পরচুলার কারুকাজে স্বাবলম্বী গফরগাঁওয়ের নারীরা
বৃহত্তর ময়মনসিংহ · 2026-09-03 08:18:37 · স্টাফ রিপোর্টার
সংসারের অভাব ও অনিশ্চয়তার মধ্যে থাকা হাজারো নারীর জীবনে নতুন আশার আলো দেখাচ্ছে গফরগাঁওয়ের পরচুলা শিল্প। দারিদ্র্য ও ঋণের বোঝা ছিল যাদের নিত্যসঙ্গী, আজ সেই নারীদের তৈরি হস্তশিল্প পৌঁছে যাচ্ছে সুদূর যুক্তরাষ্ট্র থেকে সিঙ্গাপুরে।
মাথার ফেলে দেওয়া পরিত্যক্ত চুল দিয়ে বিশ্বমানের পরচুলা (উইগ) বানিয়ে নিজেদের ভাগ্যের চাকা ঘোরানোর পাশাপাশি দেশের অর্থনীতিতে বিপুল বৈদেশিক মুদ্রা যোগ করছেন ময়মনসিংহের গফরগাঁও উপজেলার পোড়াবাড়ীয়া ও সংলগ্ন ১০-১২টি গ্রামের নারীরা।
২০০৭ সালে গফরগাঁওয়ের পশু হাসপাতাল রোডে মাত্র ২০ লাখ টাকা প্রাথমিক মূলধন নিয়ে 'পি-বাড়ীয়া গ্রুপ' (প্রিপেয়ার এগ্রোফেয়ার)-এর এই যাত্রা শুরু হয়েছিল। বর্তমানে প্রতিষ্ঠানটিকে কেন্দ্র করে প্রত্যক্ষ ও পরোক্ষভাবে প্রায় ২,০০০ মানুষের কর্মসংস্থান তৈরি হয়েছে, যার প্রায় ৯০ শতাংশই স্থানীয় নারী।
পোড়াবাড়ীয়া গ্রামের শিরিন আক্তারের গল্পটা ঘুরে দাঁড়ানোর। ২০২২ সালে এক মর্মান্তিক দুর্ঘটনায় স্বামী পঙ্গু হয়ে পড়লে চিকিৎসার খরচে চার লাখ টাকার ঋণে ডুবে যায় পরিবার। সংসারের হাল ধরতে কারখানায় যোগ দেন শিরিন।
তিনি বলেন, এখানে কাজ শুরু করার পর ঋণের বড় অংশ শোধ করেছি, দুই সন্তানকে লেখাপড়া করাচ্ছি। আগে কিনে চাল খাওয়া কষ্ট ছিল, এখন ঘরে ধান-চাল থাকে, নিজের টাকায় ছাগলও কিনেছি।
একইভাবে তিন বছর কাজ করে নিজের পাকা ঘর তুলেছেন সাথী আক্তার। নবম শ্রেণিতে পড়ার সময় কাজে যোগ দেওয়া মাফিয়া আক্তার এখন কলেজে পড়ার পাশাপাশি বাবার কাঁধ থেকে কয়েক লাখ টাকার ঋণের ভার নামিয়েছেন। দক্ষতা ও কাজের পরিমাণ অনুযায়ী এখানকার অনেক নারী কর্মী মাসে সর্বোচ্চ ৫০ হাজার টাকা পর্যন্ত আয় করছেন।
পি-বাড়ীয়ার পরচুলার কারখানাটি শুধু হাসি ও খুশির ভাগ্য বদলায়নি, কর্মসংস্থান সৃষ্টি হওয়ায় কাজ করে স্বাবলম্বী হওয়ার পথ খুঁজে পেয়েছেন গ্রামের সাধারণ হতদরিদ্র নারীরা। লেখাপড়ার খরচ চালাচ্ছেন নারী শিক্ষার্থীরাও। নারীদের আর্থিক সচ্ছলতা সমাধান দিয়েছে গ্রামের অনেক সামাজিক সমস্যারও।
চুল সংগ্রহ-প্রক্রিয়াজাতকরণ
পার্লার ও গ্রাম-গঞ্জের হকারদের থেকে সংগৃহীত চুল কারখানায় এনে প্রথমে বাছাই, জীবাণুমুক্ত ও রঞ্জন (ডাইং) করা হয়। এরপর প্রশিক্ষণপ্রাপ্ত নারীরা নিখুঁত হাতে উইগের ক্যাপে চুল বুননের (নটিং) কাজ করেন।
পরচুলা (উইগ) তৈরি উপকরণ ও সময়
সংশ্লিষ্টরা জানান, ক্যাপ তৈরিতে লাগে মাথার ডামি, চুল, নেট, সুচ, চক ও পিন। এগুলো দিয়ে খুব নিখুঁতভাবে কাজ করতে হয়। এ জন্য অনেক মনোযোগের প্রয়োজন হয়।
চাহিদা অনুসারে কয়েক প্রকারের পরচুলা তৈরি হচ্ছে এখানে। একটি পরচুলা তৈরিতে গড়ে ১ থেকে ৪ দিন সময় লাগে। বড় পরচুলা তৈরি করতে তিন থেকে চার দিন সময় লাগে। আকারভেদে এ ধরনের প্রতিটি পরচুলা তৈরির মজুরি ১ হাজার ১ শত টাকা থেকে শুরু করে থেকে ৪ হাজার টাকা পর্যন্ত।
রপ্তানি হচ্ছে ২২ দেশে
ঢাকা হেড অফিসে চূড়ান্ত ফিনিশিংয়ের পর এসব পরচুলা মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র, সিঙ্গাপুর ও থাইল্যান্ডসহ বিশ্বের প্রায় ২২টি দেশে রপ্তানি করা হয়। একেকটি উইগের উৎপাদন খরচ ২ হাজার থেকে ৪০ হাজার টাকা হলেও আন্তর্জাতিক বাজারে এগুলো ২২ থেকে ৪০০ মার্কিন ডলারে বিক্রি হয়। বর্তমানে এই শিল্প থেকে প্রতি বছর প্রায় ২০ লাখ (২ মিলিয়ন) মার্কিন ডলার বৈদেশিক মুদ্রা আয় হচ্ছে।
পি-বাড়ীয়া গ্রুপের চেয়ারম্যান মো. নুরুজ্জামান রানা জানান, তাদের লক্ষ্য ভবিষ্যতে আরও ১০ হাজার নারীর কর্মসংস্থান সৃষ্টি করা। কাঁচামাল আমদানির জটিলতা নিরসন ও শিপিং খরচ কমানোর মতো নীতিগত সরকারি সহায়তা পেলে তৈরি পোশাক খাতের মতোই পরচুলা শিল্প বাংলাদেশের একটি শীর্ষ রপ্তানিমুখী খাত হিসেবে গড়ে উঠবে।