সহজেই তুলতে পারায় প্ল্যাটফর্মটির প্রতি বিশ্বাস তৈরি হয়। পরে সেই বিশ্বাসে নিজেরা আরও বেশি টাকা বিনিয়োগের পাশাপাশি বন্ধু, স্বজন ও পরিচিতদেরও যুক্ত করেন। কয়েক দিন পর টাকা উত্তোলনের আবেদন ‘হোল্ড’ বা ‘রিজেক্ট’ দেখিয়ে বন্ধ করে দেওয়া হয় বলে অভিযোগ ভুক্তভোগীদের।
রৌহা ইউনিয়নের এক ভুক্তভোগী রাহিদ (ছদ্মনাম) জানান, এলাকার কয়েকটি অনলাইন গ্রুপে স্টারলিংকের প্রচারণা চালানো হতো। সেখানে বলা হতো, এলন মাস্কের স্টারলিংক বাংলাদেশে নতুন অ্যাপ বা ওয়েবসাইট চালু করছে। এক হাজার, দুই হাজার ও তিন হাজার টাকার প্যাকেজে বিনিয়োগ করে প্রতিদিন দুটি ভিডিও দেখলেই টাকা পাওয়া যাবে। শুরুতে তিনি ৫০০ টাকা পর্যন্ত সহজেই উত্তোলন করতে পেরেছিলেন। পরে বিশ্বাস তৈরি হলে তিনি বন্ধু ও পরিচিতদের যুক্ত করেন। সব মিলিয়ে তিনি ও তার পরিচিতজনেরা প্রায় এক লাখ টাকা হারিয়েছেন বলে দাবি করেন।
আরেক ভুক্তভোগী ইয়াসিন (ছদ্মনাম) জানান, শুরুতে টাকা জমা দেওয়ার ১০ থেকে ৩০ মিনিটের মধ্যেই বিনিয়োগের টাকা বা মুনাফার অংশ পাওয়া যেত। এতে অনেকে বড় অঙ্কের টাকা বিনিয়োগে উৎসাহিত হন। কিন্তু পাঁচ-সাত দিন কিংবা দুই সপ্তাহ পর টাকা তুলতে গেলে ‘হোল্ড’ বা ‘রিজেক্ট’ দেখানো শুরু হয়। পরে টাকা তুলতে হলে নির্দিষ্টসংখ্যক নতুন সদস্য রেফার করার শর্ত দেওয়া হয়। নতুন কেউ এক হাজার টাকা জমা করলে ১০ শতাংশ কমিশন দেওয়ার কথাও বলা হতো।
ভুক্তভোগীদের অভিযোগ, নতুন সদস্য যুক্ত করার শর্তটি ছিল প্ল্যাটফর্মটির কার্যক্রমের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ অংশ। শুরুতে যুক্ত হওয়া কেউ কেউ বিনিয়োগের টাকা ও কিছু মুনাফা তুলতে পেরেছেন। এতে তারা নিজেরাই অন্যদের যুক্ত করেন। কিন্তু পরবর্তী সময়ে যুক্ত হওয়া অনেকেই আর টাকা তুলতে পারেননি। ফলে প্রথম দিকে যুক্ত কিছু সদস্য লাভবান হলেও পরের দিকে যুক্ত হওয়া বড় একটি অংশ বিনিয়োগের টাকা হারিয়েছেন।
ভুক্তভোগীদের কয়েকজন জানান, সামাজিকভাবে হেয় হওয়ার আশঙ্কা, পরিচিতজনদের সঙ্গে বিরোধ এবং নিজেরাই অন্যদের প্ল্যাটফর্মে যুক্ত করায় দায়ী হওয়ার ভয় থেকে তারা প্রশাসনের কাছে লিখিত অভিযোগ করছেন না।
সমাজকর্মী মৃণাল কান্তি চক্রবর্তী বলেন, মাঠপর্যায়ে পরিদর্শনে গিয়ে অভিভাবকদের কাছ থেকে অনলাইনভিত্তিক প্রতারণার অভিযোগ পাওয়া যাচ্ছে। দ্রুত বেশি লাভের প্রলোভনে তরুণরা এসব প্ল্যাটফর্মে টাকা বিনিয়োগ করছেন। পরে নতুন সদস্য যুক্ত করার শর্তে তারা এক ধরনের জালে আটকে যাচ্ছেন। এ ধরনের প্রতারণা ঠেকাতে আইনশৃঙ্খলা বাহিনী, অভিভাবক ও সচেতন মহলকে সমন্বিতভাবে সচেতনতা কার্যক্রম জোরদার করতে হবে।
ফ্রিল্যান্সার ও আইটি স্পেশালিস্ট মো. আনোয়ার হাসান বলেন, অনলাইন স্ক্যামচক্রগুলো লোভনীয় অফার ও সহজে আয়ের প্রলোভন দেখিয়ে তরুণদের আকৃষ্ট করে। শুরুতে নানা সুবিধার আশ্বাস দিলেও একপর্যায়ে বিনিয়োগকারীদের অর্থ হাতিয়ে নেয়। এটি প্রতারণামূলক কার্যক্রম।
এ বিষয়ে নেত্রকোনার পুলিশ সুপার মো. তরিকুল ইসলাম বলেন, ডিজিটাল প্রতারণার বিষয়ে পুলিশ নিয়মিত সচেতনতামূলক বার্তা দিয়ে থাকে। কেউ এ ধরনের প্রতারণার শিকার হলে সংশ্লিষ্ট থানায় সাধারণ ডায়েরি অথবা লিখিত অভিযোগ দিতে পারেন। অভিযোগ পাওয়ার পর নির্দিষ্ট ইউনিটের মাধ্যমে তদন্ত করে আইনানুগ ব্যবস্থা নেওয়া হবে। প্রতারণায় ব্যবহৃত ডিভাইস প্রযুক্তিগত সক্ষমতার মাধ্যমে শনাক্ত করে জড়িতদের আইনের আওতায় আনা সম্ভব।